সুনামগঞ্জে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার ও গাইডওয়াল নির্মাণকাজে নিম্ন্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, কারিগরি ত্রুটি ও ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণকাজ চলাকালেই সেতুর সংযোগ সড়কের পাশে নির্মিত গাইডওয়ালের প্রায় পাঁচ ফুট অংশ সরে গেছে। বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ফাটল। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, শুরু থেকেই কাজে অনিয়ম হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ বলছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। জানা যায়, ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ-কাছিরগাথি-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের লালপুর-সালামপুর সেতুর ১ ও ২ নম্বর অংশ এবং প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও গাইডওয়াল নির্মাণের জন্য ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার প্রকল্প নেয়া হয়। কাজটি পান ঢাকার ঠিকাদার মো. বদরুল ইকবাল। তবে ৫ই আগস্টের পর তিনি দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রকল্পের কাজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। প্রকল্পের সাব-ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তাহিরপুর উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন। তার দাবি, প্রকল্পে তিনি প্রায় ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানতেন এবং তার স্বাক্ষরে তিনি দুইটি বিলও তুলেছেন। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর নানা কৌশলে সিলেটের শফিকুল ইসলামকে কাজের দায়িত্ব দেয়া হলেও তাঁর বিনিয়োগ করা টাকা ফেরত দেয়া হয়নি। সাব-ঠিকাদার নিয়োগের সময় শফিকুল ইসলাম সাক্ষী ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। আজাদ হোসেনের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে। উত্তোলিত বিলের টাকা সওজ’র কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে গত মঙ্গলবার প্রকল্পের সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুলের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ও অভিযোগের প্রতিবাদে বিশ্বম্ভরপুর ছাত্রদলের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন, গত মঙ্গলবার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের রতারগাঁও হাইস্কুল মাঠে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে স্থানীয় বাসিন্দারা তার গাড়ির গতিরোধ করেন। এ সময় তারা সেতুর সংযোগ সড়কের পাশে নির্মিত গাইডওয়ালের ত্রুটি দেখান। তিনি বলেন, সরজমিন গিয়ে গাইডওয়ালের প্রায় পাঁচ ফুট অংশ সরে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পান।
কাজের সাইটের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে ত্রুটিপূর্ণ অংশ দেখানোর পর গাইডওয়ালটি নতুন করে নির্মাণের পক্ষে মত দেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে কাজের মান যাচাই করতে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘটনাস্থলে আসার আমন্ত্রণ জানান তিনি।
নুরুল বলেন, আমার বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়েছে। আমি এ অভিযোগের তদন্ত দাবি করছি। একই সঙ্গে সড়কের কাজে গাফিলতি থাকলে সেটিও তদন্ত করে প্রমাণ করা হোক। বিশ্বম্ভরপুরের বাসিন্দা আরিফ রব্বানী হিমেলের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই অনিয়ম হচ্ছে। প্রকৌশলগত নিয়ম অনুযায়ী মাটির যে পরিমাণ কম্প্যাকশন এবং সড়কের যে পুরুত্ব থাকার কথা, তার সামান্য অংশও যথাযথভাবে করা হয়নি। গাইডওয়ালের গোড়া ও ঢালু অংশে মাটি কাটার অনিয়মের কারণে সেটি হেলে পড়তে শুরু করেছে। সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার প্রকল্পটির প্রায় অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রকল্পের ৪৩ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যার পরিমাণ ৩৭ কোটি ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, এমপি গাইডওয়াল হেলে পড়ার যে অভিযোগ করেছেন- সেটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। ঠিকাদারের কাছে টাকা পাওনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার কাছে কে টাকা পাবেন, এটা আমরা জানি না। স্থানীয় লোকজন যদি তার কাছে টাকা পায়, সেটি তাদের বিষয়।
