সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে তোলপাড় চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা সমালোচনা হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশি প্রবাসীরাই নন, অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও কথা বলছেন। জেদ্দায় একটি কনফেকশনারি দোকানে কাজ করা আলিফ হাসান বলেন, আমার মতে, অপরাধ করলে সেই দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে। অপরাধ ছোট হোক বা বড়, সবাইকে আইনের আওতায় আনা ভালো। তবে এই ঘটনায় আসলে কী ঘটেছে, অপরাধটি সত্যিই হয়েছে কিনা, আর যেভাবে ঘটনাটি বলা হচ্ছে, তা পুরোপুরি সত্য কিনা, আমরা জানি না। সৌদি বা বাংলাদেশের কোনো গাফিলতি আছে কিনা সেটাও আমরা জানি না। এটা আমাদের বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশি বলেই কি না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো?
এদিকে প্রবাসীদের কেউ বলছেন, অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তি হতেই পারে। তবে তা নিয়ম মেনে জানিয়ে হওয়া উচিত। আবার কেউ মনে করছেন, ঘটনার প্রকৃত তথ্য জানা জরুরি। এর পাশাপাশি সৌদিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আইনি সহায়তা, দূতাবাসের ভূমিকা এবং বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতন ও ভাষাগত সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে এসেছে। জেদ্দা ও মক্কায় বসবাসরত প্রবাসীরা বলছেন, ভাষা না জানা এবং আইনি অধিকার সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেক বাংলাদেশিকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
মক্কায় ১২ বছর ধরে কাজ করছেন ইবাদত আলী। তিনি বলেন, বড় দেশগুলোর ক্ষেত্রে তাদের কোনো নাগরিক অপরাধ করলে বিষয়টি জানানো হয়। তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ থাকে। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো। এখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও ভালোভাবে কাজ করছেন। তবে আমার মনে হয়, তাদের কাজের চাপ অনেক বেশি। কারণ, সৌদি আরবে অনেক বাংলাদেশি থাকেন। তাদের সবার সমস্যা দেখাশোনা করা সহজ কথা নয়। কারও কোনো সমস্যা হলে তা সমাধান করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের অনেক সময় লাগে। এ ধরনের ঘটনায় দূতাবাসের কী করার সুযোগ আছে, প্রবাসীদের কী কী অধিকার রয়েছে- এসব বিষয় আরও ভালোভাবে জানা দরকার।
আরেক প্রবাসী বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারীদের নির্যাতনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী সেখানে যান, তাদের বেশির ভাগই বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাদের মধ্যে অনেকে নির্যাতনের শিকার হন। কেউ কেউ কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়েন। তখন অনেকে কাজ ছেড়ে দেন, আবার কেউ কেউ বাসা থেকে পালিয়ে যান। তারা মনে করেন, ওই জায়গা থেকে বের হতে পারলেই বাঁচা যাবে।
তিনি বলেন, সৌদি আরবের মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অনেক নারী সেই ভাষা বুঝতে পারেন না। অনেকে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে সৌদি আরবে থাকলেও ভালোভাবে আরবি বলতে পারেন না। ফলে তারা সেখানে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়েন। কারও সঙ্গে কোনো সমস্যা হলে তা ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতে পারেন না। নিয়োগকর্তা নির্যাতন করলে কোথায় গিয়ে অভিযোগ করবেন, কার কাছে সাহায্য চাইবেন, তা-ও অনেক সময় বুঝতে পারেন না।
তিনি আরও বলেন, কিন্তু পাকিস্তানি-ভারতীয়রা ঠিকই যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা পারি না। ভাষা না জানার কারণে এসব নারী আরও বিপদে পড়েন। অনেক সময় তারা নির্যাতনের শিকার হলেও মুখ খুলতে পারেন না। কোথায় গেলে সাহায্য পাবেন, সেটাও জানেন না। আবার অভিযোগ করতে গেলে নতুন কোনো সমস্যায় পড়তে পারেন, এমন ভয়ও থাকে। এ কারণে অনেকে কোনো ঝামেলায় না গিয়ে ওই বাসা থেকে পালিয়ে আসতে চান। তারা মনে করেন, সেখানে থাকলে আরও নির্যাতন সহ্য করতে হবে। তার চেয়ে পালিয়ে আসতে পারলে বাঁচা যাবে।
তার মতে, বাসা থেকে পালিয়ে এলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তা নয়। এরপরও তাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। কোথায় থাকবেন, কার কাছে সাহায্য চাইবেন, কীভাবে নিজের সমস্যার কথা বলবেন- এসব নিয়ে চিন্তায় পড়েন তারা। ভাষা না জানা এবং আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। এজন্যই সৌদিরা বাংলাদেশিদের নির্যাতন করেন। যেটা পাকিস্তানি কিংবা ভারতীয়দের সঙ্গে খুব একটা করতে পারেন না। তাই সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়ার আগে নারীদের সেখানকার ভাষা ও আইন সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকা দরকার। কোনো সমস্যায় পড়লে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কীভাবে সাহায্য নিতে হবে, সেটাও তাদের জানানো প্রয়োজন। আর কেউ নির্যাতনের শিকার হলে যেন সহজে সাহায্য পান, সেই ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
