পূজার ছুটিতে রাজশাহী যাওয়া হলো না, পথে প্রাণ গেল বাবা-মেয়ের

জানেন না স্ত্রী

পূজার ছুটিতে রাজশাহী যাওয়া হলো না, পথে প্রাণ গেল বাবা-মেয়ের

ফন্ট সাইজ:

স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে পূজার ছুটি কাটাতে বড় বোনের বাসায় যাচ্ছিলেন রুবিনা আক্তার (৩৬)। রাজশাহীতে পৌঁছে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা মুহূর্তে পরিণত হলো বিষাদে। পথেই বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল স্বামী শহিদুল ইসলাম (৪০) ও মেয়ে তাছফিয়া খাতুনের (৮)। গুরুতর আহত রুবিনা ও তাঁর ছেলে লাবিব হোসেন (১০) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্বামী ও মেয়ের মৃত্যুর খবর এখনো জানেন না রুবিনা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বারবার জানতে চাইছেন, স্বামী ও সন্তানেরা কোথায়। মঙ্গলবার ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে ঘটে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান একাধিক যাত্রী। আহত হন অনেকে। তাঁদেরই একজন রুবিনা। তবে অন্যদের মতো শুধু নিজের আঘাতের যন্ত্রণাই নয়, তাঁর অজান্তে ঘটে গেছে এমন এক বিপর্যয়, যা কেড়ে নিয়েছে তাঁর সাজানো সংসারের দুই প্রিয় মুখ। রুবিনা পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পূবালী ব্যাংকের সুবিদখালী শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম ছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের মাগুরা শাখার ক্রেডিট ম্যানেজার। তাঁদের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন তৃতীয় শ্রেণি ও ছেলে লাবিব পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পূজার ছুটিতে রাজশাহীতে বড় বোনের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা। রুবিনা সন্তানদের নিয়ে পটুয়াখালী থেকে রওনা হন। পথে একই বাসে ওঠেন শহিদুলও। গন্তব্য ছিল রাজশাহী। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় তাঁদের যাত্রা। স্বামী ও মেয়েকে হারিয়ে রুবিনার জীবনে নেমে আসে এক অপূরণীয় শূন্যতা—যে শূন্যতার কথা তিনি এখনো জানেন না। রুবিনার ভগ্নিপতি শহিদুর রহমান রাজশাহীর পাঠানপাড়া এলাকায় থাকেন।

তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। তাঁর বাসাতেই পূজার ছুটি কাটানোর কথা ছিল রুবিনা ও শহিদুলের। নির্ধারিত সময়ে তাঁরা না পৌঁছানোয় খোঁজখবর শুরু করেন শহিদুর। একপর্যায়ে জানতে পারেন ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা। যে স্বজনদের আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের মধ্যেই দুজন আর ফিরবেন না—এ খবর মেনে নেয়া তাঁর জন্যও কঠিন। শহিদুর রহমান জানান, কিছুদিন আগেই রুবিনা ও শহিদুল ওমরাহ করে এসেছিলেন। দুজনই ব্যাংকে চাকরি করতেন। পূজার ছুটিতে একসঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সবকিছু এলোমেলো করে দিল। এখন নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি লাবিবের পাশে রয়েছেন শহিদুর রহমান। আর বনপাড়া পাটোয়ারী ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন রুবিনার পাশে আছেন তাঁর স্ত্রী।

পরিবারের স্বজনেরা একদিকে আহত মা-ছেলের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে তাঁদের সামলাতে হচ্ছে প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় শোক। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে বনপাড়া পাটোয়ারী ক্লিনিকে দেখা যায়, শয্যায় শুয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন রুবিনা। শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও বারবার জানতে চাইছেন, তাঁর স্বামী ও সন্তানেরা কোথায়। তিনি জানেন না, তাঁর জীবনের সবচেয়ে আপন দুজন আর বেঁচে নেই। স্বজনেরা এখনো তাঁকে সেই দুঃসংবাদ জানাননি। যে পূজার ছুটিতে পরিবারের সবাই মিলে আনন্দে কাটানোর কথা ছিল কয়েকটি দিন, সেই ছুটিই রুবিনার পরিবারের জন্য হয়ে উঠল চিরবেদনার স্মৃতি। রাজশাহীর বাসায় তাঁদের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের আনন্দও মুহূর্তে মুছে গেছে।

হাসপাতালে শুয়ে স্বামী ও সন্তানের খোঁজ করা রুবিনা এখনো অপেক্ষা করছেন তাঁদের ফিরে পাওয়ার আশায়। অথচ সেই অপেক্ষার শেষ কোথায়, তা জানেন তাঁর চারপাশের মানুষ—শুধু জানেন না রুবিনা নিজেই। একই ঘটনায় তার প্রিয় দুইজন ব্যক্তি ছাড়া আরও ১০ জন নিহত হয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম জানান, তথ্যগত ভুলের কারণে দুর্ঘটনার পর প্রথমে নিহতের সংখ্যা ১৪ বলা হয়েছিল। পরে যাচাই করে নিহতের সংখ্যা ১২ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার কারণে কিছু সময় মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হলেও বর্তমানে তা স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।