প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো জাপান সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। আগামী ২৬ থেকে ২৯শে অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই সফরে ঢাকা-টোকিও সম্পর্ক আরও জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকার তরফে দক্ষ কর্মী পাঠানো, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সমপ্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ। সফরকালে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরেরও সম্ভাবনাও রয়েছে।
মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন আরেক পররাষ্ট্র সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, পররাষ্ট্রের মুখপাত্র এ. কে. এম. শহীদুল করিম, রাষ্ট্রাচার প্রধান এ. এফ. এম. জাহিদ-উল-ইসলাম।
আসাদ আলম সিয়াম জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ও জাপান সরকার একই সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের ঘোষণা দেয়। সফরসঙ্গী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে প্রতিনিধিদলটি টোকিও যাবে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া দেশগুলোর অন্যতম জাপান। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বের পর্যায়ে রয়েছে।
সিয়াম বলেন, সফরে বাংলাদেশের পণ্যের জাপানের বাজারে প্রবেশাধিকার সমপ্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদারের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মৎস্যসম্পদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো নতুন ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা সমপ্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ২৭শে অক্টোবর: সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭শে অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে ভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের সভাপতি এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সৌজন্য সাক্ষাৎ বা বৈঠক করতে পারেন। এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন তিনি। সফরকালে জাপানের জ্বালানি অবকাঠামো ও শিল্প খাতের বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে। এর মধ্যে চিবা প্রিফেকচারের কুতসু শহরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ায় টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
স্বাক্ষর হতে পারে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক: প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ বিষয়ে সমঝোতা বা সহযোগিতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। সফরকালে এসব স্মারকের বেশ কয়েকটি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা, নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব জোরদার এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ আলোচনা করবে।
আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি: দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করবেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত নিরসনে যৌথ ভূমিকা। এ সফরের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশা করছে ঢাকা। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার পরিসর বাড়বে। নিরাপত্তা খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
তারেক রহমানের সফর নিয়ে যা জানালো জাপান: ওদিকে মানবজমিনের জাপান প্রতিনিধি জানান, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সফরকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। এই সফর স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধ ও নীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশোধিত ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ (এফওআইপি) উদ্যোগ বাস্তবায়নে দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সমপ্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
