৯০ দিনের রসদ সংরক্ষণ করছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো

বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি?

৯০ দিনের রসদ সংরক্ষণ করছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ সামরিক ঘাঁটিকে এমনভাবে প্রস্তুত করার পরিকল্পনা নিয়েছে পেন্টাগন, যাতে বাইরের সরবরাহব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও অন্তত ৯০ দিন নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। সম্ভাব্য যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, সাইবার হামলা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নাশকতার পরিস্থিতিতে সামরিক ঘাঁটিগুলোর কার্যক্রম সচল রাখতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি এক স্মারকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ পরিকল্পনার কথা জানান।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর হেগসেথ ‘ফেডারেল অপারেশনস ফর রেজিলিয়েন্স, ট্রুপ রিসোর্সেস, এনার্জি, সাপ্লাই অ্যান্ড সারভাইভেবিলিটি’ বা ফোর্ট্রেস উদ্যোগের ঘোষণা দেন।
এর লক্ষ্য হলো, প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্র যাতে প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম ও উপকরণ সংগ্রহ এবং সামরিক অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখতে পারে।
হেগসেথ এ উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় বিমা পলিসি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, ফোর্ট্রেস নিশ্চিত করবে, যুক্তরাষ্ট্রকে যেন ‘সরবরাহ বন্ধ করে অনাহারে রাখা, অচল করে দেয়া কিংবা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা’ না যায়।

পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়াবে ফোর্ট্রেস
হেগসেথের স্মারক অনুযায়ী, পাঁচটি মূল ভিত্তির ওপর বাস্তবায়িত হবে এ উদ্যোগ। জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা: সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
সরবরাহব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা: সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানো। কৌশলগত প্রতিরক্ষা মজুত: জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক উপকরণ ও সরঞ্জাম সংরক্ষণ।
সামরিক স্থাপনার সুরক্ষা ও সাইবার প্রতিরোধক্ষমতা: হামলা, নাশকতা ও সাইবার আক্রমণের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সচল রাখা।
মহাকাশ ও যোগাযোগের তরঙ্গভিত্তিক সক্ষমতার স্থিতিস্থাপকতা: মহাকাশভিত্তিক সামরিক ব্যবস্থা এবং যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত বেতার তরঙ্গের কার্যক্রম সচল রাখা।

বিশ্বজুড়ে সংঘাত থেকে শিক্ষা
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সামরিক অভিযান পরিচালনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সময় এসব অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে তথাকথিত ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ বা প্রচলিত যুদ্ধের বাইরের নানা ধরনের হামলার ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব হামলার জন্য প্রায়ই রাশিয়াকে দায়ী করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, ডেটা কেবল ও জ্বালানি পাইপলাইনে নাশকতার মতো ঘটনাও এ উদ্বেগের অংশ।

অন্যদিকে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে আগে থেকেই জ্বালানির দাম চড়া। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় বাইরের সরবরাহের ওপর নির্ভর না করে সামরিক ঘাঁটিগুলোকে সচল রাখার বিষয়টি ওয়াশিংটনের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

৯০ দিন চলবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যোগাযোগ
ফক্স নিউজ ডিজিটালের রোববারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফোর্ট্রেস পরিকল্পনার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের সহায়তা ছাড়াই অন্তত ৯০ দিন কার্যক্রম চালানোর উপযোগী করে তোলা হবে।
এর মধ্যে থাকবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও পানির মজুত এবং সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগব্যবস্থা। বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেলেও সামরিক ঘাঁটিগুলো যেন নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করাই এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত সব প্রধান সামরিক স্থাপনার জন্য এ ৯০ দিনের মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে।

পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল রোববার এক্সে লিখেছেন, ‘ফোর্ট্রেস হলো কার্যকর কৌশলগত প্রতিরোধের একটি উদাহরণ। এর মাধ্যমে আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত, আগাম প্রস্তুত ও সক্ষম করে তোলা হবে।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আর নিরাপত্তার জন্য শুধু দুই মহাসাগরের ওপর নির্ভর করা যাবে না। এ ধরনের ধারণা পুরোনো হয়ে গেছে এবং তা বর্তমান হুমকির বাস্তবতা তুলে ধরে না।
পারনেলের ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং গ্রিনল্যান্ড ও পানামাসহ পশ্চিম গোলার্ধের ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষানীতিতে পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছেন।
তিনি বলেন, যুদ্ধের ধরন বদলেছে, হুমকিও বদলেছে। তাই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে।

ছোট পারমাণবিক চুল্লি ও বিশাল ব্যাটারি ব্যবহারের পরিকল্পনা
ফক্স নিউজ ডিজিটালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফোর্ট্রেসের আওতায় সামরিক ঘাঁটিগুলোতে বহনযোগ্য পারমাণবিক চুল্লি, বড় আকারের ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বেসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ করতে সক্ষম ছোট বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে বাইরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও সামরিক স্থাপনাগুলো নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
পারনেল বলেন, ‘পরবর্তী সংঘাত সম্ভবত একাধিক রণাঙ্গনে পরিচালিত হবে। বড় কোনো যুদ্ধের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি বোঝা যায়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।’