প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ করা ২৯টি দেশের নাগরিকের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
২৬ অক্টোবর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশন জোরালো প্রমাণ পেয়েছে যে রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশের নিয়োগ এজেন্ট ও সংস্থার সঙ্গে মিলে বিদেশি নাগরিকদের পাচার করে রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে।
প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে যেসব দেশের নাগরিকদের নিয়োগ করা হয়েছে, সেই ২৯টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে কমিশন।
কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি তদন্ত করেছে। এর মধ্যে ২৯টি দেশের পুরুষ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে তারা।
এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারত ও নেপাল এবং আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী পুরুষদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তাদের অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতাও সীমিত।
প্রতিবেদনে রাশিয়ায় ভ্রমণের জন্য ইস্যু করা ব্যবসায়িক ভিসার প্রসঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন এমন কিছু ভিসার অনুলিপি পেয়েছে, যেগুলোতে দেখা যায়, রাশিয়ার একটি বেসরকারি কোম্পানি ওই ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়োগ এজেন্টরা বিদেশি নাগরিকদের আকর্ষণীয় বেতনের বেসামরিক চাকরির প্রস্তাব দিতেন। পাশাপাশি তাদের ভিসা, ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেয়া হতো। দলবদ্ধভাবে তাদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর অনেককে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়।
প্রায়ই তাদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেয়া হতো। এরপর তারা জানতে পারেন, যে বেসামরিক চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটি নয়; বরং তাদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করতে হবে।
পরবর্তী সময়ে নিয়োগ করা এসব পুরুষকে ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধের অবস্থানে মোতায়েন এবং তাদের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য, তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন, বন্দি হয়েছেন অথবা নিখোঁজ বলে প্রতিবেদন করা হয়েছে।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করা কিংবা তাদের মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় রুশ কর্তৃপক্ষ মানবপাচার এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে।
প্রতারণামূলক বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রস্তাব এবং বিদেশি সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের জন্য অভিবাসনের পথ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের শোষণের আশঙ্কার বিষয়টি সামনে এনেছে তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি।
তবে কতজন বাংলাদেশিকে নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কতজন নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত প্রত্যেক বিদেশি নাগরিকই যে মানবপাচারের শিকার হয়েছেন, তা নয়।
