আমরা সকলেই একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি। আমরা চাই, রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ নিরাপদে থাকুক, নিশ্চিন্তে বসবাস করুক এবং নিজের শ্রম, মেধা ও অর্জনের সুফল উপভোগ করুক। আমরা চাই, একটি শিশু নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠুক, একজন শ্রমিক নিশ্চিন্তে কর্মস্থলে প্রবেশ করুক, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে জ্ঞান অর্জন করুক এবং একজন প্রবীণ মানুষও তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কাটান নিরাপত্তার সঙ্গে। কিন্তু কখনো কখনো আমাদের সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে যায়। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো বিপর্যয় হঠাৎ এক নিমেষে সবকিছু বদলে দেয়। স্বজন হারানোর বেদনা, জীবনের সঞ্চয় হারানোর কষ্ট এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা তখন সারা জীবন ধরে বহন করতে হয়।
প্রকৃতি কখনো কখনো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এমন শক্তি নিয়ে হাজির হয়, যার সামনে আমাদের প্রস্তুতিও সীমিত হয়ে পড়ে। ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা বজ্রপাতের মতো ঘটনা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না; কিন্তু ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: কোনো বিপর্যয় প্রাকৃতিক কারণে শুরু হলেও তার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকাংশেই নির্ভর করে মানুষের প্রস্তুতি, অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং সামাজিক সচেতনতার ওপর। একইভাবে, জনগণের অসতর্কতা, অবহেলা, অনিয়ম কিংবা নিরাপত্তাবিধি অমান্য করার কারণেই আগুন সংক্রান্ত দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটতে দেখা যায়। বিভিন্ন কেস স্টাডি থেকে দেখা যায়, আগুনজনিত দুর্ঘটনার প্রায় সবই সামান্য একটু সচেতনতা বৃদ্ধি করলেই পরিপূর্ণভাবে রোধ করা সম্ভব হতো। তাই একটি দুর্ঘটনমুক্ত নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ার প্রশ্নে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আচরণ, অভ্যাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করে, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, পুলিশ ও উদ্ধারকারী বাহিনী নিয়োজিত রাখে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় নানা ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো প্রতিষ্ঠান আগুন, দুর্ঘটনা ও দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করলেও দুর্ঘটনা ঠেকানো প্রায় অসম্ভব, যদি নাগরিকরা নিরাপত্তার ব্যাপারে উদাসীন থাকেন। রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠান মানুষের জন্য, আর রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো তার জনগণ। সেই জনগণ যদি নিজের ও অন্যের জীবন এবং সামষ্টিক সম্পদের নিরাপত্তার প্রতি দায়িত্বশীল ও কর্তব্যবোধের অভ্যাসে অভ্যস্ত হন, তবেই একটি দুর্ঘটনমুক্ত নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
একটি ব্যবহৃত ম্যাচের কাঠি অসতর্কভাবে ফেলে দেওয়া হলো; হয়তো আগুনটি তখন প্রায় নিভে আসছিল। যে ব্যক্তি কাঠিটি ফেললেন, তিনি হয়তো মনে করলেন, এতে আর কোনো বিপদ নেই। কিন্তু সেই ক্ষুদ্র আগুন যদি শুকনো কাগজ, কাপড়, প্লাস্টিক কিংবা অন্য কোনো দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে আসে, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি ছোট আগুন প্রথমে একটি ঘর, পরে একটি দোকান, তারপর পাশাপাশি থাকা একাধিক স্থাপনাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। যে মানুষটি কয়েক সেকেন্ড আগে নিজের কাজ শেষ করে চলে গিয়েছিলেন, তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি যে তাঁর সামান্য অসতর্কতা অন্য অনেক মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য কত বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।
একটি দুর্বল বৈদ্যুতিক প্লাগ পয়েন্ট, ক্ষতিগ্রস্ত তার, অনিরাপদ গ্যাস সংযোগ কিংবা বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ভোল্টেজকে আমরা অনেক সময় তেমন গুরুত্ব দিই না। দীর্ঘদিন ধরে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটায় আমরা ধরে নিই, ব্যবস্থাটি নিরাপদ। অথচ আপনার অনুপস্থিতিতে কোনো ত্রুটিযুক্ত বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে সামান্য যে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে, গ্যাসের অনিরাপদ সংযোগ থেকে যে সামান্য আগুন জ্বলে উঠতে পারে, সেই একটি ছোট ত্রুটিই অত্যন্ত বড় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। তাই দুর্ঘটনার আগে এসব ত্রুটি শনাক্ত করার সামাজিক দায়িত্ববোধের অভ্যাস সৃষ্টি করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিপদ এড়ানো সম্ভব।
ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশাগত ভুল, নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, প্রকৌশলগত নির্দেশনা অমান্য করা কিংবা ভবনের ওপর অনুমোদিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ভার চাপানো প্রথমে তেমন বিপজ্জনক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু এসব ত্রুটি সময়ের সঙ্গে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিতে পারে। যথাযথ প্রকৌশলগত মূল্যায়ন, নির্মাণ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া একটি ছোট ত্রুটি বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু বর্তমানের নয়, বরং প্রশ্ন হলো—এই ত্রুটিটি উপেক্ষা করা হলে এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন ভবন নির্মিত হচ্ছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, শিল্পকারখানার বিস্তার ঘটছে এবং মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অগ্রগতি দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে যদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা সমানভাবে এগিয়ে না যায়, তাহলে নতুন অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত স্থাপনা, বৈদ্যুতিক সংযোগের ত্রুটি, ভবনের মিশ্র ব্যবহার এবং জরুরি যানবাহনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা অগ্নিনিরাপত্তাকে জটিল করে তুলতে পারে। পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় আবাসিক ভবনের পাশাপাশি গুদাম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণের ঝুঁকিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। অন্যদিকে, বহুতল ভবন, বিপণিবিতান, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় বিপুল মানুষের সমাগম থাকায় জরুরি বহির্গমনপথের নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
২০১০ সালের নিমতলী অগ্নিকাণ্ড, ২০১৯ সালের চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড এবং একই বছরের বনানীর এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ড আমাদের সামনে নিরাপত্তা দুর্বলতার ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরেছে। ২০২৪ সালের বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডেও ৪৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনা কেবল অতীতের শোকাবহ স্মৃতি নয়; এগুলো আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত হওয়া, দায় নির্ধারণ করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং তা সংশোধন করা।
একটি দুর্ঘটনমুক্ত নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ার প্রথম ধাপ হতে পারে নিজের ঘর, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশকে নিরাপদ করার উদ্যোগ। পরিবারের সদস্যদের জানতে হবে, রান্নার চুলা ও গ্যাসের সংযোগ কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কীভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং আগুন লাগলে কোন পথে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত তার বা অনিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ অবহেলা করা যাবে না। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে যোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে তা পরীক্ষা ও মেরামত করাতে হবে।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই আগুন, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য বিপজ্জনক উপকরণ সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দিতে হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়; কেন কোনো কাজ বিপজ্জনক এবং বিপদের সময় কী করতে হবে, সেটিও তাদের বোঝাতে হবে। পরিবারের সবাই যেন জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা জানেন, তা নিশ্চিত করা দরকার। ভবন মালিক ও ব্যবস্থাপকদের নিশ্চিত করতে হবে যে জরুরি সিঁড়ি, করিডর ও বহির্গমনপথ বাধামুক্ত রয়েছে। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও অ্যালার্মের কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। শিল্পকারখানায় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দোকানপাট ও বাজারে এমনভাবে মালামাল রাখা যাবে না, যাতে জরুরি চলাচল ব্যাহত হয়।
সাধারণ মানুষেরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। জরুরি সেবাকে দ্রুত ও সঠিক তথ্য দিতে হবে, উদ্ধারকারী যানবাহনকে পথ করে দিতে হবে, ঘটনাস্থলে অযথা ভিড় করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো যাবে না। প্রশিক্ষণ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে নিজের নিরাপত্তা বজায় রেখে অন্যদের নিরাপদ স্থানে যেতে সহায়তা করা উচিত।
সচেতন নাগরিক যেমন জরুরি, তেমনি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। একটি ভবন নিরাপদ কি না, তা শুধু তার মালিকের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; ভবনের নকশা, নির্মাণমান, অনুমোদিত ব্যবহার এবং অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুযায়ীই হতে হবে।
জনসচেতনতা আরও মজবুত করার লক্ষ্যে আমরা সর্বস্তরের মানুষের সাহায্য কামনা করছি। শিক্ষকগণের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, আপনারা ছাত্রছাত্রীদের সচেতন করুন; সমাজকর্মীদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা আপনাদের এলাকায় মানুষকে আরও একটু সচেতন করার ব্যবস্থা করুন; মসজিদের খতিব ও ইমামদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা জুমার খুতবায় জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার বিষয়ে এবং আগুন দুর্ঘটনা রোধে মানুষকে সচেতন করুন।
আইন তৈরি করা যায়, নির্দেশনা জারি করা যায় এবং প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যায়; কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস পরিবর্তন না হলে এসব উদ্যোগের সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। আমরা যদি জরুরি সিঁড়িতে মালামাল রাখাকে স্বাভাবিক মনে করি, বৈদ্যুতিক ত্রুটি দেখেও তা উপেক্ষা করি, নিরাপত্তা মহড়াকে সময়ের অপচয় মনে করি কিংবা দুর্ঘটনার সময় জরুরি যানবাহনের পথ ছেড়ে না দিই, তাহলে কেবল আইন ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা কঠিন।
তাই অগ্নি নিরাপত্তাকে সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করা প্রয়োজন; মানুষ যেন বিপদ ঘটার পর নয়, বিপদের আশঙ্কা দেখলেই ব্যবস্থা নিতে শেখে। একজন দোকানি নিজের দোকানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, পাশাপাশি পাশের দোকানের ঝুঁকিও দায়িত্বশীলভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। একজন কর্মী কর্মস্থলে বিপজ্জনক অবস্থা দেখলে তা দ্রুত জানানোর সুযোগ পাবেন। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা সম্পর্কেও সচেতন করবেন। একজন অভিভাবক সন্তানের মধ্যে এমন অভ্যাস গড়ে তুলবেন, যাতে সে নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের নিরাপত্তার প্রতিও সমানভাবে সংবেদনশীল হয়।
পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়। এর জন্য ধারাবাহিক প্রচার, শিক্ষাব্যবস্থায় নিরাপত্তা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। গণমাধ্যম এখানে আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার; আপনারা দুর্ঘটনার খবর প্রচারের পাশাপাশি কীভাবে সেই দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়, তা মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরুন।
সবচেয়ে বড় কথা, নিরাপত্তাকে অন্যের দায়িত্ব মনে করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি নাগরিককে বুঝতে হবে, তার ছোট একটি সচেতন সিদ্ধান্ত অন্যের জীবন রক্ষা করতে পারে; আবার একটি মাত্র অবহেলাও অন্য মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তার সমান অগ্রগতি ঘটবে; যেখানে ভবন নির্মাণের সময় শুধু উচ্চতা ও সৌন্দর্য নয়, মানুষের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও গুরুত্ব পাবে; যেখানে শিল্পকারখানার উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হবে; যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, বাস্তব জীবনে নিরাপদ থাকার জন্যও শিক্ষা পাবে; এবং যেখানে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সবসময় আগাম উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে দায়িত্বশীল অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। কার্যকর আইন, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, যথাযথ তদারকি এবং জরুরি সেবার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে নাগরিকদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও অভ্যাসের মাধ্যমে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। আমরা হয়তো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকাতে পারব না; সব দুর্ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনাও হয়তো পুরোপুরি সম্ভব নয়। কিন্তু ঝুঁকি শনাক্ত করা, প্রস্তুতি নেওয়া, নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা এবং পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার মাধ্যমে বহু দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা এবং বহু অমূল্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
আজ আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা কোনো ঝুঁকিকে ছোট বলে অবহেলা করব না। কোনো নিরাপত্তা ত্রুটিকে পরে সংশোধন করার অজুহাতে ফেলে রাখব না। অন্যের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলে এমন কোনো অভ্যাসকে আর মেনে নেব না। আমরা নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবার, কর্মস্থল ও সমাজের নিরাপত্তায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করব। একটি দুর্ঘটনমুক্ত নিরাপদ রাষ্ট্র শুধু শক্তিশালী প্রশাসন বা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। এটি গড়ে ওঠে সচেতন মানুষ, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতির ভিত্তিতে।
একটি ছোট সতর্কতা একটি সম্ভাব্য দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারে। একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে মারাত্মক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে। আর লাখো মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ একটি জাতির নিরাপত্তার ভিত্তিকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করতে পারে।
বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও হারিয়ে যাওয়া জীবন ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই একটি দুর্ঘটনমুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতায় নয়, বরং বিপর্যয় ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করার সম্মিলিত সচেতনতায়। আসুন, আমরা সবাই সেই সচেতনতার অংশীদার হই।
লেখক: ডিজি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স
