স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের দক্ষিণে দ্রুতগতির রেললাইনে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। বুধবার সকালে উর্দা শহরের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। থেমে থাকা একটি ট্রেনের পেছনে দ্রুতগতিতে ধাক্কা দেয় রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের পরিচালিত একটি ট্রেন। স্থির ট্রেনটি পরিচালনা করছিল বেসরকারি সংস্থা ইরিও।
দুর্ঘটনায় একাধিক বগি রেললাইনের পাশের ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়। দুই ট্রেনে ৫৪০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন।
স্পেনের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। ঘটনার পরদিনও ৫০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ভয়াবহ এই ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি এবং ট্রেন চালকদের দেয়া নির্দেশনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
কখন ও কোথায় দুর্ঘটনা ঘটে?
স্পেন সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৫৩ মিনিটে মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে মোরা ও ওর্গাজ পৌর এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
ইরিও পরিচালিত ট্রেনটি তখন রেললাইনে স্থির ছিল। এ সময় রেনফের ট্রেনটি দ্রুতগতিতে এসে সেটির পেছনে ধাক্কা দেয়।
ইরিও জানিয়েছে, অজ্ঞাত কারণে তাদের ট্রেনটি পেছন থেকে ধাক্কার শিকার হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ওই রেলপথের সব ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রেনফে জানায়, মাদ্রিদ, সিউদাদ রিয়াল ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে রেলসেবা স্থগিত করা হয়েছে।
এক যাত্রী স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যাত্রা শুরুর প্রায় ৪০ মিনিট পর তারা প্রচণ্ড ধাক্কা অনুভব করেন।
কী কারণে সংঘর্ষ?
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কম্পিউটার ব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে চলন্ত ছয়টি ট্রেন থামিয়ে দেয়া হয়েছিল। সংঘর্ষে জড়ানো দুটি ট্রেনও এর মধ্যে ছিল।
তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ট্রেন চলাচলের দায়িত্ব নেয়। কিন্তু পরে কোনো গতিসীমা ছাড়াই ট্রেনগুলোকে আবার চলার অনুমতি দেয় নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। তার ভাষায়, ‘ব্যাখ্যাতীত পরিস্থিতিতে’ এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।
এর ফলে রেললাইনে স্থির থাকা ইরিওর ট্রেনটির পেছনে রেনফের ট্রেনটি ধাক্কা দেয়।
স্পেনের সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা ট্রেনচালক ও রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কথোপকথনের অডিওতেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
অডিও অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৩৬ মিনিটে একটি দ্রুতগতির ট্রেনকে চলার অনুমতি দেয়া হয়েছিল, যদিও প্রায় ২৫ কিলোমিটার সামনে আরেকটি ট্রেন থেমে ছিল।
রেনফের ট্রেনের চালককে স্বয়ংক্রিয় গতিনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এলজেডবি বিচ্ছিন্ন করে আবার সংযুক্ত করতে বলা হয়েছিল। এরপর স্বাভাবিক গতিতে চলার নির্দেশ দেয়া হয়।
চালক যখন স্বাভাবিক গতিতে চলার বিষয়টি নিশ্চিত হতে চান, তখন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে তাকে সম্মতি দেয়া হয়।
অথচ প্রচলিত নিরাপত্তাবিধি অনুযায়ী, এ ধরনের পরিস্থিতিতে চালকের নিজের দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকা পথ অনুসরণ করে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার গতিতে চলার কথা। দুর্ঘটনাস্থলের রেলপথটি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতির উপযোগী।
স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থা বা তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে বিকল্প হিসেবে ল্যাটারাল সিগন্যালিং ব্লক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
সামনের ট্রেনটির চালকও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে জানিয়েছিলেন, তার ট্রেনটি উর্দার প্রবেশসংকেতের সামনে স্থির রয়েছে। পরে তাকে স্বাভাবিকভাবে যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
কিন্তু পরবর্তী কথোপকথনে ওই চালক জানান, নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ট্রেনটি চালু করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ, রেনফের ট্রেনটি এগিয়ে আসার সময়ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কাছে ইরিওর ট্রেনটি স্থির থাকার তথ্য ছিল বলে অডিও থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তবে এসব তথ্য দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ প্রমাণ করে না। তদন্তের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর ভূমিকা নির্ধারণ করা হবে।
দুই ট্রেনে কত যাত্রী ছিলেন?
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের সরকারের মুখপাত্র এস্তের পাদিয়া স্পেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভিইকে জানান, ইরিওর ট্রেনে ১৪৬ জন যাত্রী ও একটি শিশু ছিল। অন্যদিকে, রেনফের ট্রেনে ছিলেন ৩৯৭ জন যাত্রী।
দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক এক সরকারি মন্ত্রীর নামও উঠে আসে। স্পেনের ব্যবসায়ী সংগঠন সিইওই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, সংগঠনটির ফাউন্ডেশনের প্রধান ফাতিমা বায়েনেস দুর্ঘটনায় জড়িত একটি ট্রেনে ছিলেন।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে মাদ্রিদ, তোলেদো, সিউদাদ রিয়াল ও কর্দোবায় বিশেষ কেন্দ্র স্থাপন করেছে স্পেনের সিভিল গার্ড। সংস্থাটি জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং তাদের স্বজনদের খুঁজে বের করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করাই এখন অগ্রাধিকার।
কী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার?
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ‘পুরো স্পেন শোকাহত।’ তার ভাষায়, এ দুর্ঘটনায় মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে এবং পরিবারগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, সরকার এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে। কোনো অবহেলা থাকলে তা প্রকাশ করা হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি পাওয়া গেলে কঠোরভাবে তার প্রতিকার করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
বিরোধী কনজারভেটিভ পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নুনিয়েস ফেইহো বলেন, এদিন রাজনৈতিক দায় নিয়ে আলোচনা করার সময় নয়। তবে দেশের অবকাঠামোতে কী ঘটছে, তা জানার অধিকার স্পেনের জনগণের রয়েছে।
বেশির ভাগ স্প্যানিশ রাজনীতিক বুধবার তাদের প্রকাশ্য কর্মসূচি বাতিল করেন এবং নির্বাচনী প্রচার স্থগিত রাখেন। তবে কট্টর ডানপন্থি ভক্স পার্টির নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল শোককে কাজে লাগিয়ে রেল অবকাঠামোর সমালোচনা বন্ধের প্রচেষ্টায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
বৃহস্পতিবার থেকে স্পেনে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শুরু হয়েছে। দেশটির রাজপরিবার নিহতদের স্বজন ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও প্রয়োজন হলে স্পেনকে সহায়তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
দুর্ঘটনাস্থলে দমকলকর্মী ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করে ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালানো হয়। আহতদের চিকিৎসা দিতে এলাকার হাসপাতালগুলো নিয়মিত অস্ত্রোপচারের কিছু কর্মসূচি স্থগিত করে। মাদ্রিদের রক্ত সঞ্চালন কেন্দ্রও জরুরি ভিত্তিতে রক্তদানের আহ্বান জানায়।
চলতি বছরে স্পেনে এটি দ্বিতীয় বড় ধরনের দ্রুতগতির রেল দুর্ঘটনা। জানুয়ারিতে দক্ষিণ স্পেনে একটি দ্রুতগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে তার পেছনের বগিগুলো রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের আরেকটি ট্রেনের পথে চলে যায়। ওই দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন।
