দূর থেকে মনে হয়, রান আসছে। জয়ের আশাও জাগে। কিন্তু একটু এগোলেই সব হিসাব উল্টে যায়। একের পর এক উইকেটের পতন, ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিল—শেষ পর্যন্ত প্রাপ্তি সেই হতাশা। বাংলাদেশের ওয়ানডে ব্যাটিং এখন যেন মরীচিকা। সম্ভাবনার আভাস আছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
সবশেষ ১৫ ওয়ানডের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দৈন্যদশাটাই সামনে নিয়ে এসেছে। এই সময়ে ৯ ম্যাচে হেরেছে দল, জয় পেয়েছে মাত্র ৬টিতে। পরাজিত ৯ ম্যাচের ৭টিতেই বড় কারণ ব্যাটারদের ব্যর্থতা। কখনো লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অল্প রানেই গুটিয়ে গেছে ইনিংস, কখনো আবার বোলারদের লড়াইয়ের পুঁজি এনে দিতে পারেননি ব্যাটাররা। যদিতও দলের অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয় জানিয়েছেন, দলের ভেতরে সবকিছু ঠিকঠাক আছে। তাঁদের প্রত্যাশা, ব্যাটিংয়ে ভালো শুরু পাওয়া। কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ব্যাটারদের কাছ থেকে ধারাবাহিকতা মিলছে না, চাপের মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না দায়িত্বশীলতার ছাপ। ওয়ানডে বিশ্বকাপের আর এক বছরও বাকি নেই। এমন সময়ে ব্যাটিংয়ের এই ভঙ্গুর দশা দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই।
বাস্তবতা স্বীকার করছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমনও। দৈনিক মানবজমিনকে তিনি বলেন, ‘এটি (ব্যাটিং ব্যর্থতা) অবশ্যই একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে টপ অর্ডারে। যেসব ম্যাচে দল জয় পেয়েছে, সেগুলোতে টপ অর্ডারের অবদান ছিল স্পষ্ট। আমাদের ব্যাটারদের স্কিল নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে সব ফরম্যাটেই ওপেনিং ও টপ অর্ডারে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ভীষণ জরুরি।’ সবশেষ ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৭১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট হয় বাংলাদেশ। শুধু এই ম্যাচ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ব্যাটারদের বারবার অসহায় আত্মসমর্পণ করতে দেখা গেছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৪১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ১১৬ রানে গুটিয়ে যাওয়া কিংবা আফগানিস্তানের বিপক্ষে মাত্র ১৬০ রানে অলআউট হওয়ার ঘটনাগুলোও সেই ব্যর্থতারই প্রমাণ। এসব ম্যাচে প্রতিপক্ষের বোলিং সামলানোর পাশাপাশি নিজেদের স্নায়ু ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। সমস্যাটা শুধু রান তুলতে না পারার নয়, পুরো ইনিংসজুড়ে টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়েও। আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে যেখানে বড় সংগ্রহ গড়া কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ্য তাড়া করার জন্য ব্যাটারদের পরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল ক্রিকেট খেলতে হয়, সেখানে বাংলাদেশ নিয়মিতই মাঝপথে পথ হারাচ্ছে।
সবশেষ ১৫ ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নেমে দুবার ৫০ ওভার পূর্ণ হওয়ার আগেই অলআউট হয়েছে দল। পরে ব্যাট করতে নেমে এই ঘটনা ঘটেছে ছয়বার। ব্যাটিংয়ের এই চিত্রে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ টপ অর্ডার নিয়ে। শুরুতেই উইকেট হারালে ইনিংস মেরামতের দায়িত্ব পড়ে মিডল অর্ডারের ওপর। কিন্তু সেখানেও দায়িত্ব নিয়ে খেলার ঘাটতি স্পষ্ট। কেউ কেউ উইকেটে থিতু হওয়ার আগেই অপ্রয়োজনীয় শট খেলছেন, আবার কেউ চাপের মুখে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না। ফলে ছোট লক্ষ্যও হয়ে উঠছে পাহাড়সম, আর বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে লড়াইয়ের আগেই ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ছে দল। তবে ব্যাটিং ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় কন্ডিশনকে পুরোপুরি দায়ী করতে নারাজ হাবিবুল বাশার। তাঁর কথায়, ‘সব সময় ব্যাটিংবান্ধব কন্ডিশন পাওয়া যাবে না। তবে সেটাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো যাবে না। মূল বিষয় হলো, একটু ভিন্ন বা চ্যালেঞ্জিং কন্ডিশনে আমাদের মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। খেলোয়াড়দের স্কিলে ঘাটতি নেই, কিন্তু মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতায় উন্নতি আনতে হবে। বড় মঞ্চে ভালো করতে হলে এটি আবশ্যক।’
প্রধান নির্বাচকের বক্তব্যে সমস্যার একটি দিক স্পষ্ট—দক্ষতার পাশাপাশি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যও বাড়াতে হবে। তবে সেই উন্নতির প্রতিফলন মাঠে দেখা না গেলে আশাবাদ দিয়ে সংকট কাটবে না। ব্যাটারদের আত্মবিশ্বাস ফেরানো, টপ অর্ডারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং চাপের মুহূর্তে দায়িত্বশীল ক্রিকেট খেলার বিকল্প নেই। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাই বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন, ব্যাটিংয়ের এই সংকট কাটবে কীভাবে? কেবল ভালো শুরুর প্রত্যাশা কিংবা খেলোয়াড়দের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখলেই হবে না, খুঁজে বের করতে হবে ব্যর্থতার কারণও। কারণ, ক্রিকেটে মরীচিকা দেখে জয় পাওয়া যায় না। জিততে হলে রান করতে হবে, গড়তে হবে লড়াই করার মতো ইনিংস।
