জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড এবং দলের তিন নেতার সাজা ঘোষণার পর কুষ্টিয়ায় স্বস্তি ও সন্তোষের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিচারপ্রত্যাশী পরিবার, জুলাই আন্দোলনের সংগঠক-যোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে এসেছে ন্যায়বিচার, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচার এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। একই মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান ও সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতার আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে।
রায় ঘোষণার পর স্থানীয়দের অনেকে একে বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তাদের প্রত্যাশা, আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর সাহস পাবে না।
মামলার প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কুষ্টিয়ায় ছয়টি হত্যাকাণ্ডে আসামিদের উসকানি, নির্দেশ ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে টেলিফোন কথোপকথনের অডিওসহ বিভিন্ন দালিলিক প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা ছাড়াও এ মামলায় ১৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
কুষ্টিয়া শহরের বাসিন্দা কলেজশিক্ষার্থী মিরাজ বলেন, রাজনীতি মানুষের জন্য হওয়া উচিত। কিন্তু ক্ষমতার কারণে মানুষ যদি ভয়ে থাকে, মামলা-হামলার আশঙ্কায় কথা বলতে না পারে, তাহলে সেটি কোনোভাবেই ভালো রাজনীতি নয়। হানিফ ও আতার সময়ে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে আমরা শুনেছি এবং দেখেছি।
তিনি বলেন, আজকের রায়ে মানুষের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে।
জুলাই আন্দোলনের সংগঠক আলমাস হাসান মামুন বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে এ চার ব্যক্তিসহ আরও অনেকে জড়িত ছিলেন বলে তারা মনে করেন। তার ভাষ্য, এই রায়ের মধ্য দিয়ে শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পেয়েছে। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সাহস পাবে না।
জুলাই যোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান পলাশ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ার ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের হত্যার মামলায় রায় ঘোষণা হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। এখন পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইন অনুযায়ী সাজা নিশ্চিত করতে হবে।
জুলাই যোদ্ধা সুলতান মারুফ তালহাও রায় কার্যকরের উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। আন্দোলনে নিহত শহীদ আব্দুল্লাহর বাবা লোকমান হোসেন বলেন, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা চাই, দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা হোক। আমরা যা হারিয়েছি, তা কখনো ফিরে পাবো না। তবে আমাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট কুষ্টিয়ায় নিহত ইউসুফ শেখের মেয়ে সীমা বলেন, রায় হওয়ায় আমরা খুব খুশি। সরকারের কাছে আবেদন, ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। দেশের ভেতরে ও বাইরে যারা পলাতক রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি সুজাউদ্দিন জোয়ার্দার বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় সব আসামির মৃত্যুদণ্ড হবে বলে তারা আশা করেছিলেন। তবে ঘোষিত রায়ে তা হয়নি। কুষ্টিয়া জেলা বিএনপি’র সদস্যসচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, মাহবুব-উল আলম হানিফ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ার মানুষ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছিলেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ তার ক্ষমতার বলয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, আজকের রায়ের মাধ্যমে মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসন এবং মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নের বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
