কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তি নিয়ে কঠিন সতর্কতা দিয়েছেন মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবট প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়নের ফলে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার আশঙ্কা, শুধু অফিসের কাজ নয়, নির্মাণশিল্প ও কারখানার মতো শারীরিক শ্রমনির্ভর কাজও রোবটের দখলে চলে যেতে পারে। এই পরিস্থিতির জন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বাড়ানোর প্রবণতাকে দায়ী করেছেন বিশ্বের অন্যতম ধনী এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। গেটস বলেন, রোবট নিয়োগ করো, মানুষকে ছাঁটাই করো এবং পেছনে ফিরে তাকানোর দরকার নেই। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফাকেন্দ্রিক প্রণোদনাকাঠামো এমন মনোভাবই তৈরি করছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল।
কয়েক বছরে এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর ঘটনা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অফিসভিত্তিক কাজে এর প্রভাব পড়ছে। সফটওয়্যার তৈরি, তথ্য প্রবেশ করানো এবং গ্রাহকসেবার মতো তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণমূলক কাজ দ্রুত এআইয়ের আওতায় চলে আসছে। গত সপ্তাহে বার্কলেস ব্যাংক ঘোষণা করেছে, খরচ কমানোর লক্ষ্যে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এআই ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের বিশ্বব্যাপী কর্মীবাহিনীর ৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ হাজার চাকরি প্রতিস্থাপন করা হবে। এর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান এআইকে ‘ধীরে এগিয়ে আসা সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে চাকরি কেড়ে নিতে পারে এবং বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট করতে পারে। কারণ, তরুণরা সাধারণত কর্মজীবনের শুরুতে যেসব রুটিন ও প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ করতেন, সেগুলো এআই ইতিমধ্যে খুব কম খরচে দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে।
বিল গেটস সতর্ক করেছেন, মানবসদৃশ রোবটের ব্যবহার বাড়তে থাকায় নির্মাণকাজ ও কারখানার মতো শারীরিক শ্রমনির্ভর পেশাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে তার ধারণা, অদূর ভবিষ্যতে এআই পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান সত্তা হিসেবে মানুষের স্থানও দখল করতে পারে। দ্য অবজারভার পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে গেটস বলেন, উদ্ভাবনের দক্ষতা, অফিসভিত্তিক কাজের দক্ষতা এবং মানবসদৃশ রোবটের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক শ্রমের দক্ষতা- সবই এআইয়ের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হতে পারে। ব্যাপক বেকারত্বের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারগুলোকে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। এ জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। গেটস বলেন, এআইয়ের কারণে সামগ্রিক সমৃদ্ধি বাড়তে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারালে তাদের সহায়তায় সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নাও থাকতে পারে।
তার মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকার এই সময়ে রাষ্ট্রগুলোকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মধ্যে এআইয়ের কারণে সৃষ্ট বেকারত্বের সমস্যাও মোকাবিলা করতে হবে। গেটস বলেন, আপনারা বলতে পারেন, ধনী দেশগুলোকে এখন গিয়ে বলা-‘চলুন, আপনারা জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজটি করুন’- এর জন্য এটি খুব একটা ভালো সময় নয়। গেটস আরও পূর্বাভাস দিয়েছেন, ২০২০-এর দশকের শেষ নাগাদ এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারে। এর ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে বৃটেনের এক গবেষক একটি বড় এআই প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দিয়ে সতর্ক করেছিলেন, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এই প্রযুক্তি ‘আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারে’।
সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের সর্বশেষ সংস্করণগুলোর প্রশিক্ষণে কাজ করা ২৭ বছর বয়সী জ্যাকব কক্সন মানুষকে এআইয়ের ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন না করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে এআই যদি ‘সুপার ইন্টেলিজেন্ট’ বা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন হয়ে ওঠে, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। কক্সনের অভিযোগ, জনপ্রিয় ক্লড এআই ব্যবস্থার নির্মাতা অ্যানথ্রোপিক এবং চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই- যেখানে তিনি আগে কাজ করেছেন, কোনোটিই এআই নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘দায়িত্বশীল আচরণ করছে না’। সুপার ইন্টেলিজেন্স বলতে এমন এক পর্যায়কে বোঝায়, যখন কোনো কৃত্রিম ব্যবস্থা বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে যেকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে।
