আশ্বিনের শেষ বিকেলে, ধানের গন্ধমাখা বাতাসে,
পুকুরের জলে তখনো নীল আকাশের উদাসীন মুখ দেখা যায়।
সেখানে এসেছিল দু'জন মানব-মানবী, হাতে লয়ে মাটির পৃথিবীর সব মায়াবী— বাঁশের ডালায় কলাপাতায় সাজানো সজনা ভর্তা, ভাত, শাক ও মাছের বড়া, আর সারা দিনের পরিশ্রমের ঘ্রাণ।
শ্যাওলা-ধরা পুকুরঘাটে পাশাপাশি বসে খেয়েছিল তারা,
যেন এই খাবার, এই জল, এই সামান্য আয়োজনই
জীবনের সব প্রাপ্তি ও তৃপ্তির শেষ ঠিকানা।
পুরুষটির হাতে এক সরল বাদ্যযন্ত্র, তার সুর ভেসে যায় দূরের
তালবনের দিকে। মঞ্চ নেই—আছে মাটিতে বিছানো শীতলপাটি;
শ্রোতা নেই—চারদিকে লতাপাতা আর পাখির নীরব উন্মুখরতা;
করতালির বদলে আছে মৌমাছির ডানার মৃদু কম্পন।
তারপর সবুজ পাতার নৌকায় তারা সাজাল শরতের ফুল—
শিউলি, অপরাজিতা, আর নাম-না-জানা কত বুনো ফুল। নৌকা ভাসতেই কেঁপে উঠল পুকুরের পানি, আর এইটুকু উৎসবেই দু'জন মিলে বিদায় জানাল শরতকে।
পাতার নৌকা ভেসে চলে, তার পথ জানা নেই, কোনো গন্তব্য নেই,
নেই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। জীবনও কি তেমন নয়? কত ঘর, কত নাম, কত সঞ্চয়ের বোঝা—
শেষে সময়ের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে হয় সবচেয়ে প্রিয় আয়োজনে।
তবু তারা জানে, দিন ফুরালে ঘরে ফিরতে হয়,
ক্ষুধা পেলে ভাত খেতে হয়, আর সুস্থ থাকলে আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়।
দূরে শীতের পায়ের শব্দ, নিঃশব্দ ঘাসের ভেতর দিয়ে শোনা যায়।
তবু পুকুরঘাটে দু'জন মানুষ বসে থাকে আরও কিছুক্ষণ,
তাদের অন্তরে কোনো পরাজয় নেই। কারণ সবকিছু
আঁকড়ে ধরার নাম জীবন নয়; কিছু ফুল জলে ভাসিয়ে দেওয়াও
জীবনের একটি অংশ। কিছু সুখ আছে যা পৃথিবীকে প্রমাণ দিতে হয় না, দু'জনের নীরব চোখে তারা সন্ধ্যাতারা হয়ে জ্বলে।
বহু বছর পরে কেউ হয়তো মনে রাখবে না তাদের নাম,
জানবে না কোন আশ্বিনের বিকেলে দু'জন মানুষ
ফুলের নৌকায় উৎসবের আমেজে একবার শরতকে বিদায় জানিয়েছিল। তখন ঘাটের সিঁড়ি ভেঙে পড়বে, শ্যাওলা ঢেকে দেবে সব পদচিহ্ন, পুকুরের জলে আকাশ আসবে আর যাবে, ঋতুর পর ঋতু গড়াবে। তবু জলের গভীরে, স্মৃতির ঘরে নীরবে ভেসে থাকবে একটি সবুজ পাতার নৌকা আর কয়েকটি শুকনো ফুল, যাদের গায়ে তখনো লেগে থাকবে সেই বিকেলের আলো, সেই সুরের রেশ।
তারা জানত, ঝরে যাওয়া মানেই শেষ নয়; ঝরে যাওয়া মানে মাটির
কাছে ফিরে যাওয়া।
অক্টোবর ১৯, ২০২৬
মাটির কাছে ফিরে যাওয়া
আবু এন এম ওয়াহিদ
অনলাইন
৫৯ মিনিট আগে
২০ অক্টোবর (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৯ঃ৩৮ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
