মৃত্যু অব্দি উপবাসে রাখতেন যাজক, ১৯১ খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত

মৃত্যু অব্দি উপবাসে রাখতেন যাজক, ১৯১ খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত

ফন্ট সাইজ:

অনাহারে থাকলেই যাওয়া যাবে স্বর্গে। এমন প্রলোভন দেখাতেন কেনিয়ার এক যাজক। তার প্রলোভনে পরে মৃত্যু হয় ১৯১ জনের। অনুসারী ও তাদের সন্তানদের অনাহারে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার দায়ে ওই যাজককে ১৯১টি খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অনহারে রাখার ভয়াবহ এই চরমপন্থী প্রথার (কাল্ট) নেতৃত্ব দেন যাজক পল ম্যাকেঞ্জি। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।

খুনে উপবাসে ঠেলে দেয়ার দায়ে কেনিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ম্যাকেঞ্জির ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল চার্চ’-এর সঙ্গে যুক্ত ম্যাকেঞ্জির পাশাপাশি আরও ২৮ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সোমবার এক রায়ে বিচারক জানান, ম্যাকেঞ্জি এবং তার সহযোগী ও প্রহরীরা একটি বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতেন, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা ও চার্চকে ব্যবহার করে জঙ্গলে গড়ে তোলা এক সম্প্রদায়ের ওপর ‘প্রাণঘাতী উপবাস’ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই খুনের অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৯০ জন শিশু এবং একজন প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। এছাড়াও ম্যাকেঞ্জি ও অন্যদের বিরুদ্ধে আরও ২৩০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় নরহত্যা, সন্ত্রাসবাদ এবং শিশু নির্যাতনের পৃথক অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি অনুসারীদের অনাহারে থাকতে বাধ্য করার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এই মামলায় তার সহ-আসামিরাও নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। আগামী ৬ নভেম্বর তাদের মামলার রায় দেয়া হবে। কেনিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও ১৯৮৭ সালের পর থেকে সেখানে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।

কি এই অনাহার কাল্ট
২০২৩ সালের এপ্রিলে উপকূলীয় শহর মালিন্দিতে ম্যাকেঞ্জি তার চার্চ বন্ধ করে শত শত অনুসারীকে নিয়ে নিকটবর্তী শাকাহোলা জঙ্গলে চলে যাওয়ার পর এই কাল্টের সন্ধান পাওয়া যায়। নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে গিয়ে পুলিশ জঙ্গলের একটি বড় খামারজুড়ে কঙ্কালসার অনুসারী এবং অগভীর গণকবর আবিষ্কার করে। চার শতাধিক মৃতদেহ উদ্ধার করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শাকাহোলা গণহত্যার বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ ছিল অনাহার। তবে শ্বাসরোধ ও মাথায় আঘাতের কারণেও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছিল।

ট্যাক্সিচালক থেকে যাজক হন ম্যাকেঞ্জি
ম্যাকেঞ্জি আগে রাস্তায় জিনিসপত্র বিক্রি করতেন এবং ট্যাক্সি চালাতেন। ২০০৩ সালে মালিন্দিতে তিনি গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রচারণার মধ্যে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ এবং টিকাদানের বিরোধিতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেনিয়ার নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার সরকারি উদ্যোগের বিরোধিতা করে তিনি বলেছিলেন যে এসব নম্বর শয়তানের কাজ, যার জেরে ২০১৯ সালে তাকে আটক করা হয়েছিল। সে বছরই তিনি চার্চ বন্ধ করে অনুসারীদের জঙ্গলের ওই খামারে নিয়ে যান। জীবিতদের মতে, সেখানে তারা নাজারেথের মতো বাইবেলে উল্লিখিত বিভিন্ন নামে গ্রাম তৈরি করে বসবাস করতেন। কোভিড-১৯ মহামারি তার মধ্যে পৃথিবী ধ্বংসের বিশ্বাস আরও জোরালো করে। এরপর তিনি ও তার সহযোগীরা কঠোর উপবাস চাপিয়ে দেন এবং বাবা-মায়েদের তাদের সন্তানদের খাওয়াতে নিষেধ করেন। যারা তার মতাদর্শের বিরোধিতা বা জঙ্গল ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করত, তাদের মারধর করা হতো।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে উপবাস
সোমবার রায় প্রদানকারী বিচারপতি ডায়ানা কাভেদজা জানান, সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে দেখা গেছে যে তারা স্বর্গে যাওয়ার পথ হিসেবে শিশুদের উপর উপবাস চাপিয়ে দিয়েছিল। ২০২১ সালের জানুয়ারির দিকে এটি শুরু হয় এবং কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানার আগে পর্যন্ত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তা চলতে থাকে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ম্যাকেঞ্জি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। কৌঁসুলিরা ১২৩ জন সাক্ষীর প্রমাণ উপস্থাপন করেন। বিচার চলাকালে খুনের অভিযোগ থাকা আরও দুই আসামির মৃত্যু হয়।