‘বিসিবি নির্বাচনে অনিয়ম’ সত্য খুঁজতে তদন্ত কমিটি

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা গুঞ্জন আর অনিয়মের অভিযোগ অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নেয়া হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এ নিয়ে একটি বড়সড় পদক্ষেপ নিয়েছে। গঠিত হয়েছে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি। পাঁচ সদস্যের এই কমিটিকে একটি কঠিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিসিবি’র সর্বশেষ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, মূলত সেগুলোই খতিয়ে দেখবে তারা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এই উদ্যোগে এরই মধ্যে সম্মতি জানিয়েছে। এনএসসির যুগ্মসচিব মো. সোলায়মান খান স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। তবে তদন্তের জন্য কমিটিকে খুব বেশি সময় দেয়া হয়নি। তাদের হাতে সময় আছে মাত্র পনেরো কার্যদিবস। এই নির্দিষ্ট সময়ের মাঝেই তদন্তের যাবতীয় কাজ শেষ করতে হবে। এরপর মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। দেশের ক্রিকেটের হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতেই এমন বিশেষ উদ্যোগ। দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন এই প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে আছেন। ক্রিকেট অঙ্গনে এখন চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। বোর্ড কর্মকর্তাদের মাঝেও দেখা যাচ্ছে থমথমে ভাব। এই তদন্ত রিপোর্টের ওপরই নির্ভর করছে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বোর্ডের ভবিষ্যৎ।
এই তদন্ত কমিটি গঠনের নেপথ্যে রয়েছে একটি বড় প্রেক্ষাপট। আর এই প্রেক্ষাপটের মূল কেন্দ্রে আছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা ক্রিকেটার তামিম ইকবাল। নির্বাচনে দৃশ্যমান অনিয়মের প্রতিবাদে তিনি শুরুতেই নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি একেবারেই চুপ থাকেননি। এরপর ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের সংগঠকদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসেন তিনি। ৭৬টি ক্লাবের মধ্যে ৫০টি ক্লাবই তার সঙ্গে হাত মেলায়। আবাহনী ও মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলোও এই কাতারে শামিল হয়। তারা সবাই মিলে সরাসরি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে গিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয়। তাদের দাবি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। নির্বাচনটি সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে, তাই একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। তারা বর্তমান বিসিবি পরিচালনা পর্ষদকে অবৈধ ঘোষণা করে এর প্রতিবাদে ঘরোয়া ক্রিকেটের বিভিন্ন লীগ বর্জন করা শুরু করে। তামিমের মতে, দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশে সত্য প্রকাশের এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। আন্দোলনের এই হাওয়া শুধু ঢাকার ক্লাবগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংগঠকরাও দ্রুত এই প্রতিবাদে যুক্ত হন। তারা এনএসসিতে আরও দুটি পৃথক আবেদন জমা দেন, যার অভিযোগগুলো ছিল বেশ গুরুতর। বলা হচ্ছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রীতিমতো নজিরবিহীন অনিয়ম করা হয়েছে। ১৬ দিন পার হওয়ার পর হঠাৎ করেই ৫৪ জন কাউন্সিলর পাল্টে ফেলা হয়। সেখানে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে নতুন নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি বিশেষ পক্ষকে বিনা বাধায় জয়ী করতেই এমন অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রামের সাবেক সংগঠক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর এসব অভিযোগ নিয়ে বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই নির্বাচনী কারচুপির বিস্তারিত রূপরেখা সবার সামনে তুলে ধরেন। সুতরাং, গঠিত এই তদন্ত কমিটির কাজটা মোটেও সহজ হবে না। তাদের প্রতিটি অভিযোগের একেবারে গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে। মাঠের ক্রিকেট বর্তমানে একপ্রকার স্থবির হয়ে আছে। ক্লাবগুলো মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানানোয় সাধারণ ক্রিকেটাররা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। বর্তমান বোর্ডকে শুরু থেকেই অবৈধ বলে দাবি করে আসছেন সংগঠকরা। এই বোর্ড পূর্বনির্ধারিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী লীগ শুরু করতেও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে এখন এক ভয়াবহ অচলবস্থা বিরাজ করছে। সবার দৃষ্টি এখন থাকবে এই ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটির দিকে। তাদের চূড়ান্ত রিপোর্টেই চলমান এই সংকটের সমাধানের চাবিকাঠি আসতে পারে। সংগঠকদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের আসল মুখোশ উন্মোচিত হবে। তবে প্রশ্ন থাকছে এই রিপোর্ট জামা দেয়ার পর এনএসসির পদক্ষেপ কি হবে? ধারণা করা হচ্ছে যেহেতু জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সরাসরি বোর্ড ভেঙে দিতে পারবে না। তাই শেষ পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে আদালতে যেতে হবে তামিম ইকবালদের।

তদন্ত কমিটির সদস্যদের তালিকা:
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান (সভাপতি)
মো. সেলিম ফকির, অতিরিক্ত সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (সদস্য)
মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম, ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সদস্য)
এ টি এম সাইদুজ্জামান, ক্রীড়া সাংবাদিক (সদস্য)
অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার সালেহ আহমেদ সম্রাট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (সদস্য)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন