ফ্রান্স থেকে ইতালি, ইউরোপজুড়ে বাড়ছে সামাজিক অসন্তোষ, নেপথ্যে কী

ফ্রান্স থেকে ইতালি, ইউরোপজুড়ে বাড়ছে সামাজিক অসন্তোষ, নেপথ্যে কী

ফন্ট সাইজ:

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিক্ষোভ ও সামাজিক প্রতিবাদ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ, পর্তুগালে আবাসনসংকট, স্পেনে বাড়িভাড়া ও পেনশন, ইতালিতে মজুরি ও জনসেবা এবং বেলজিয়ামে সরকারি ব্যয়সংকোচন ও শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি নিয়ে রাজপথে নেমেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, দেশভেদে দাবির পার্থক্য থাকলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, বাসস্থানের সামর্থ্য এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এসব প্রতিবাদের একটি অভিন্ন পটভূমি।
তবে এসব বিক্ষোভকে একক কোনো ইউরোপীয় আন্দোলন বা অভ্যুত্থান হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ নেই। বরং বিভিন্ন দেশের নিজস্ব সংকটের মধ্যে কিছু অভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে।

ফ্রান্স: জীবনযাত্রার ব্যয় থেকে বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদ
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পটভূমিতে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষকসংক্রান্ত সমস্যা, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ পরবর্তী সময়ে শ্রমিক ও অন্যান্য বিক্ষোভকারীদের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
রয়টার্সের ২৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেদিনের বিক্ষোভে দেশজুড়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার বলে জানিয়েছে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ। প্যারিসে অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারম মোতায়েন করা হয়েছিল। অধিকাংশ সমাবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।

এই পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে মানুষের প্রতিবাদ; অন্যদিকে সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা। সব বিক্ষোভকারীকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করা যেমন তথ্যসম্মত নয়, তেমনি সহিংসতার ঘটনাগুলো উপেক্ষা করাও সঠিক হবে না।

পর্তুগাল: আবাসনসংকট কেন বড় প্রতিবাদের কারণ?
পর্তুগালে বাড়ির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধি আবাসন নিয়ে অসন্তোষকে তীব্র করেছে। লিসবন ও পোর্তোতে বাসস্থানের সংকট এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে।
রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিসবন ও পোর্তোর জনসমাগমস্থলে প্রতিবাদকারীদের তাঁবু সরিয়ে দেওয়ার পরও মানুষ সেখানে ফিরে এসে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পুলিশ অভিযানে ৫৫ জনকে আটক করেছিল।
রয়টার্সের একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বড় শহরগুলোতে বাসস্থানের খরচ সাধারণ মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে।
বিক্ষোভকারীদের আপত্তির আরেকটি বিষয় হলো সরকারের প্রস্তাবিত ভাড়াবাজার সংস্কার। প্রস্তাবটি বাড়িওয়ালাদের জন্য ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ সহজ করা এবং নতুন ভাড়ার চুক্তিতে ভাড়ার সীমা তুলে দেওয়ার দিকে যাচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। সরকার মনে করছে, এতে বাড়িওয়ালারা আরও বেশি বাসস্থান ভাড়ার বাজারে আনতে উৎসাহিত হতে পারেন। অন্যদিকে ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এতে ভাড়া আরও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, পর্তুগালের প্রতিবাদে শুধু বাড়ির দাম নয়, আবাসননীতি এবং ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্পেন: বাড়িভাড়া, উচ্ছেদ ও পেনশন নিয়ে উদ্বেগ
স্পেনে আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে। মাদ্রিদসহ বিভিন্ন শহরে ভাড়াটিয়াদের অধিকার ও সাধ্যের মধ্যে বাসস্থানের দাবিতে সমাবেশ হয়েছে। বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আবাসন নিয়ে জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

রয়টার্সের ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে মাদ্রিদে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে তাঁর বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনা এবং তা ঘিরে জনক্ষোভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নারীর বাড়িভাড়া আগে মাসে ৫৭০ ইউরো ছিল; বাড়িটি নতুন মালিকের অধীনে যাওয়ার পর তা বেড়ে ১ হাজার ৬৫০ ইউরোতে দাঁড়ায়। ঘটনাটি স্পেনে ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা ও উচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে আসে।
এদিকে ২৪ অক্টোবর মাদ্রিদে পেনশনব্যবস্থা ও অবসরকালীন অধিকার সুরক্ষার দাবিতে সমাবেশের খবর প্রকাশিত হয়েছে। মূল্যস্ফীতির মধ্যে পেনশনের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা এবং সরকারি পেনশনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
স্পেনের পরিস্থিতি তাই শুধু আবাসনসংকটে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মজীবী মানুষ, ভাড়াটিয়া ও পেনশনভোগীদের ভিন্ন ভিন্ন দাবি দেশটির বৃহত্তর সামাজিক আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে।

ইতালি: মজুরি, জ্বালানি ও সরকারি পরিষেবা
ইতালিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে মজুরি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে; কিছু স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
কিছু এলাকায় কৃষকেরা জ্বালানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবাদ করেছেন। তাদের বক্তব্য, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষিকাজের ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। ইতালির অন্য এলাকাতেও জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।

এখানে আন্দোলনের দাবি একমাত্রিক নয়। কৃষকেরা উৎপাদন ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর অন্য বিক্ষোভকারীরা মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আবাসন নিয়ে দাবি তুলছেন। এসব দাবি একই সময়ের সামাজিক অসন্তোষের অংশ হলেও প্রত্যেকটির পেছনে আলাদা বাস্তবতা রয়েছে।

বেলজিয়াম: সরকারি নীতি ও শিক্ষা খাত নিয়ে প্রতিবাদ
বেলজিয়ামেও সরকারি ব্যয়সংকোচন, শিক্ষা খাত এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভের খবর প্রকাশিত হয়েছে। লে মোঁদের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯ অক্টোবর ব্রাসেলসে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতির বিরুদ্ধে কয়েক দশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। ১৭ অক্টোবরও ব্রাসেলসে প্রতিবাদের খবর পাওয়া যায়।
তবে বেলজিয়ামের সব বিক্ষোভের দাবি এক নয়। সরকারি ব্যয়সংকোচনের বিরোধিতা, শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি এবং সামাজিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন কর্মসূচিতে উঠে এসেছে। তাই দেশটির পরিস্থিতিকে শুধু জ্বালানির দাম বা মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে আন্দোলনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বাদ পড়ে যাবে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশেও কি একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে?

ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি ও বেলজিয়ামের পাশাপাশি গ্রিস ও আলবেনিয়াতেও সাম্প্রতিক প্রতিবাদের খবর এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইউরোপের কয়েকটি দেশে তরুণদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি নীতি নিয়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে।
তবে সব দেশের প্রতিবাদের কারণ একই নয়। গ্রিসে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও আবাসন নিয়ে অসন্তোষের খবর এসেছে। আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে দুর্নীতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মান নিয়ে দাবি যুক্ত হয়েছে। ফলে ইউরোপের সব প্রতিবাদকে একটি অভিন্ন আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার বদলে দেশভিত্তিক কারণগুলো আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

এই অসন্তোষের অভিন্ন কারণ কী?

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি বিষয় বারবার সামনে আসে—জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান, আবাসনের উচ্চ খরচ এবং শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ।
রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের বিশ্লেষণে জ্বালানি ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট বাজারের অস্থিরতাকে ইউরোপের অর্থনৈতিক চাপের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইউরোপের সামাজিক অসন্তোষের সব কারণকে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফল হিসেবে দেখা যাবে না। আবাসনসংকট, মজুরি, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবার মতো সমস্যার নিজস্ব জাতীয় ও দীর্ঘমেয়াদি পটভূমি রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও মনে রাখা দরকার: মূল্যস্ফীতির হার কমলেও আগে বেড়ে যাওয়া দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। আয় সেই অনুপাতে না বাড়লে পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ থেকে যেতে পারে। তবে প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি বুঝতে সংশ্লিষ্ট দেশের মজুরি, আবাসন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি নীতির তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইউরোপজুড়ে কি একক অভ্যুত্থান চলছে?

এখন পর্যন্ত পর্যালোচিত নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনগুলো এমন সিদ্ধান্ত সমর্থন করে না যে ইউরোপজুড়ে একক কোনো অভ্যুত্থান চলছে কিংবা সব দেশের বিক্ষোভ একই সংগঠনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিবাদের সময় কাছাকাছি হওয়া বা কিছু দাবির মধ্যে মিল থাকা নিজে থেকেই অভিন্ন নেতৃত্ব বা সমন্বিত পরিকল্পনার প্রমাণ নয়।

ফ্রান্সে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয়, পর্তুগালে আবাসননীতি, স্পেনে বাড়িভাড়া ও পেনশন, ইতালিতে মজুরি ও জনসেবা এবং বেলজিয়ামে সরকারি নীতি ও শিক্ষা খাতের মতো বিষয়গুলো আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিছু আন্দোলন একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে; কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে প্রমাণিত সমন্বিত আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

সামনে কী হতে পারে?
এই বিক্ষোভগুলোর পরিণতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো মানুষের দাবির জবাবে কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। আবাসনসংকট মোকাবিলা, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা এবং জ্বালানির ব্যয় সামলানোর মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অসন্তোষের কিছু কারণ প্রশমিত হতে পারে। তবে কোন পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং ভাঙচুর, লুটপাট বা মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি।
ইউরোপের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাই একক কোনো অভ্যুত্থানের প্রমাণ নয়; বরং বিভিন্ন দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বাসস্থান, আয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষের বহুমাত্রিক প্রকাশ। এই অসন্তোষ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার উত্তর নির্ভর করবে রাজপথের দাবির জবাবে সরকারগুলো বাস্তবে কী পরিবর্তন আনে তার ওপর।