লিবিয়ার সিংহাসনে বসতে চান সাদ্দাম হাফতার

আল জাজিরার নিবন্ধ

লিবিয়ার সিংহাসনে বসতে চান সাদ্দাম হাফতার

ফন্ট সাইজ:

লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে প্রায় সাত বছর ধরে তুরস্কের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের বিরোধিতা করা হয়েছে। ত্রিপোলিভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে তুরস্ক ওই সমঝোতা করেছিল। অথচ গত সপ্তাহে মাত্র এক দফা বৈঠকেই সেটি অনুমোদন করেছে পূর্বাঞ্চলের আইনসভা। গত ২০ অক্টোবর বেনগাজিভিত্তিক প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-এইচওআর) চুক্তিটি অনুমোদন করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এ ভোটের নিন্দা জানিয়েছে। একই অবস্থান নিয়েছে গ্রিস, ইসরাইল ও মিশর। তবে এই অনুমোদনকে তুরস্কের বিজয়ের চেয়ে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতারের পরিকল্পিত ধারাবাহিক উদ্যোগের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়া।

বর্তমানে ত্রিপোলি ও বেনগাজির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি সমঝোতা করানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বুলোসের উদ্যোগে এগিয়ে চলা এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে সাদ্দাম লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। তবে এ জন্য আঙ্কারার সমর্থন প্রয়োজন তার। কারণ, পশ্চিম লিবিয়ায় তুরস্কের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, দেশটির সমর্থন ছাড়া এ ধরনের কোনো সমঝোতা কার্যকর করা কঠিন। তাই তুরস্কের সম্মতি আদায় করতেই সমুদ্রসীমা চুক্তিটি অনুমোদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে সাদ্দামের প্রথম বড় পদক্ষেপ ছিল অনেকটা প্রাসাদ অভ্যুত্থানের মতো। ভোটের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে প্রতিনিধি পরিষদ থেকে স্পিকার আগুইলা সালেহকে সরিয়ে দেয়া হয়। টানা ১২ বছর তিনি এই পদে ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে পূর্ব লিবিয়ায় মিশরের প্রধান মিত্র এবং সমুদ্রসীমা সমঝোতা অনুমোদনের সবচেয়ে বড় বাধাটিকেও সরিয়ে দেয়া হয়। তবে সালেহকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়টি শুধু মিশরকে ঘিরে ছিল না। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে আরেকটি লক্ষ্যও পূরণ হয়েছে। স্পিকার এবং নামমাত্র সর্বাধিনায়ক হিসেবে সালেহ সেই আইনগত কর্তৃত্বের প্রতীক ছিলেন, যেখান থেকে খলিফা হাফতারের সামরিক নেতৃত্বের বৈধতা আসে। ওবেইদাত গোত্রের মধ্যে তার শক্তিশালী সমর্থনভিত্তিও রয়েছে। ফলে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলা, এমনকি তা নিয়ন্ত্রণ করার মতো সামর্থ্যও ছিল তার।

সালেহকে সরিয়ে দেয়ায় সাদ্দামের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সহজ হয়েছে। এই প্রক্রিয়া নীরবে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। খলিফা হাফতারের অগ্রসর বয়স যেকোনো সময় এ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। সালেহর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আল-সালহিন আবদুলনবি। তিনি একই ওবেইদি গোত্রের সদস্য এবং প্রতিনিধি পরিষদের লিবিয়া-তুরস্ক বন্ধুত্ব কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তার নিয়োগের মধ্য দিয়ে একদিকে গোত্রভিত্তিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে আইনসভাটি এখন কার নির্দেশনায় চলছে, সেই বার্তাও স্পষ্ট হচ্ছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনে
সাদ্দামের এই কৌশল সফল হবে কি না, তা নির্ধারিত হবে ওয়াশিংটনে। লিবিয়ায় একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রহের ওপর ভরসা করছেন তিনি। তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) তদবির এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগানের সুসম্পর্ক এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সাদ্দাম আশা করছেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রিস ও সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোসিয়ার আপত্তি এবং আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরাইলের অসন্তোষও অতিক্রম করা সম্ভব হবে। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গ্রিস, গ্রিক-সাইপ্রিয়ট ও ইসরাইলি অক্ষের দীর্ঘদিনের মার্কিন অংশীদারিত্বের সরাসরি সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান সাদ্দামের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সুবিধাও এনে দিতে পারে। এর ফলে তিনি নিজেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। একই সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে তার গোপন যোগাযোগ রয়েছে- এমন ধারণাও দূর করার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে ইউরোপ নিজেই নিজেকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বেনগাজি সফরে গিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার এবং সদস্যদেশগুলোর তিন মন্ত্রীকে বহিষ্কার করা হয়। ইউরোপের রাজধানীগুলো এর জবাবে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার পরিবর্তে প্রায় নতজানু মনোভাব দেখিয়েছে। এর এক বছরেরও কম সময় পর এথেন্সে সাদ্দামকে আতিথেয়তা দেয়া হয়। অথচ বিকল্প কোনো সমুদ্রসীমা সমঝোতার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া এড়িয়ে যান তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দুর্বলতার পেছনে রয়েছে অভিবাসন নিয়ে তাদের অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিক মনোযোগ। এর ফলে লিবিয়াবিষয়ক নীতি কার্যত পূর্ব লিবিয়ার উপকূল থেকে ক্রিট দ্বীপের দিকে যাত্রা করা নৌযানের সংখ্যা গণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাদ্দামকে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমায় টহল দিতে অনুরোধ করছে, সেই ইউনিয়নের পক্ষে ওই সমুদ্রসীমা নতুন করে নির্ধারণের জন্য তাকে মূল্য দিতে বাধ্য করা কঠিন।

সাদ্দামের পাশে আমিরাত, মিশরকে নিয়ে অনিশ্চয়তা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। সাদ্দামের সাফল্য নিশ্চিত করতে দেশটির যথেষ্ট কারণ রয়েছে। খলিফা হাফতারের ছেলেদের মধ্যে সাদ্দামই আমিরাতের প্রতি সবচেয়ে অনুগত। তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্রকে লিবিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে বসাতে পারলে হাফতার পরিবারকে ঘিরে এক দশকের বিনিয়োগেরও পূর্ণতা আসবে। অতীতে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা থাকলেও তুরস্কের পক্ষে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ মেনে নেয়া আমিরাতের কাছে খুব বড় মূল্য নয়। তবে তুরস্কের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে সাদ্দামের জন্য সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে মিশরকে ঘিরে।

চুক্তি নিয়ে মিশরের বিবৃতিতে মূলত দেশটির একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর সমঝোতার প্রভাব নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। বক্তব্যটি প্রায় পুরোপুরি আইনি যুক্তির ওপর দাঁড় করানো হয়েছে। এর অর্থ হতে পারে, কায়রো এখনো রাজনৈতিকভাবে নিজের বিকল্পগুলো খোলা রাখতে চাইছে।

তুরস্কের সঙ্গে মিশরের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। সুদান ও লোহিত সাগর ইস্যুতে এখন দুই দেশ অনেকটা একই অবস্থানে রয়েছে। ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী আকাক্সক্ষা নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগও তাদের আরও কাছাকাছি এনেছে। বাণিজ্যিক চুক্তির প্রস্তাব দিয়ে মিশরের বিরোধিতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে কায়রো চাইলে আঙ্কারার সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে হাফতার পরিবারের অন্য কাউকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নিতে পারে। এ জন্য দূরে তাকানোর প্রয়োজন নেই। সাদ্দামের ভাই খালেদ হাফতার লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেসের চিফ অব স্টাফ। তিনি কায়রোর অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ এবং গত এপ্রিলে প্রকাশ্যে মার্কিন উদ্যোগের সমালোচনা করেন। এমনটা ঘটলে তুরস্কের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান দর-কষাকষির হাতিয়ারটি ব্যবহার করে ফেলা সাদ্দামের হাতে আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। অথচ তার হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী অন্য একটি হাতিয়ার এমন, যা ব্যবহার করতে আমিরাত কখনোই তাকে দিতে চাইবে না।

সুদানের র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করলে তুরস্ক ও মিশর- উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। কারণ, উভয় দেশই সুদানের সেনাবাহিনীকে সমর্থন করে। কিন্তু এমন পদক্ষেপ নিলে সাদ্দাম এমন একটি সম্পর্ক বিপন্ন করবেন, যা হারানোর সামর্থ্য তার নেই। আবুধাবির এমন এক পৃষ্ঠপোষক, যার বিরোধিতা করার সাহস তিনি করতে পারেন না, এবং আঙ্কারার এমন এক অংশীদারের মধ্যে চাপে রয়েছেন সাদ্দাম, যে ইতিমধ্যে নিজের পুরস্কার আদায় করে নিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তিনি বাজি ধরছেন, ওয়াশিংটন সমঝোতা বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত দুই পক্ষকেই নিজের পাশে রাখতে পারবেন। এত বড় ঝুঁকি নিতে সাদ্দামের প্রস্তুতি তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পাশাপাশি হতাশারও ইঙ্গিত দিতে পারে। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা না হলে তার ভাইদের কিংবা নতুন ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধ তৈরি হতে পারে। সেই বিরোধ সহিংস রূপও নিতে পারে।বাবার পরাজয়ের দলিলই হতে পারে ছেলের ক্ষমতায় ওঠার সিঁড়ি
লিবিয়ার ইতিহাসে এক ধরনের নির্মম পরিহাস রয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সমঝোতাটি ছিল সেই মূল্য, যা ত্রিপোলি দিয়েছিল তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপের বিনিময়ে। ২০২০ সালে এই হস্তক্ষেপই রাজধানীর প্রবেশদ্বারে খলিফা হাফতারের অভিযান থামাতে সাহায্য করেছিল। তখন তার বাহিনী ও ভাড়াটে যোদ্ধারা দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। যে বাবা ত্রিপোলি দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তার ছেলে এখন সেই একই দলিলের ওপর ভর করে লালগালিচা বিছানো পথে ক্ষমতায় প্রবেশের স্বপ্ন দেখছেন, যে দলিল একসময় তার বাবার পরাজয় নিশ্চিত করেছিল। সাদ্দাম সফল হলে হাফতার পরিবারের সবচেয়ে অপমানজনক পরাজয়ের হাতিয়ারই তাদের রাজনৈতিক রাজবংশের ভিত্তিপ্রস্তরে পরিণত হবে। আর ওয়াশিংটন পিছিয়ে গেলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে ছেলের উচ্চাকাক্সক্ষার সমাধিলিপি।

(লেখক চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো এবং লিবিয়া ও সুদানবিষয়ক স্বাধীন কৌশলগত উপদেষ্টা। উত্তর আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চল নিয়েও তিনি কাজ করেন। অনলাইন আল জাজিরা থেকে তার লেখার অনুবাদ)