বড় অর্থনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা

জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী

বড় অর্থনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা

ফন্ট সাইজ:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বড় অর্থনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। সফরে ঢাকা-টোকিও সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্পায়ন ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক জাপানের বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ভারতের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চারদিনের সফরে রোববার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ছাড়েন তারেক রহমান। সফরটি ২৬ থেকে ২৯শে অক্টোবর পর্যন্ত। ২৭শে অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সফরে জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন করবেন তিনি। জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্যও দেয়ার কথা রয়েছে তার। সফরসূচিতে রয়েছে চিবার ফুত্তসু শহরের এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়ায় টয়োটার কারখানা পরিদর্শন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতার দু’টি পৃথক উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব করার প্রস্তুতি রয়েছে। অন্যদিকে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে জাপান। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, এই সফরে ৮টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। যার মধ্যে ৩ থেকে ৪টি সই হতে পারে।

অর্থনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা: কূটনৈতিক সূত্র বলছে, জাপানের কাছে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব করতে চায় বাংলাদেশ। এতে ১২টি অগ্রাধিকার খাত রয়েছে। সহজ শর্তের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবের কিছু অংশ বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা হালনাগাদ বিগ-বি কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।

পরিবহন ও নগর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে প্রায় ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার চায় বাংলাদেশ। এ অর্থে মেট্রোরেল সমপ্রসারণ, রেলপথ ও বড় সেতু উন্নয়ন এবং চট্টগ্রাম-মাতারবাড়ী-কক্সবাজার অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাতারবাড়ী ও মহেশখালী ঘিরে শিল্প, বন্দর, পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়নেও প্রায় ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রস্তাবের প্রস্তুতি রয়েছে।

উৎপাদন-শিল্প, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ নির্মাণ, সেমিকন্ডাক্টর এবং ন্যানোপ্রযুক্তিতে জাপানি সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ গবেষণাগার স্থাপন ও রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। জ্বালানি খাতেও বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের এলএনজি চাহিদা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করছে।

বিগ-বি নিয়ে জাপানের নতুন পরিকল্পনা: বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা বিগ-বি উদ্যোগ নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এতে ভারতকে পুনরায় যুক্ত করতে আগ্রহী জাপান। কূটনৈতিক সূত্রের ধারণা, তারেক রহমানের সফরে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বিগ-বি উদ্যোগের সূচনা করেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন, বাণিজ্য, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন ছিল এর লক্ষ্য। পরে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে ‘বে-অব বেঙ্গল-নর্থইস্ট ইন্ডিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন’ উদ্যোগের প্রস্তাব সামনে আসে। এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন জাপানের এ পরিকল্পনাকে জটিল করেছে। বিগ-বিতে ভারতকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে আস্থা ও সমঝোতা প্রয়োজন। এ কারণেই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সফরে গুরুত্ব পেতে পারে।

মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র করার পরিকল্পনা: বিগ-বি বাস্তবায়নে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখছে জাপান। বন্দরটি বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন ও শিল্পায়নের কেন্দ্র হতে পারে। সড়ক, রেল, জ্বালানি অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে বন্দরটি যুক্ত হলে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে মাতারবাড়ীকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্প এবং সরবরাহব্যবস্থার সংযোগস্থল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। তবে ঢাকা মনে করে, বন্দরের সক্ষমতা প্রথমে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির চাহিদা পূরণে কাজে লাগাতে হবে। অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলে পরে আঞ্চলিক ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে।

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত: জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন শিল্পে কর্মীর চাহিদা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজে প্রতিবছর এক লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী জাপানে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য জাপানি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং নার্সিং, পরিচর্যা, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পে দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

চীনকে ঘিরে জাপানের অর্থনৈতিক হিসাব: নিক্কেই এশিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশে জাপানের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর আগ্রহও বিনিয়োগ পরিকল্পনার একটি বিবেচ্য বিষয়। জাপানের ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলের লক্ষ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় শুধু চীনের ওপর নির্ভর না করে অন্য দেশেও বিনিয়োগ বাড়ানো। বাংলাদেশের বড় ভোক্তাবাজার, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমব্যয় ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের সম্ভাবনা জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়াতে পারে।