পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখন এক গভীর বৈপরীত্য দৃশ্যমান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে। জনসমর্থন সত্ত্বেও তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন বারবার বাধার মুখে পড়ছে। প্রশ্ন হলো, ইমরানের প্রতি জনসমর্থন কেন রাষ্ট্রের উপর কার্যকর চাপ তৈরি করতে পারছে না?
২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর থেকে কারাবন্দি ইমরান খান। বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে রয়েছেন তিনি। ৭৪ বছর বয়সী এই নেতার মুক্তির দাবিতে বারবার রাজপথে কর্মসূচি দিয়েছে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
সর্বশেষ, চলতি বছরের ৪ অক্টোবরেও খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদির নেতৃত্বে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেন দলটির সমর্থকেরা। তবে রাজধানীতে পৌঁছানোর আগেই আন্দোলন বাধার মুখে পড়ে। পরবর্তীতে ১১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকার খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করে প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করে এবং গভর্নরের শাসন চালু করে। সরকারের দাবি, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে প্রাদেশিক প্রশাসন। অন্যদিকে পিটিআইয়ের অভিযোগ, ইমরানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
রাজপথে আন্দোলন বারবার থেমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো প্রশাসনের সর্বাত্মক অবরোধ ও চরম বলপ্রয়োগ। পিটিআই যখনই লংমার্চের ডাক দেয়, তখনই ইসলামাবাদ ও সংলগ্ন প্রধান সড়কগুলো ভারী শিপিং কনটেইনার দিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। শহরগুলোকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করে যাতায়াত ব্যবস্থা অনেকটাই স্তব্ধ করে দেয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তথ্যপ্রযুক্তির ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। আন্দোলন চলাকালে দেশজুড়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল নেটওয়ার্কসেবায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর ফলে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় রাখতে পারে না মাঠপর্যায়ের আন্দোলনকারীরা।
ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের মধ্যেই টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট এবং গণগ্রেপ্তার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট বা এসিএলইডি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে আন্দোলন দমনে পুলিশি বাধা দেয়ার ঘটনা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মোট কর্মসূচির সংখ্যা কমে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
পিটিআই-এর এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের অতি-কঠোর বা 'হার্ড স্টেট' কৌশলের ভূমিকা। সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামো সামরিক কর্তৃত্বকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাস হওয়া ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে 'চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস' পদ তৈরি করা হয়। এই সংশোধনীর ফলে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সেনাপ্রধানের হাতে। একই সঙ্গে সেনাপ্রধানের কার্যকালের মেয়াদ তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়। এতে আসিম মুনিরের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট হয়ে গেছে।
ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর তাকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয় এবং আজীবন ফৌজদারি মামলা থেকে আইনি সুরক্ষা দেয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের আরেকটি ক্ষেত্র হলো বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। ২০২৪ সালের ২৬তম সংশোধনীতে বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক মামলা শুনতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের বিধান করা হয়। ২০২৫ সালের ২৭তম সংশোধনীতে গঠিত হয় ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত। নতুন নিয়োগ কাঠামোয় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
একইভাবে, অনলাইন মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার করা হচ্ছে আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা। পেকা আইনের ২০২৫ সালের সংশোধনীতে নির্দিষ্ট ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান করা হয়। আইনে মিথ্যা তথ্যের সংজ্ঞা অস্পষ্ট হওয়ায় সরকারের সমালোচক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। পাশাপাশি, ইন্টারনেট নজরদারি ও ফায়ারওয়াল ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ রয়েছে। এতে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
ইমরান খানের ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও, নির্বাচনী সাফল্যকে সরকার গঠনের ক্ষমতায় রূপ দিতে পারেনি পিটিআই। ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলটিকে ঐতিহ্যবাহী ‘ক্রিকেট ব্যাট’ প্রতীক ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। ফলে পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ৯৩টি আসনে জয়লাভ করেন তারা।
২০২৪ সালের ১২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ পিটিআইকে সংরক্ষিত আসন পাওয়ার যোগ্য ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় দেন। এই রায় কার্যকর হলে ক্ষমতাসীন জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যেত। তবে নির্বাচন আইন সংশোধন করে সরকার। রায় বাস্তবায়ন নিয়ে চলতে থাকে আইনি বিরোধ।
শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ২৭ জুন সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ আগের রায় বাতিল করে পিটিআইকে সংরক্ষিত আসনের অযোগ্য ঘোষণা করেন। ফলে সংরক্ষিত আসনগুলো পায়নি দলটি। অন্যদিকে, পিটিআইয়ের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের প্রাথমিক ভোটের হিসাব বদলে চূড়ান্ত ফলে অন্যদের বিজয়ী দেখানো হয়েছে।
দলটির দাবি, এভাবে তারা অন্তত ১৮০টি আসনে জয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যদিও এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। শেষ পর্যন্ত জোট সরকার গঠন করে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয়ী হলেও সরকার গঠন করতে পারেননি পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীরা।
আইনি জটিলতা ও আদালতের রায়গুলো যেন ইমরান খানের জন্য এক চক্রাকার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো মামলায় জামিন বা খালাস পেলেও অন্য মামলায় আটক থাকায় তার মুক্তি আটকে গেছে। সাইফার ও ইদ্দত মামলায় খালাস পেলেও, আল-কাদির ট্রাস্ট মামলায় ১৪ বছর এবং তোষাখানা-২ মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন তিনি। এসব সাজার বিরুদ্ধে আপিল বিচারাধীন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৯ মে-র সহিংসতা ও সামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী মামলার বিচার চলছে। এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে ইমরান ও তার দল।
কারাগারে ইমরান খানের আটকাবস্থার পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তার দীর্ঘ সময় নির্জন কারাবাসে থাকা এবং পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ সীমিত করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের বিশেষ দূত।
২০২৬ সালের আগস্টে অ্যামনেস্টি জানায়, আট মাসের বেশি সময় ধরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি ইমরান খান। এদিকে, তার আইনজীবীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকাকালে ইমরান খানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে। সময়মতো চিকিৎসা না দেয়ার অভিযোগও উঠেছে।
আন্দোলনে বারবার ধাক্কা খাওয়ার পেছনে পিটিআইয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও দায়ী। শীর্ষ নেতা কারাবন্দি থাকায় সংকটকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ঘাটতি দেখা যায়। ইমরান খানের পরিবারের সদস্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও প্রাদেশিক নেতাদের মধ্যে আন্দোলনের কৌশল নিয়ে মতবিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
বৈশ্বিক ভূরাজনীতিও পাকিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে কূটনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আসিম মুনিরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দেশটির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিও সরকারকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থাকলেও, তা পাকিস্তান সরকারের ওপর কতটা কার্যকর চাপ তৈরি করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, শুধু জনসমর্থন ও রাজপথের আন্দোলন দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মোকাবিলা করা কঠিন। ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের লংমার্চের পাশাপাশি প্রয়োজন দলের নেতৃত্বে সমন্বয়, বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল।
