তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে একাধিক প্রস্তাবনা বিশেষ কমিটিতে

তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে একাধিক প্রস্তাবনা বিশেষ কমিটিতে

ফন্ট সাইজ:

সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি ইতিমধ্যে ৯টি বৈঠক করেছে। ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জুলাইযোদ্ধা, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করে মতামত নেয় বিশেষ কমিটি। বিরোধী দলগুলোকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির একাধিক রূপরেখা সুপারিশ করেছে বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়াও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। তবে এসব বৈঠকে কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ কমিটির সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৯ই নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটির প্রস্তাবগুলো উঠছে না। বিশেষ কমিটি ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রের আরও বিভিন্ন প্রতিনিধিদের বৈঠক করে মতামত নেবে।

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আলোচনার প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় তারা। সবার মতামতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাবগুলো জানুয়ারির অধিবেশনে উত্থাপন করা হতে পারে। বিশেষ কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি মানবজমিনকে বলেন, আমাদের আরও কয়েকটি বৈঠক বাকি আছে। আগামী ২৮শে অক্টোবর পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। গত বৈঠকে আইন বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু ভালো মতামত এসেছে। তবে এখনো কোনো কিছুই আমরা চূড়ান্ত করিনি। সবার মতামতগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাবগুলো আমরা রিপোর্ট আকারে সংসদে উপস্থাপন করবো। এসব প্রস্তাব নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তারপর সব শ্রেণির মানুষের কাছে যেটি গ্রহণযোগ্য হবে সেটিই চূড়ান্ত করা কবে। বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি না আসার বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, কমিটিতে তাদের প্রতিনিধি না এলেও সংসদের আলোচনায় তারা থাকবেন বলে আশা করছি।

তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি নিয়ে এসেছে যেসব প্রস্তাব
পরবর্তী নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নির্ধারণে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব এসেছে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির আলোচনায়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- সংসদের উচ্চকক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্ট, সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে নির্বাচিত স্পিকার এবং উভয়পক্ষের সম্মতিতে মনোনীত অন্য কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়ার ভাবনা। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠনপ্রক্রিয়া, কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কেউ কেউ প্রস্তাব করেছেন, সংসদের উচ্চকক্ষ যদি নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে বিলুপ্ত না হয়, তাহলে উচ্চকক্ষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা রাখা যায় কিনা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আলোচনায় এসেছে কয়েকটি বিকল্প। প্রথমত, সংসদের উচ্চকক্ষ বহাল থাকলে এর ভাইস প্রেসিডেন্টকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব এসেছে। দ্বিতীয়ত, সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে নির্বাচিত স্পিকারকে এ দায়িত্ব দেয়ার বিষয়েও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। এ ছাড়া স্পিকার ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিকে দুই পক্ষের সম্মতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের বিধান রাখার প্রস্তাবও এসেছে। তবে এসব প্রস্তাবের কোনোটিই এখন পর্যন্ত কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্টদের লিখিত মতামত দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে মতভেদ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, এটি যেহেতু অত্যন্ত কন্টেনশিয়াস (তর্ক-বিতর্কের) ইস্যু এবং জুলাই সনদে আমি খেয়াল করে দেখেছি, ৯টি পদ্ধতি আছে, তার মধ্যে ৮টির ব্যাপারেই সমস্ত দলের ঐকমত্য আছে। তো একটি ব্যাপারে মতভেদ আছে, এটি তো এমন কোনো বড় ব্যাপার নয়। বৈঠকে আমি বলেছি, অন্তত এটি যেন যতগুলো বিরোধী দল আছে, তাদের সঙ্গে মতক্যৈর ভিত্তিতে করা হয়। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে, কমিটির পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়েছে, তারা অনেক রকম চেষ্টা করেছেন।

এদিকে গতকাল মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারেই রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে তার অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সর্বোচ্চ আদালত থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী সম্পর্কিত রায় বাতিল হয়েছে। আইনসভার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার প্রতিস্থাপন করতে হবে।

সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের প্রস্তাব
সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনপ্রণয়ন এবং নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে ন্যস্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। উচ্চকক্ষের পরিবর্তে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হয় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

উচ্চকক্ষ গঠন আসনের নাকি ভোটের আনুপাতিক হারে
সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে নতুন প্রস্তাব উঠেছে। এতে ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষের অর্ধেক আসন এবং সংসদের আসনের অনুপাতে বাকি অর্ধেক আসনের সদস্যদের নির্বাচিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের অবস্থান অটুট থাকার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমস্যার সমাধান হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষকের প্রস্তাব ছিল, উচ্চকক্ষ গঠন হতে পারে ১০৫ সদস্যের। এর মধ্যে সংসদীয় আসন অনুযায়ী ৫০টি এবং ভোটের অনুপাতে ৫০টি আসনের সদস্যদের নির্বাচন করা হবে। আর ৫টি আসনের সদস্য রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেবেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

বৈঠকে অংশ নেয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষাবিদ এই প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। তার ভাষ্য, এই প্রস্তাব গৃহীত হলে সংবিধানে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টি করা যায়, উচ্চকক্ষের স্পিকার পদাধিকার বলে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকবেন। সরকার ও বিরোধী দলের মনোনয়নে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য উপদেষ্টারা উচ্চকক্ষ থেকেই মনোনীত হবেন। একই সঙ্গে তিনি সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদ ৪ বছর ও উচ্চকক্ষের মেয়াদ ৬ বছর করার প্রস্তাব দেন। এতে সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও কোনো একটি নির্বাচিত সংসদ সবসময় বহাল থাকবে।

উল্লেখ্য, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে গত ১৩ই জুলাই সংসদে ১৭ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। বিরোধী দল থেকে এই কমিটিতে পাঁচজনের নাম দেয়ার অনুরোধ করেছিল সরকারি দল। তবে কারও নাম না দিয়ে কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী দল।