হানিফের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

হানিফের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় মো. সদর উদ্দিন খান, মো. আজগর আলী ও মো. আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। গতকাল ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

কার কি সাজা: রায়ে মো. মাহবুবউল আলম হানিফকে তার বিরুদ্ধে আনা ১ নম্বর চার্জের ১ থেকে ৬ নম্বর কাউন্টে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২ ও ৩ নম্বর চার্জে দোষী সাব্যস্ত করে একই আইনের একই বিধানে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আসামি মো. সদর উদ্দিন খান, মো. আজগর আলী ও মো. আতাউর রহমান আতাকে তাদের বিরুদ্ধে গঠিত ১ নম্বর চার্জের ১ থেকে ৬ নম্বর কাউন্টে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ২ ও ৩ নম্বর চার্জে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, মো. মাহবুবউল আলম হানিফ, মো. সদর উদ্দিন খান, মো. আজগর আলী ও মো. আতাউর রহমান আতার বিরুদ্ধে গঠিত ৪ ও ৫ নম্বর চার্জ একত্রে বিবেচনা করে সব আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এসব চার্জে প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাজাপ্রাপ্ত সব আসামির স্থাবর সম্পত্তির অর্ধাংশ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রির অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পাঁচটি চার্জের বিবরণ: চার্জ ১: বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট কুষ্টিয়ায় নির্দেশ ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. ওসামা, বাবলু ফরাজী ও ইউসুফ শেখ-এই ৬ জনকে হত্যার দায়। চার্জ ২: শত শত নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, মারধর, নির্বিচার গুলিবর্ষণ, বেআইনি আটক এবং আহতদের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ। চার্জ ৩: আন্দোলনকারী ও শিক্ষার্থীদের বিএনপি, জামায়াত ও সন্ত্রাসী ট্যাগ দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে টার্গেট করা এবং তাদের ওপর সুপরিকল্পিত দমন-পীড়ন, নির্যাতন ও গ্রেপ্তার চালানো। চার্জ ৪: তৎকালীন সরকারের নির্দেশে আন্দোলন দমন করতে হাসানুল হক ইনু ও ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কুষ্টিয়ায় স্থানীয় ক্যাডার ও পুলিশকে অস্ত্র-রসদ ও নির্দেশনা দিয়ে হত্যাকাণ্ডে সহায়তা ও প্ররোচনা দেয়া। চার্জ ৫: দলীয় কাঠামো ও ১৪ দলীয় জোটকে একটি অপরাধমূলক সংগঠন হিসেবে ব্যবহার করে দেশব্যাপী হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিন্ন পরিকল্পনা যৌথভাবে বাস্তবায়ন করা।

রায়ের প্রতিক্রিয়া: এই রায়কে সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলাটির বিচার শেষে আজ রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আজকের এ রায় অত্যন্ত সময়োপযোগী। জুলাই শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন মাহবুবউল আলম হানিফ। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, নির্বিচারে গুলি করাসহ যেসব নির্দেশনা ছিল, সেসবে তার সহযোগিতা ছিল। এ ছাড়া কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের বৈঠকে অধীনস্ত নেতাকর্মীদেরও তিনি বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ সাজা দিয়েছেন আদালত।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ব্যক্তিগতসহ সুপিরিয়র দায় থাকার কারণে হানিফকে প্রথম অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। বাকি দু’টিতে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়। একইভাবে অপর তিন আসামিকে আমৃত্যু সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া সব আসামিকে তিনটি অভিযোগের জন্য পুনরায় যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়। পাশাপাশি তাদের অর্ধেক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে, রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারি খরচে (স্টেট ডিফেন্স) নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী মো. আমির হোসেন। তিনি বলেন, আপনারা সবাই উপস্থিত থেকে রায় শুনেছেন। রায় সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই। তবে এ রায়টা আমার কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে। আমি হতাশ।