রোববার, দুপুর সাড়ে ১২টা। সৌদির জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন সুবল দাস। গেট থেকে বের হয়েই দৌড়ে ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘অবশেষে ফিরলাম!’ ১৫ মাস পর দেশে ফেরা। চিরচেনা বাতাস। স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু মনে আক্ষেপ। দু’দিন আগে দেখেন- দেশে আসা-যাওয়ার টিকিট ১৯০০ থেকে ২০০০ রিয়াল। কিন্তু একদিনের মাথায় তা ২৬০০ রিয়ালে ঠেকেছে। একদিনের মধ্য ৬০০ থেকে ৭০০ রিয়াল বেশি খরচ করে দেশে ফিরতে হয়েছে সুবলকে। ভাইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে বলেন, ‘পরের বার তোর জন্য ফোন নিয়ে আসবোই।’ হুতিদের হামলার পর ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামের সকল ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে। এরই মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স অনির্দিষ্টকালের জন্য রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
অন্যদিকে, বিমান আগামী ২১শে অক্টোবর থেকে দাম্মামগামী ফ্লাইট পুনরায় পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। এ অবস্থায় সৌদিগামী যাত্রীরা বিকল্প রুট ব্যবহার করে দেশটিতে যাচ্ছেন। একইভাবে সৌদি ফেরত যাত্রীরাও বিকল্প রুটে দেশে ফিরছেন। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি বহন করতে হচ্ছে টিকিটের উচ্চমূল্য। সুবল দাস মানবজমিনকে বলেন, দেশে থাকতে এক হসপিটালের ল্যাবরেটরিতে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরি করতাম। বেতন মাত্র ১৫ হাজার টাকা। এই টাকায় নিজের থাকা-খাওয়া হতো। কিন্তু পরিবারকে দেয়ার মতো কিছুই ছিল না। দেশে একটি পরিবার চালাতে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা দরকার। তাই বাধ্য হয়ে প্রবাসে যাই। এখন যতটুকু বেতন পাই সুন্দরভাবে পরিবার চলছে। দেশে ফিরতেই আমার এক মাসের কাজের টাকা শেষ। আজকে এসেছি ২৬০০ রিয়ালে টিকিট কেটে। রিয়াদ ও দাম্মামের ফ্লাইট বন্ধ। এজন্য টিকেটের দাম বেশি। সাধারণ সময়ে যাওয়া আসা টিকেটের দাম ১২০০ থেকে ১৪০০ রিয়াল হয়। কিন্তু বর্তমানে টিকিট পাওয়াই কষ্ট। সুবল বলেন, নিজের দেশ ছেড়ে গেছি টাকা কামানোর জন্য। কিন্তু এভাবে যদি আমাদের পকেট কাটে তাহলে আমরা কোথায় যাবো?
একই ফ্লাইটে সৌদি আরবে রিয়াদ থেকে ফিরেন আতিয়ার মণ্ডল। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে। গত ১৪ই অক্টোবর রিয়াদ থেকে টিকিট কাটেন তিনি। রিয়াদের ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় কিছুদিন অপেক্ষা করেন। এরপর বাধ্য হয়ে জেদ্দা থেকে টিকিট কাটেন। রিয়াদ থেকে বাসে যান মক্কায়। এরপর বাসে করে জেদ্দায় যান তিনি। পাড়ি দিতে হয় ১২০০ কিলোমিটার পথ। এরপর ফিরেন দেশে। জেদ্দা থেকে ১৭৮০ রিয়াল দিয়ে টিকিট কেটে এসেছি। রিয়াদ থেকে মক্কা, মক্কা থেকে জেদ্দা সবমিলে খরচ হয়েছে ৪৫০০ রিয়াল। এটা অতিরিক্ত খরচ। এই টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য কিছু কিনতে পারতাম। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। এখন আবার প্রবাসে গিয়ে এই টাকা আয় করতে হবে। আমাদের কী আর করার বলেন?
একটু পর বের হন কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা মো. নয়ন মিয়া। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমাদের হয়রানির শেষ নাই। আসার আগেই কফিল নিয়েছে ২ হাজার রিয়াল। তারপর টিকিট কাটলাম, ফ্লাইট বাতিল। সেই টিকিট ক্যান্সেল করে ১৭০০ রিয়াল দিয়ে আরেকটা কাটি। সেটিও বাতিল হলে দাম্মাম থেকে ৫০০ রিয়াল খরচ করে মক্কায় যাই। মক্কা থেকে আবার ৩০০ রিয়াল খরচ করে জেদ্দায় যাই। জেদ্দা থেকে ২৭৫০ রিয়াল দিয়ে টিকিট কেটে আজ দেশে ফিরলাম। ৩০০০ রিয়াল পাবো সাপ্লায়ারের কাছে। ওই টাকাও ছেড়ে এসেছি। গিয়ে পাবো কিনা তারও নিশ্চয়তা নাই। সবমিলে আমার ৭ হাজার ৫০০ রিয়াল অতিরিক্ত খরচ। আমাদের রক্তে খাটা টাকা মানুষে খায়। আর আমাদের চেয়ে চেয়ে শুধু দেখতে হয়। প্রতিবাদ করার মতো শক্তি নাই আমাদের।
