ফ্রান্সে শিক্ষা সংস্কারের ঘোষণা, তবু আন্দোলন অব্যাহত

ফ্রান্সে শিক্ষা সংস্কারের ঘোষণা, তবু আন্দোলন অব্যাহত

ফন্ট সাইজ:

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে শিক্ষাব্যবস্থায় একাধিক সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতি পরিবর্তন, উচ্চশিক্ষায় ১৫ হাজার নতুন আসন সৃষ্টি, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করা এবং শিক্ষাবৃত্তি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ঘোষণায় সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, সরকারের পদক্ষেপে সব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে এবং উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও মহাকাশবিষয়ক মন্ত্রী ফিলিপ ব্যাপতিস্ত সরকারের নতুন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সরকার শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ প্রশমনে এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা হলেও আন্দোলনের অবসান ঘটেনি।

ভর্তিব্যবস্থায় পরিবর্তনের পরিকল্পনা
ফ্রান্সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ব্যবহৃত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পারকুরসুপ (Parcoursup) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভর্তি প্রক্রিয়ার মানদণ্ড ও সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ভর্তি প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মানদণ্ড আরও স্পষ্ট করা হবে। আবেদন প্রত্যাখ্যানের কারণ জানানোর ব্যবস্থাও রাখা হবে। এরপর ২০২৮ সালে বর্তমান পারকুরসুপ ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের বিস্তারিত কাঠামো চূড়ান্ত করতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে একটি সংস্কার কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ঘোষণাটিকে ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত সংস্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

উচ্চশিক্ষায় ১৫ হাজার নতুন আসন
বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসনসংকট মোকাবিলায় ২০২৭ ও ২০২৮ সালে মোট ১৫ হাজার নতুন আসন তৈরির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০ হাজার আসন ব্রেভে দ্য তেকনিসিয়াঁ সুপেরিয়র (বিটিএস) পর্যায়ে, ৪ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিবিষয়ক ইনস্টিটিউটে এবং ১ হাজার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির চাপ বেশি হওয়ায় নতুন আসন সৃষ্টির উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এসব আসন বাস্তবে চালু হলে কতজন শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর।

ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ
সরকারের আরেকটি পরিকল্পনা হলো, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে তুলনামূলকভাবে কম সুবিধাপ্রাপ্ত অর্ধেক লিসেতে দশম শ্রেণির প্রতিটি ক্লাসে সর্বোচ্চ ২৮ জন শিক্ষার্থী রাখা। ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে এই ব্যবস্থা সব লিসেতে সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় দ্বিতীয় স্তরের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় পরিকল্পিত পদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং অতিরিক্ত ৫০০ শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময়ের ক্লাসের চাপ কমাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দিনের মাঝখানে অন্তত এক ঘণ্টার মধ্যাহ্নবিরতি নিশ্চিত করার উদ্যোগও ঘোষণা করেছে সরকার। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

বৃত্তি ও জীবনযাত্রার ব্যয়
ফ্রান্সে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবৃত্তি সমন্বয়ের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস উন্নয়নে এক বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ এবং লিসে সংস্কারে ২০৩০ সালের মধ্যে চার বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত ঋণসুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের ক্ষেত্রে সবার জন্য এক ইউরোর খাবার চালুর উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।

কেন থামছে না আন্দোলন
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে রয়েছে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো এসব সমস্যার সমাধানে জরুরি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার দাবি করছে।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের বক্তব্য, সরকারের কিছু ঘোষণা তাদের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সব দাবি পূরণ হয়নি। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় পর্যাপ্ত আসন, শিক্ষার্থীদের আর্থিক স্বাধীনতা এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ চান তারা।
লে মোঁদের ২৬ অক্টোবরের সরাসরি প্রতিবেদনে শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রতিনিধি লুই লেতুবলঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, সরকারের কিছু ঘোষণাকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সব দাবি পূরণ না হওয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা ৩১ অক্টোবর ও ৫ নভেম্বর নতুন কর্মসূচির ডাকও দিয়েছেন।

সরকারের সামনে বাজেটের চ্যালেঞ্জ
শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি এমন সময় এসেছে, যখন ফ্রান্সের সরকার সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মুখে রয়েছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় ঘোষিত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সরকারের ঘোষণায় শিক্ষা খাতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি থাকলেও আন্দোলনকারীরা সেগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চান। আগামী বাজেট, শিক্ষক নিয়োগ, নতুন আসন সৃষ্টি এবং ভর্তিব্যবস্থার পরিবর্তন কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই সরকারের উদ্যোগের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তাই কেবল শ্রেণিকক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মান, সমান সুযোগ এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।