দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে অবরোধ চলাকালে পর্যটকদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় সাজেকে আটকে পড়া প্রায় ৪ হাজার পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সমপ্রতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে গত ১১ থেকে ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত ইউপিডিএফ’র সদস্যরা গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। পরবর্তীতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ১৬ থেকে ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ স্থগিত রাখা হলেও, ২২শে অক্টোবর থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা এবং সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমার নেতৃত্বে আবারও সড়ক অবরোধ শুরু হয়। এতে সাজেক ভ্রমণ শেষে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রায় ৪ হাজার পর্যটক আটকা পড়েন।
আটকেপড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোন বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বিশেষ নিরাপত্তা স্কট পরিচালনা শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়ক বন্ধ করে দিলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ পর্যটকদের নিরাপদে পার করে দিতে তাদের সঙ্গে আলোচনা ও মধ্যস্থতার চেষ্টা চালায়। তবে বেলা ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে অবরোধকারীরা হঠাৎই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে পর্যটকদের বহর পুনরায় সচল করা হয়। পরবর্তীতে বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পর্যটকদের গাড়ি লক্ষ্য করে ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। পর্যটকদের জীবন রক্ষার্থে সেনা টহল দল দ্রুত পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে হামলাকারীরা স্থান ছেড়ে পালিয়ে যায়। সেনা ও পুলিশের সাহসিকতায় কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই শেষ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
বাঘাইছড়ি সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক জানান, ‘আটকেপড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়ি পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সাধারণ জনগণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইউপিডিএফ এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।’ নিরাপত্তাবাহিনী জানায়, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে জনজীবন ও পর্যটন খাত ব্যাহত করাই ছিল সন্ত্রাসীদের প্রধান উদ্দেশ্য। বর্তমানে সাজেক ও সংলগ্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে এলাকায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে।
সাজেকে পর্যটক বহরে সশস্ত্র হামলা, দুই সংগঠনের নেতাদের দায়ী করলো পুলিশ
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা দিয়ে ফিরিয়ে আনার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ইউপিডিএফ এবং অবরোধের ডাক দেয়া দু’টি সংগঠন সাজেক রক্ষা গণ-অধিকার পরিষদ ও সাজেক কার্বারি এসোসিয়েশনের নেতাদের দায়ী করেছে পুলিশ। এসব সংগঠনের নেতা বাবু ধন চাকমা ও নতুন জয় চাকমার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব। বৃহস্পতিবার বিকাল পৌনে ৩টার দিকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, অবরোধের কারণে সাজেকে আটকেপড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় তাদের সাজেক থেকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়।
পর্যটকবাহী গাড়িবহর সকাল ১১টার দিকে উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথা হয়। পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের চলাচলের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় এবং একপর্যায়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে বলে অভিযোগ করেন পুলিশ সুপার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। পুলিশ সুপার জানান, পর্যটকবাহী গাড়িবহরকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সশস্ত্র হামলাকারীদের থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। দুপুর ১টার দিকে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় পাথর ও ইটপাটকেলের আঘাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাঁচজনের বেশি সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশ সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, সাজেকে চলমান অবরোধ ও সাম্প্রতিক সংঘাতের পেছনে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। সেখানে দু’টি পক্ষের মধ্যে বিরোধের বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অবরোধের নেতৃত্বে থাকা সাজেক রক্ষা গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি বাবুধন চাকমা এবং কার্বারি এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুনজয় চাকমার নাম উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, তাদের নেতৃত্বেই অবরোধ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
শনিবার খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটিতে আধাবেলা সড়ক অবরোধের ডাক
খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’। বৃহস্পতিবার বিকালে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাঙ্গামাটির সাজেক থেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার দাবিতে ডাকা সড়ক অবরোধে হামলা, লাঠিচার্জ, ঘরবাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ আগামীকাল রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা শান্তিপূর্ণ সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে। সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক নির্মল চাকমার পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শনিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথ অবরোধ চলবে।
ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা ওই অবরোধ সফল করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের সব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং দুই জেলার সব যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। বিবৃতিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কার্বারি এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা যৌথভাবে কর্মসূচির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তবে অবরোধের সময় এম্বুলেন্স, রোগী ও লাশবাহী গাড়ি, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের গাড়ি আওতামুক্ত থাকবে।
