প্রথম আলো
‘উপকূলে ডেঙ্গুর বিস্তার, প্রতিরোধে বিশেষ পরিকল্পনা নেই’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যাসংখ্যা ৫০। ১৮ অক্টোবর এখানে ডেঙ্গু রোগী ছিল ৩১ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৫৩২। এ হাসপাতালে অতীতে আর কখনো এত ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়নি—এমনটা বলছিলেন মোংলার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দিয়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বোঝা যাবে না। পরিস্থিতি এর চেয়েও মারাত্মক।
মোংলার এ চিত্র আসলে দেশের পুরো উপকূলীয় এলাকার বাস্তবতা। ডেঙ্গু একসময় ছিল শুধু রাজধানী শহরের রোগ। এখন তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এর বিস্তার বেশি। চলতি বছর দেশে যত ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, তার প্রায় ৪০ শতাংশই উপকূলীয় ১৯ জেলার। দেশে ২০০০ সালে নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর আর কোনো সময় উপকূলীয় জেলায় এই হারে রোগী ভর্তি হয়নি।
উপকূলীয় এলাকায় এত ডেঙ্গুর প্রকোপ কেন, তা নিয়ে সরকারি স্তরে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। গবেষক, কীটতত্ত্ববিদ, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা এ নিয়ে তাঁদের কিছু ধারণার কথা বলেছেন। সেগুলোর মধ্যে আছে উপকূল অপেক্ষাকৃতভাবে ডেঙ্গুর নতুন সংক্রমণস্থল (রোগতত্ত্বের পরিভাষায় ভার্জিন এরিয়া),
সুপেয় পানির সংকটের কারণে ধরে রাখা পানি, স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি না থাকায় পরিচ্ছন্নতায় ত্রুটি ও জলাবদ্ধতা, কৃষি খাতের প্রাকৃতিক আধার ইত্যাদি কারণ।
৪০ শতাংশ রোগীই উপকূলের ১৯ জেলার
ঢাকা ও বড় শহরের বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কয়েক বছর ধরেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেলাভিত্তিক তথ্যেও উপকূলীয় জেলাগুলোতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির চিত্র দেখা যাচ্ছে। উপকূলের ১৯টি জেলা হলো কক্সবাজার, বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী, গোপালগঞ্জ, যশোর, ঝালকাঠি, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, নড়াইল, নোয়াখালী, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, শরীয়তপুর ও পটুয়াখালী।
চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, উপকূলীয় ১৯ জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ৪৩ হাজার ১৪৮ জন, যা মোট রোগীর ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ। এ সময় দেশের সব হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জন। আর ২০২৩ সালে উপকূলীয় এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছিল ৯৭ হাজার ৫৫২ জন। ওই বছর সারা দেশে মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯। অর্থাৎ, উপকূলের জেলাগুলোর অংশ দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০২৫ সালে উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভর্তি হয়েছিল ৩৫ হাজার ৫১১ জন; দেশের মোট রোগী ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৩৫৮। উপকূলের অংশ ছিল প্রায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে গত বছরের হিসাব পুরো বছরের, আর এ বছরের হিসাবটি মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপকূলের যে চিত্র আমরা পাচ্ছি, তা হাসপাতালের অবস্থান ধরে সংগ্রহ করা। রোগীর বাড়ি বা সংক্রমণের স্থান থেকে সব সময় তা বোঝা যায় না। বাস্তবে উপকূলে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হবে।’
উপকূলে কেন এত সংক্রমণ
মোংলার হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশের বেশি রোগী মোংলা পৌর এলাকার। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. শাহীন বলেন, উপকূলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। অনেক মানুষ বৃষ্টি বা যেকোনো পানি ধরে রাখে। এডিসের প্রজননস্থল হচ্ছে স্বচ্ছ পানি। মোংলার ক্ষেত্রে এটাই বড় কারণ হিসেবে মনে হয়।
মোংলা পৌরসভা এবং একাধিক ইউনিয়ন সদরে জলাবদ্ধতা আছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে। ডা. শাহীন বলেন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন তো জনপ্রতিনিধিশূন্য। পানি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকলেও এগুলো দেখার জন্য তেমন কেউ নেই।
ডেঙ্গুর শুরুটা হয়েছিল ঢাকা থেকে। ক্রমে এটা ছড়িয়েছে। কোনো এলাকায় সংক্রমণ বেশি হয়ে গেলে ভাইরাস নতুন এলাকা খুঁজতে থাকে। উপকূলে এডিসের জন্য সহায়ক পরিবেশ বেশি ছিল, তাই সেখানে ছড়িয়েছে বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার।
চলতি বছরের আগস্টে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) বরগুনায় এডিস মশার ওপর জরিপ করে। জরিপে বাড়ি ও স্থাপনার ১৩৪টি পানি জমে থাকা পাত্র পরীক্ষা করে ২৬টিতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। লার্ভা বা শূককীটের ক্ষেত্রে ব্রুটো ইনডেস্ক একটি জরুরি বিষয়। যদি এর পরিমাণ ২০ এর ওপরে হয়, তাহলে পরিস্থিতি নাজুক হিসেবে বিবেচিত হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় ব্রুটো ইনডেক্স ছিল ৫৩ দশমিক শূন্য ৬।
জরিপে বলা হয়েছে, সুপেয় পানির সংকট ও গভীর ভূগর্ভস্থ পানির সীমিত প্রাপ্যতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা বৃষ্টির পানি ড্রামে সংরক্ষণ করেন। বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতিও মশার বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, বরগুনার পাশাপাশি পিরোজপুরেও জরিপ পরিচালিত হয়েছে। সুপেয় পানির সংকট একটা বড় বিষয়। কিন্তু এর পাশাপাশি বিশেষ করে সুপারিগাছের কাণ্ডে এবং ফুলের নার্সারিতে এডিসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে ব্যাপক হারে।
অ্যালবোপিকটাসের অতিরিক্তি উপস্থিতি
ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার দুটো ধরন আছে: ইজিপ্টাই ও অ্যালবোপিকটাস। এর মধ্যে ইজিপ্টাইয়ের কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু ছড়ায়। উপকূলে এত ডেঙ্গু রোগী হচ্ছে; কিন্তু সেখানে উল্লেখযোগ্য হারে পাওয়া গেছে অ্যালবোপিকটাসের উপস্থিতি। যেমন আইইডিসিআর আগস্টে বরগুনায় যে জরিপ করেছিল, সেখানে প্রায় ৫৮ ভাগ অ্যালবোপিকটাস পাওয়া গেছে, ৪২ ভাগ পাওয়া গেছে ইজিপ্টাই।
প্রকৃতিগত দিক থেকে ইজিপ্টাই ৯৫ ভাগ জীবাণুবাহী আর অ্যালবোপিকটাস মাত্র ৫ ভাগ। তাহলে কেন উপকূলে ডেঙ্গুর এত বিস্তার? এ প্রশ্নের উত্তরে কীটতত্ত্ববিদ কবীরুল বাশার বলেন, ‘ইজিপ্টাই এবং অ্যালবোপিকটাসের ক্ষেত্রে আমরা জীবাণুর পরিমাণের যে তথ্য পাই, তা বাইরের দেশের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন হতেও পারে। হয়তো অ্যালবোপিকটাস বেশি পরিমাণ জীবাণুবাহী হয়ে গেছে। এটা নিয়ে বিশদে গবেষণা প্রয়োজন।’
উপকূলে এবার মৃত্যুও বেশি
এবার এখন পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে ৩৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে উপকূলের ১৯ জেলার হাসপাতালগুলোতে। এর বাইরেও থাকতে পারে। কারণ, ঢাকার হাসপাতালে যারা মারা যাচ্ছে, তারা সবাই ঢাকার বাসিন্দা নয়। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা থাকাটা স্বাভাবিক; কিন্তু ১১৭ জনের হিসাবও যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলেও মোট মৃত্যুর ৩৪ শতাংশ হচ্ছে উপকূলীয় ১৯ জেলার।
কয়েক বছর ধরে উপকূলের মতো এমন একটি পরিবেগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও সেই অঞ্চলকে ঘিরে সরকারের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই। এভাবে যে মৃত্যু হচ্ছে, তা ঠেকাতেও নেই তৎপরতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু রোধে সারা দেশেই তো কাজ হচ্ছে। তবে উপকূল ঘিরে বিশেষ কোনো কর্মসূচি নেই, এটা ঠিক।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে উপকূল কয়েক বছর ধরেই সংক্রমণের বড় এলাকায় পরিণত হলেও এ অঞ্চল ঘিরে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা দেখছি না। সরকারের সামগ্রিক উদাসীনতার নীরব শিকার হচ্ছে উপকূলের মানুষ।’
কালের কণ্ঠ
‘শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর প্রধানমন্ত্রী’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দল ও সরকারে শৃঙ্খলা ফেরাতে আপাতত সতর্কবার্তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাংগঠনিক-প্রশাসনিক পদক্ষেপের পথে হাঁটছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের এই অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও দলের দায়িত্বশীল নেতারা।
তাঁরা বলছেন, দল কিংবা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা—এই দুটি ঘটনা ‘কঠোর নীতি’র সেই অবস্থানকেই সামনে এনেছে। এর আগেও দুই মন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার গত ১৭ অক্টোবর আট মাস পূর্ণ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পর নানা ব্যতিক্রমী সূচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দিনরাত একাকার রকেটের গতিতে ছুটে চলেছেন তিনি। সাদামাটা জীবনযাপন ও চলাফেরায় তিনি মানুষের মন জয় করে চলেছেন। সেখানে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে কেউ কেউ একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন।
তাঁদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে কোনো ঘটনায় জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন সরকারপ্রধান। মন্ত্রী ও এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তবু বিতর্ক থেমে নেই।
এসব কারণে সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে। ওদিকে একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রী-এমপিসহ সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কেউ কেউ বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা—সরকারপ্রধানের এমন তৎপরতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সাধারণ মানুষ। প্রধানমন্ত্রী নগরীর বিভিন্ন সমস্যা সরেজমিনে গিয়ে দেখা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ জনমনে আশাবাদ তৈরি করছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনই সব অনিয়ম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সবকিছুরই অস্তিত্ব আছে, থাকবে। তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সবকিছু একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
মীর শাহে আলম আরো বলেন, গত ১৭ বছর অনিয়ম করতে করতে অনেকের মধ্যে তা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগবে। সরকারের সহনশীল নীতির অর্থ দুর্নীতি বা অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। সবাইকে শৃঙ্খলার মধ্যে থাকতে হবে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম আলোচনায় আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁদের কয়েকজনকে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন মিষ্টি।
পরে তারেক রহমানের নির্দেশনার পর ১ অক্টোবর স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। এরপর তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া মহানগর বিএনপি, যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটি, ছাত্রদল পশ্চিমের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।
রাড্ডাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই আড়াই সপ্তাহের মাথায় নতুন বিতর্কে পড়েন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাঁর লোকজনকে ধাওয়া করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা শুরু হয়। ইশরাক তাঁর পদক্ষেপের পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এটি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। তবে ঘটনাটি জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা, আইন প্রয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ‘আবারও কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর, মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হলো ইশরাককে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারে-দলে শৃঙ্খলা রক্ষায় আবারও কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীর গেন্ডারিয়া ঘুণ্টিঘরে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের ঘটনায় দেশ জুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ইশরাক হোসেন। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি মন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের আট মাসের মাথায় মন্ত্রিত্ব হারালেন ঢাকার সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইশরাক।
মাত্র ১৮ দিন আগে, গত ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ ছাড়তে হয়েছিল ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় নাম আসায় বিএনপি দলীয় এই সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এমপি হিসেবে শপথ গ্রহণের মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় তাকে এমপি পদ হারাতে হয়েছে। এমনকি, দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে সংরক্ষিত আসনের কোনো নারী সদস্যের এমপি পদ হারানোর ঘটনা এটিই প্রথম।
সরকার ও বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিকজন ইত্তেফাককে জানান—সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর ও অবৈধ দখলের মতো কর্মকাণ্ডে জড়ানোর মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের পাশাপাশি সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্নকারীদের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। ইশরাক হোসেন ও ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘটনায় এই সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে যে—মন্ত্রী, এমপি বা দলের যেই হোন না কেন, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে ছাড় নেই। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপিপ্রধানের বার্তা পরিষ্কার।
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া ঘুণ্টিঘরে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ইশরাক হোসেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে একজন প্রতিমন্ত্রী ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যের এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঘটনাটি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়। এরমধ্যেই রবিবার মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই খবরকে রবিবার প্রায় রাতভর ‘গুজব’ বলে দাবি করেছিলেন ইশরাক। তবে, গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার পর নিজেই ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পরে বেলা আড়াইটার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, আমার কারণে দল (বিএনপি) ও সরকার যাতে বিব্রত না হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর ভালো কাজগুলো আড়ালে পড়ে না যায়, সেজন্যই আমি পদত্যাগের এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি। আমি কেবল আমার নিরাপত্তার জন্য আমার হাতে অস্ত্রটুকু যতটুকু সময় প্রয়োজন রেখেছিলাম, পরবর্তীকালে সেটি আর আমার হাতে দৃশ্যমান হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আজকের দিন থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আমি তাকে বলেছি, পুরো সময়টাতে ঢাকা-৬ আসন, পার্শ্ববর্তী এলাকা, পরবর্তী সময়ে আরো যদি এলাকা থাকে, সেখানকার মাদক নির্মূল এবং আমাদের জাতীয় জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি সদয় সম্মত হয়েছেন এবং আমাকে সুযোগ করে দিয়ে বলেছেন, ঠিক আছে যাও, এলাকায় ঠিক করে কাজ করো।
ইশরাক বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আমাকে তার প্রথম মন্ত্রিসভায় স্থান দেন। আমি দেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছি। আজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করতে এসেছি, যা দুই-তিন দিন ধরে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিছু সত্য, কিছুটা অতিরঞ্জিত নানা ধরনের খবর প্রকাশ পেয়েছে। আমি আজকে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি মূলত ঐদিন ঠিক কী ঘটেছিল, সেটির বিস্তারিত তুলে ধরতে।
নয়া দিগন্ত
‘চাঁদাবাজি সড়ক থেকে আড়ত’—এটি দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রাজধানীর পাইকারি বাজার থেকে মহাসড়ক, গণপরিবহন থেকে আবাসিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন খাতের নানা স্তরে চাঁদাবাজির বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পাইকারি বিক্রেতা, উদ্যোক্তা ও পরিবহন শ্রমিকদের অনেকের কাছে অবৈধ এ অর্থ আদায় কার্যত অলিখিত কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁদা না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তালা লাগানো, ভাঙচুর, পণ্য খালাসে বাধা, এমনকি অগ্নিসংযোগ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগও রয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির পুরনো কাঠামোর পরিবর্তন ঘটলেও এর অবসান হয়নি বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। কোথাও আগের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর জায়গায় নতুন গোষ্ঠী সক্রিয় হয়েছে, কোথাও একটি সিন্ডিকেটের পরিবর্তে একাধিক পক্ষের মধ্যে চাঁদার ভাগবাঁটোয়ারা চলছে। ফলে চাঁদাবাজির ধরন ও নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষ বদলালেও ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ কাটছে না।
আগুনের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি
চলতি মাসের ৬ অক্টোবর গাজীপুরের হাজী আবদুুর রহিম পাইকারি কাপড়ের মার্কেটের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলটন হোসেনকে মোবাইল ফোনে কল করে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে পুরো মার্কেটে আগুন লাগিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ।
ব্যবসায়ীকে আতঙ্কিত করতে চাঁদাবাজ ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গও তোলে। ওই অগ্নিকাণ্ডে বাজারের বিপুল পরিমাণ মালামাল পুড়ে যায়। আবার আগুন লাগলে ক্ষয়ক্ষতি আরো ভয়াবহ হবে বলে হুমকি দেয়া হয়।
মার্কেটের হাজারো ব্যবসায়ীর জীবন ও মূলধনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মিলটন হোসেন বিকাশের মাধ্যমে দুই দফায় পাঁচ হাজার টাকা পাঠান। বাকি টাকা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি গোপনে বাসন থানায় মামলা করেন। পরে অভিযান চালিয়ে জুয়েল আহমেদ (২৬) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আবাসিক এলাকা ও কাওরান বাজার
চাঁদাবাজির অভিযোগ কেবল বাজার কিংবা পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানীর অভিজাত গুলশান আবাসিক এলাকায় গৃহস্থালি বর্জ্য অপসারণের কাজ পরিচালনা করে গুলশান সোসাইটি। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর ‘মাহাবুব ও রবিন গ্রুপ’ এবং ‘রুবি এন্টারপ্রাইজ’-এর পরিচয় ব্যবহার করে কয়েকজন ব্যক্তি সোসাইটির কর্মকর্তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। এ সময় প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং তা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় পরে তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আবাসিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবামূলক কার্যক্রমেও এ ধরনের অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ নগর ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও পিকআপে শাকসবজি, মাছ, মসলা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য আসে রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বড় পাইকারি আড়তগুলোতে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব পণ্য রাজধানীতে পৌঁছানোর পরও পরিবহন ও খালাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।
কাওরান বাজারের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশের পর অন্তত দুই ধাপে অর্থ আদায় করা হয়। প্রথমে গাড়ি রাখার জন্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং পরে পণ্য খালাসের জন্য ট্রাকপ্রতি সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত এ ব্যয়ের চাপ বহন করেন কৃষক, আড়তদার ও ভোক্তারা-যদিও এর প্রকৃত ভাগ কার ওপর কতটা পড়ছে, তা নির্ধারণে বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর গবেষণায় বাজারব্যবস্থার মধ্যবর্তী স্তরে অতিরিক্ত ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, রাজধানীর খুচরা বাজারে সে পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হওয়ার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে, কৃষক পর্যায়ে ১৫ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ বা বেগুন ঢাকার বাজারে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কৃষক ও ভোক্তার দামের এ ব্যবধানের পুরোটা চাঁদাবাজির কারণে তৈরি হয়-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ, পচন, আড়ত ও খুচরা পর্যায়ের মুনাফা এবং সরবরাহের ঘাটতিসহ অন্যান্য উপাদানও বিবেচনায় নেয়া জরুরি।
ফুটপাথ থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা
রাজধানীর ফুটপাথ ও অস্থায়ী বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ফুটপাথগুলো থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এ হিসাবে দৈনিক গড় আদায়ের পরিমাণ আট কোটি টাকার বেশি।
গুলিস্তান, নিউমার্কেট, মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলশান, ওয়ারী ও লালবাগসহ রাজধানীর অন্তত ২৭৯টি স্থানে ফুটপাথ ও অস্থায়ী বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের নাম সামনে আসছে।
বণিক বার্তা
দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘বিবিএসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আজ জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। যদিও শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকায় দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা নভেম্বরে পালিত হবে।
দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব খাতের নীতিনির্ধারণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে সরকারি পরিসংখ্যান। এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের দায়িত্ব বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের হিসাব নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, প্রকাশে বিলম্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘাটতি নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। পরিসংখ্যানের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা বাড়াতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত স্বাধীন টাস্কফোর্সের ১২টি সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি পরিসংখ্যানের প্রতি আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আজ জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। যদিও শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকায় দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা নভেম্বরে পালিত হবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে ধরতে জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধিসহ কিছু সূচকে অতিরঞ্জিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সে সময়ের মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চাপ পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে সরকারি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে। পুরনো হিসাব পদ্ধতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা এবং বিতর্কিত পরিসংখ্যান পুনর্মূল্যায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সে সংশয় কাটেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়ে আস্থার সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নেও। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জানুয়ারির ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা, সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল নিয়মিত হালনাগাদ না করা এবং তথ্য প্রকাশে বিলম্বের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান সামগ্রিকভাবে ‘বি’ রেটিং পেলেও এর পরিধি বা ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে দেয়া হয়েছে ‘সি’ রেটিং। সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যানের সময়োপযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিক্যাল পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরসে (এসপিআই) বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৭১ দশমিক ৬। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সক্ষমতা, তথ্যের উৎস, প্রাপ্যতা এবং নীতিনির্ধারণে তথ্যের ব্যবহার মূল্যায়ন করে এ সূচক। স্কোরে এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা ও ভারত। অর্থাৎ সরকারি পরিসংখ্যানের মান ও ব্যবহারযোগ্যতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বিবিএসের পরিসংখ্যানের গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও প্রাপ্যতা পর্যালোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স ১২টি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যুরো গঠন, সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে ‘স্ট্যাটিসটিকস বাংলাদেশ’ বা ‘স্ট্যাটবিডি’ করা, সাত সদস্যের ‘ট্রাস্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি কাউন্সিল অব স্ট্যাটিসটিকস’ গঠন এবং পরিসংখ্যান আইন ২০১৩ সংশোধনের প্রস্তাব ছিল। পাশাপাশি জরিপ পরিচালনা, তথ্যের গুণগত মান, উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহ, জবাবদিহিতা ও মহাপরিচালক নিয়োগ পদ্ধতিতে সংস্কারের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। কিন্তু সেই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
টাস্কফোর্সের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে আমরা ১২টি সুপারিশ দিয়েছিলাম। তার মধ্যে জরিপ কীভাবে হতে পারে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মহাপরিচালক নিয়োগের নির্বাচন পদ্ধতি, গুণগত মানের তথ্য, তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ ও জবাবদিহিতার বিষয় ছিল। এসব প্রস্তাব সর্বক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যও হয়েছিল। তবে সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিবিএসের সঠিক তথ্যপ্রবাহ ও জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে টাস্কফোর্সের সুপারিশগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ কেন আটকে আছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা করা উচিত।’
টাস্কফোর্সের সুপারিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংস্থাটির প্রধান হিসেবে একজন পেশাদার পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগ। বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডার থেকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেয়ার চর্চা নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিএসের কয়েকজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতো।
আজকের পত্রিকা
‘প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন: বৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না’—এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ত্র-কাণ্ডে বিতর্কের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। এর আগে গত ছয় বছরে সাবেক এমপিসহ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা ১০ বার বৈধ অস্ত্র প্রকাশ্যে বেআইনি প্রদর্শন করলেও তাঁদের কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমন ঘটনায় অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলযোগ্য হলেও তা করা হয়নি।
ঘটনার পর আলোচনা-সমালোচনার মুখে বেশির ভাগ ঘটনায় তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যত্যয় খুঁজে পায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে বৈধ অস্ত্রের বেআইনি প্রদর্শনের কারণে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবং অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল না করায় এমন ঘটনা থামছে না।
বৈধ অস্ত্রের সর্বশেষ প্রকাশ্য প্রদর্শন করলেন ইশরাক হোসেন। তিনি গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন। এ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গতকাল সোমবার তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে তাঁর দাবি, তিনি আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্স করা অস্ত্র বের করেছিলেন।
পুলিশ বলেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক ও তাঁর সঙ্গের ব্যক্তিদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার ঘটনার তদন্ত চলছে। ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে রোববার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের ব্যত্যয়ের তথ্য-প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অবশ্য এর আগে অস্ত্র প্রদর্শনের কোনো ঘটনাতেই শাস্তির নজির নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী, বৈধ অস্ত্র আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করা যাবে। তবে অন্যের ভয় বা বিরক্তির কারণ হয়, এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। এ শর্ত ভঙ্গ করলে অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলযোগ্য হবে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নে আহত এক দলীয় কর্মীকে দেখতে গিয়ে শটগান হাতে ছবি তোলেন বিএনপির স্থানীয় নেতা আবু তাহের। ২ মার্চ ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে সমালোচনা হয়। আবু তাহের নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র সঙ্গে রাখার কথা জানান। ৩ মার্চ সীতাকুণ্ড মডেল থানার পুলিশ জানায়, ওই অস্ত্রটি লাইসেন্স করা। এ ঘটনায় তাহেরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিএনপি নেতার অস্ত্রটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানায় জমা ছিল। ঘটনার দিনই তিনি অস্ত্রটি থানা থেকে বুঝে নিয়ে যান। যাওয়ার পথে এক রাজনৈতিক সহকর্মীকে দেখতে তাঁর বাড়িতে যান। তখন ছবিটি তোলেন। তিনি কাউকে ভয় দেখানোর জন্য অস্ত্রটি ব্যবহার করেননি। পরে তাঁর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। এখানে আইনের বড় কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে বার্তা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে পদ হারালেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকার কিংবা দলের যত প্রভাবশালী নেতাই হোক না কেন, অন্যায় করলে কেউ ছাড় পাবে না; সেটি প্রমাণ করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। যেকোনো বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে এটাই তার কঠোর বার্তা। এর আগে রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টিকেও পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে এক মাসের ব্যবধানে দুজনকে সরে যেতে হয়েছে।
ইশরাক হোসেন অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু দলের সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। মাদকবিরোধী অভিযানে প্রধানমন্ত্রীর সায় থাকলেও অস্ত্র হাতে নেওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ এ ঘটনায় সমর্থন দিলে ভবিষ্যতে অন্যরাও এ বিষয়ে উৎসাহী হবেন। এর আগে গত ১ অক্টোবর রাড্ডার ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই তাকে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তার নির্দেশে পদত্যাগ করেন বিএনপির এ সংসদ সদস্য।
জানা গেছে, গত রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাক হোসেনকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে ইশরাক বিষয়টিকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ইশরাক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর জন্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে কেউ আর এ বিষয়ে আগাননি। শেষ পর্যন্ত গতকাল সোমবার সকালে পদত্যাগের কথা উল্লেখ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন এবং সংবাদ সম্মেলন করার কথা জানান ইশরাক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শাসক হিসেবে জনগণের কাছে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে যে সরকার কোনো ছাড় দেবে না, তার বার্তা দিয়েছেন ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রী থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে।’
এর আগে গত ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে সরকারি দলের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ এবং দলের নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। সভায় প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দলের কোনো নেতাকর্মী, সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়ালে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
আলোচনা-সমালোচনা: গত শনিবারের ঘটনার বিষয়টিকে সমর্থন করে কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন ইশরাক হোসেন কোনো নিরীহ ব্যক্তির ওপর অস্ত্র ধরেননি বরং মাদকবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। আবার অনেকেই ওই অস্ত্রটি বৈধ নাকি অবৈধ, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে একজন জনপ্রতিনিধির পিস্তল তাক করে দৌড়ানোর সমালোচনাও করেছেন কেউ কেউ। ইশরাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে গত শনিবারই পুরো ঘটনার একটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছিল। ওই ভিডিওতে হাতের অস্ত্র ব্লার করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে রাতে সেই ভিডিওটি ডিলিট করে দেওয়া হয়। তবে মাদক কারবারিদের আটক অভিযানের ঘটনার নানা ছবি-ভিডিও রয়েছে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে। যদিও ইশরাক হোসেন দাবি করেছেন, ওই অভিযানে তিনি আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে একজন জনপ্রতিনিধি বা আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে এমন কার্যক্রম চালাতে পারেন কি না? মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের নাকি সংসদ সদস্যের?
এসব প্রশ্নে আলোচনায় আইনজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা মাদক প্রতিরোধে একজন প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের এ ধরনের পদক্ষেপ মোটেও আইনসঙ্গত নয়। এ ধরনের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
এদিকে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক: গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তার মতে, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য মাদক নির্মূল হলেও সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে তার উপস্থিতিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান, এ পরিস্থিতিতে সরকারের কর্মকা- আড়ালে পড়ে যাচ্ছে এবং দলও বিব্রত হচ্ছে বলে তিনি মনে করছেন। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
ইশরাকের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তাকে মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে এবং এলাকার সমস্যা সমাধানে কাজ করতে বলেছেন। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন তিনি। তবে তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তাকে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘ভাবমূর্তি রক্ষায় কঠোর সরকার’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, অন্যায়, অপরাধ ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি সরকারের হাইকমান্ড। দেশ ও জনগণের স্বার্থে কোনো ব্যত্যয়ের ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারের ভাবমূর্তি ও দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় মন্ত্রী-এমপি ও জনপ্রতিনিধিসহ সবার কর্মকান্ডে তীক্ষè নজর রাখছেন সরকারপ্রধান তারেক রহমান। তাই বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিচ্ছেন একের পর এক কঠোর সাংগঠনিক ও (অবস্থা ভেদে) আইনি ব্যবস্থা। ফলে দলীয় নেতা-কর্মীসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশংসায় ভাসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তারা বলছেন, তারেক রহমানের এ উদ্যোগ দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক। গণতন্ত্রের স্বার্থে এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। মন্ত্রী-এমপি, নেতা-কর্মী সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সাধারণ মানুষের পাশে থেকে নিজ নিজ এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। অনিয়ম করলে কাউকেই ছাড় দেবে না বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার অপরাধ ও অন্যায়কে অপরাধ হিসেবেই দেখছে এবং কোনো অন্যায়কে ছাড় দেবে না। ভুল করলে মাশুল দিতেই হবে।
সদ্য পদত্যাগ করা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা ও এর জেরে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দল ও সরকারের কেউ যদি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থি কোনো কাজ করে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এখানে কেউ-ই আইনের ঊর্ধ্বে নন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নেতৃত্বের নির্দেশনা প্রয়োজন। তারা বলছেন, সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মন্ত্রী-এমপিদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং বিতর্কিত কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। নেতৃত্বের নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ধারাবাহিক প্রয়োগের ওপর।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিএনপির মন্ত্রী-এমপিসহ দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে। ভবিষ্যতেও এসব বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিএনপির হাই কমান্ড ও প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সঠিক। আইনশৃঙ্খলা এবং দেশের স্বার্থে এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
হাতে অস্ত্র নিয়ে মাদক সেবন ও কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় সমালোচনায় পড়েন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন ইশরাক। তার আগে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনায় পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরও আগে দখল চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া তিন মাস পরপর মন্ত্রীদের কাজের পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে সাত হাজারের বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের ছয় মাস পর মন্ত্রিসভায় রদবদল আনা হয়েছে।
এতে দায়িত্বশীল পদে থেকে কেউ যেন সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না ফেলেন, সে বিষয়ে নেতৃত্বের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি সামনে আসে। বিএনপির এই কঠোর অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করে সাধুবাদ জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনা সামনে আসার পর সরকারের অন্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বক্তব্য এবং আচরণ নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে এখন থেকে তারা কথাবার্তা ও কাজেকর্মে আগের চেয়েও অধিক সতর্ক হচ্ছেন।
