তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার: মিলছে না যেসব প্রশ্নের জবাব

তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার: মিলছে না যেসব প্রশ্নের জবাব

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সৌরির (২৮) মরদেহ উদ্ধার ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নিখোঁজের একদিন পর গতকাল বুধবার বিকেলে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। ইতিমধ্যে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। নিখোঁজের দিন সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরিবারকে কী বলে যেতে পারেননি তাহসিফ, যেখানে তার মরদেহ মিলেছে সেখানে তিনি কখনো যাননি তার বাবার ভাষ্যমতে। কীভাবেই বা সেখানে গেলেন? কে তাকে ডেকে নিল এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। রাত দেড়টা পর্যন্ত কোথায় ছিলেন, শেষ মেসেজ কে দিয়েছিল, কোন বিষয় নিয়ে তিনি আতঙ্কিত ছিলেন—এমনটাও আলোচনায় আসছে।
অভ্যুত্থানের পর চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন তাহসিফ সৌরি। আলোচনা আছে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উড়োজাহাজে করে ভারতে পালানোর ভিডিও প্রচার করেছিলেন।
অনেক কিছুই আজও অজানাই থেকে গেছে। যা রীতিমতো রহস্য তৈরি করেছে।
মৃত্যুর সঙ্গে ওই ভিডিও ধারণের কোনো যোগসূত্র আছে কি না যদিও এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন।

এদিকে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে এক জুনিয়র তার ছেলেকে বাসা থেকে ডেকে নেন। মাকে বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি তিনি। একাধিকবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেজ দিয়ে মাকে তাহসিফ জানান, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ। কেন ডেকেছিল দ্বীপ তা অজানা এখনো। 

বৃহস্পতিবার হেলাল বলেন, ঘটনার দিন তাহসিফ প্রায় সারা দিন তার মা হোসনে আরা বিথির সঙ্গে ছিলেন। মা-বাবার জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে তার এক বন্ধু ও জুনিয়র নিচ থেকে তাকে ডাক। তাহসিফ মাকে জানিয়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে যান।
হেলাল বলেন, ‘সে অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির। অত্যন্ত সামাজিক। ছোটবড় সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। সন্ধ্যার পরে দ্বীপ তাকে নিচ থেকে ডাকে। তাহসিফ তার মাকে বলে, মা দ্বীপ আসছে, একটু কথা বলে আসি। এসব বলে নিচে যায়, এরপর আর ফেরেনি সে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর মধ্যে ওর মা অনেকবার চেষ্টা করেছে, ও ফেরেনি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে সে মেসেজ দিয়েছে, সে আসছে। আম্মু আমি আসছি, এই রকম একটা মেসেজ দিয়েছে। এরপর থেকে তার অবস্থান আর জানা যায়নি।
ছেলেকে খুঁজতে বুধবার দুপুরের দিকে তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন বলে জানান হেলাল। বলেন, পুলিশ তখন তাকে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু ওই দিন বিকেলেই উত্তরখান থানার ওসি ফোন করে তার ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর জানান।
বলেন, ‘আমি তুরাগ থানায় গিয়েছিলাম বুধবার দুপুরের দিকে। তারা বললেন, এমন কোনো খারাপ সংবাদ নেই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। সন্ধ্যার আগে, সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার ওসি আমার সঙ্গে কথা বললেন। আমার নাম, ছেলের নাম নিশ্চিত হয়ে তারপর আমাকে জানালেন যে, নদীতে ডেডবডি পাওয়া গেছে।’

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটা রাজাবাড়ির ঘাটে। আটিপাড়া দিয়ে যেতে হয়। ওই এলাকায় আমার ছেলে কখনো যায়নি। এখন কারা বা কে তাকে হত্যা করেছে, এটা আমি জানি না।’

পরিবারের সঙ্গে তাহসিফের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়কাল এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে বাবার বক্তব্য ঘটনায় যে প্রশ্ন উঠেছে তার উত্তর এখনো জানা যায়নি।

হেলাল বলেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পালানোর দিন ভিডিও শেয়ার করার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল কি না, এটা সে আদৌ করেছে কি না, সে বিষয়ে আমাদের জানায়নি। এটা তার ডিপার্টমেন্ট বলতে পারবে। বিমান বাহিনী থেকে তাহসিফের চাকরি যাওয়ার কারণ হিসেবে ‘শৃঙ্খলাজনিত’ বলা হয়েছিল।

তাহসিফ কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না,  এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সে হুমকি-ধামকির  ব্যাপারে আমাদের কিছু বলেনি। তবে সে বলেছিল যে, সে একটু আশঙ্কা করছে।
এদিকে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে , তাহসিফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, নেত্র নিউজ হয়ে সর্বশেষ ভার্গো টোব্যাকোতে কর্মরত ছিলেন।

অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও তাহসিফ ধারণ করেছিলেন বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, এমন আলোচনা আগে থেকেই ছিল। মৃত্যুর বেশ কদিন আগে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে তাহসিফ নিজেই অভিযোগটিকে ‘প্রমাণহীন অভিযোগ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সঙ্গে এই অভিযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, জানতে চাইলে তাহসিফ সেই পডকাস্টে বলেন, এমনটি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সবকিছু প্রকাশ করতে পারবেন না বলেও অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে, নিজেকে তাহসিফের বন্ধু দাবি করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামামও নিজের ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। পোস্টে তিনি শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের ভিডিও ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তিনি লেখেন, গত পরশু রাতে সে বাইরে যায় এরপর এই ঘটনা। তার লাশের ছবিতে হাতে কাদা মাখা। বাকি সব ক্লিন, এইটা কিসের লক্ষণ আমি এখনি বলতে চাইনা। তবে এইটা ব্যক্তিগত কোনো কোন্দল বা এক্সিডেন্ট ক্লিয়ারলি প্রমাণিত না হলে। আমি ধরে নিব এইটা পলিটিক্যাল।

তিনি আরো লেখেন, ৫ই আগস্টের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর, তার মানহানি করা হয় নানান বিষয়ে কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি কেস করতে পারেনাই।

এদিকে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে নৌ পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার সময় ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পাওয়া যায় উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদীতে একটি মরদেহ ভাসছে। অজ্ঞাতনামা পুরুষের মরদেহ। যার বয়স আনুমানিক ২৮ বছর। লাশের পরনে সাদা পাজামা ও কালো জামা ছিলো। হাতে ঘড়ি ও পকেটে আইফোন পাওয়া যায়। মুখে হালকা দাড়ি আছে। তার সঙ্গে থাকা আইফোনের মাধ্যমে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির লাশ বলে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘গতকাল বুধবার জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বর থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে তুরাগ নদী থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ওই ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির। পরে তার এক আত্মীয়কে খবর দেওয়া হয়। সেখান থেকে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’