বৎসরান্তে মর্ত্যলোকে পুনরায় আবির্ভূতা হয়েছেন মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা। ষষ্ঠী থেকে নবমী- ৬ দিনব্যাপী পূজা-পার্বণ, আরাধনা-অনুষঙ্গ আর উৎসবের বর্ণিল অনুষঙ্গে দেশের পূজামণ্ডপগুলো ছিল মুখরিত। মঙ্গলবার মহাপূজার নবমী তিথি অতিক্রম করে। আজ দশমীর প্রাক্কালে উৎসবের রঙে ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে বিসর্জন-বিষাদের আবহ। আনন্দের অনুরণনে মিশে যাচ্ছে বিদায়লগ্নের করুণ সুর। মহানবমীর প্রভাত থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের জনসমাগমে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। কেউ ভক্তির্ঘ্য হিসেবে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেছেন, কেউবা দেবীর চরণে অর্পণ করেছেন ভোগের নৈবেদ্য। আজ বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে যবনিকা নামবে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবের।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্ধ্যার আগেই প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ। বিজয়া দশমীতে পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বের হবে বিসর্জনের শোভাযাত্রা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি সদরঘাটে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
হিন্দু শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহানবমীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রামচন্দ্রের রাবণবধের কাহিনী। কথিত আছে, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়লাভের উদ্দেশ্যে রাজা শ্রী রামচন্দ্র দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। নবমী বিহিত পূজায় বিভিন্ন উপাচারের পাশাপাশি যজ্ঞের মাধ্যমে দেবীর উদ্দেশ্যে আহুতি নিবেদন করা হয়। অনেক পূজামণ্ডপে ১০৮টি বেলপাতা, আমকাঠ ও ঘি দিয়ে হোমযজ্ঞের আয়োজন করা হয়। নীল অপরাজিতা ফুলও মহানবমীর পূজার বিশেষ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নবমীকে ঘিরে রাজধানীর মণ্ডপগুলোতে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই ভক্তদের আনাগোনা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়।
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। কোথাও দৃষ্টিনন্দন তোরণ, আলোকসজ্জা, আবার কোথাও বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন। ঢাক, ঢোল, কাঁসর, ঘণ্টা আর শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ। মন্ত্রোচ্চারণ, প্রার্থনা ও আরাধনার মধ্যদিয়ে ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন অশুভশক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার।
মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার আরাধনা ঘিরে এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে উঠে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতিরও এক অনন্য প্রকাশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা গত ১৬ই অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্যদিয়ে শুরু হয়। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পূজা-অর্চনায় কেটেছে উৎসবের দিনগুলো। বিজয়া দশমীতে দেবীর বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এবারের আয়োজন।
এদিকে বিজয়া দশমী উপলক্ষে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও বেতার বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলোতেও প্রকাশিত হয় বিশেষ নিবন্ধ।
এ বছর দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ানোয় উৎসবের আনন্দ পেয়েছে বাড়তি মাত্রা। হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশে ছুটি তিনদিন পর্যন্ত বাড়িয়েছে। শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে এই ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪শে অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচদিনের ছুটি মিলেছে।
বছরান্তে দেবীর আগমনকে ঘিরে যে আনন্দধারা প্রবাহিত হয়েছিল, বিদায়ের ক্ষণে তা রূপ নিয়েছে মায়ামিশ্রিত বিষাদে। কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে যাবেন উমা-এই বিশ্বাসে ভক্তদের মনে এখন অপেক্ষা। প্রার্থনা আর আগামী বছরের পুনরাগমনের আকাঙ্ক্ষা। বিজয়ার প্রাক্কালে তাই মণ্ডপে মণ্ডপে উচ্চারিত হচ্ছে শুভশক্তির জয়গান, অশুভের বিনাশ এবং সকলের মঙ্গল কামনা। ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব আবারো তুলে ধরেছে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চিরায়ত ঐতিহ্য।
