আইপিওতে আসছে বড় পরিবর্তন

বিএসইসির গেজেট প্রকাশ

আইপিওতে আসছে বড় পরিবর্তন

ফন্ট সাইজ:

পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ার ছাড়ার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আইপিওর আগে কোম্পানির আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে একাধিক পদ্ধতির ব্যবহার, উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সুযোগ এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বণ্টনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া নির্দিষ্ট শর্তে লোকসানে থাকা অবকাঠামো ও মূলধন নিবিড় কোম্পানি এবং নতুন প্রকল্পের কোম্পানিকে আইপিওতে আসার সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে আইপিওর অর্থ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, কোম্পানির তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং শেয়ার বরাদ্দে স্বয়ংক্রিয় লটারি ব্যবস্থা চালুর বিধানও যুক্ত করতে চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে ২০২৫ সালের বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) বিধিমালা সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করেছে বিএসইসি। খসড়াটির বিষয়ে জনমত, পরামর্শ ও আপত্তি চাওয়া হয়েছে। ১৮ অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে মতামত দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইপিওর আগে বাধ্যতামূলক যাচাই
প্রস্তাবিত সংশোধনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইপিওর আবেদন জমা দেওয়ার আগে কোম্পানিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রি-আইপিও ভেরিফিকেশন বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব পূর্ব যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বিএসইসির নির্ধারিত প্যানেল থেকে নিয়োগ করা নিরীক্ষক এ যাচাই করবেন। নিরীক্ষক শুধু কোম্পানির আর্থিক বিবরণী পরীক্ষা করবেন না, কোম্পানির প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্যের যথার্থতা, পূর্ণতা ও সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও পর্যালোচনা করবেন। এ যাচাইয়ের প্রতিবেদন প্রসপেক্টাসে আলাদাভাবে সংযুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নিরীক্ষকের স্বাক্ষরযুক্ত নির্ধারিত ঘোষণাপত্র আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে।

খসড়ায় প্রি-আইপিও যাচাইয়ের আওতায় মোট ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক বিবরণীর নির্ভুলতা, বিক্রয় ও রাজস্বের সত্যতা, পাওনা ও দেনা, মজুত পণ্য ও স্থায়ী সম্পদ, নগদ অর্থ ও ব্যাংক হিসাব, ঋণ ও দায়, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন, কর ও ভ্যাট, কোম্পানির আইনি অবস্থান, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের তথ্য, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, মূলধন ও শেয়ার মালিকানা এবং প্রসপেক্টাসের তথ্য যাচাই। এছাড়া জালিয়াতির লক্ষণ, আয় বাড়িয়ে দেখানো, ভুয়া বিক্রয় বা সম্পদ দেখানো, আর্থিক হিসাব সাজিয়ে উপস্থাপন এবং ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার মতো ঝুঁকিও যাচাইয়ের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরীক্ষককে কোম্পানির কারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং চেয়ারম্যান, পরিচালক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার বিষয়ও নির্ধারিত সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চার পদ্ধতিতে নির্ধারণ করতে হবে শেয়ারের মূল্য
খসড়া অনুযায়ী, কোম্পানি ও ইস্যু ম্যানেজারকে অন্তত চারটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে শেয়ারের মূল্য যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। এর মধ্যে অন্তত দুটি হতে হবে অ্যাবসলিউট বা পরম মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং দুটি রিলেটিভ বা তুলনামূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি। পরম মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্যে ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো, ফ্রি ক্যাশ ফ্লো টু ইক্যুইটি, ফ্রি ক্যাশ ফ্লো টু ফার্ম, রেসিডুয়াল ইনকাম মডেল এবং সম্পদভিত্তিক মূল্যায়নের মতো পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে তুলনামূলক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্য-আয় অনুপাত (পি/ই), মূল্য-সম্পদ অনুপাত (পি/বি), মূল্য-নগদ প্রবাহ অনুপাত (পি/সিএফ), এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু টু ইবিআইটিডিএ এবং উপযুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু টু বিক্রয় অনুপাত ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতির নাম উল্লেখ করলেই হবে না। কোন পদ্ধতি কেন নির্বাচন করা হয়েছে, তুলনার জন্য কোন কোম্পানি বা লেনদেন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং মূল্য নির্ধারণে কী ধরনের অনুমান ব্যবহার করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে হবে। বিশেষ করে প্রবৃদ্ধির হার, ডিসকাউন্ট রেট এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনুমানের ভিত্তি ও উৎস প্রসপেক্টাসে প্রকাশ করতে হবে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, রোড শোতে পাওয়া মতামত বিবেচনায় নিয়ে ইস্যুকারী কোম্পানি ও ইস্যু ম্যানেজার নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করবে। এ মূল্য প্রসপেক্টাসে প্রকাশ করতে হবে এবং নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতি দিয়ে তার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে হবে।

বুক বিল্ডিংয়ে দরপত্রের নতুন হিসাব
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বা যোগ্য বিনিয়োগকারীদের দরপ্রস্তাব গ্রহণ ও শেয়ার বরাদ্দের নিয়মেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, যোগ্য বিনিয়োগকারীরা নির্দেশক মূল্য বিবেচনায় দরপ্রস্তাব দেবেন। নির্ধারিত ন্যূনতম দরদামের নিচে কোনো দর গ্রহণ করা হবে না। দরদাতাকে শেয়ারের দাম এবং তিনি কতটি শেয়ার নিতে চান, তা উল্লেখ করতে হবে।

দরপ্রস্তাব গ্রহণ শেষ হলে সর্বোচ্চ দর থেকে সর্বনিম্ন দর পর্যন্ত সাজানো হবে। যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ করা শেয়ারের সম্পূর্ণ পরিমাণ বিক্রি হওয়ার সীমায় যে সর্বনিম্ন দর পাওয়া যাবে, তার নিকটতম পূর্ণসংখ্যাকে কাট-অফ প্রাইস হিসেবে নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। যোগ্য বিনিয়োগকারীদের শেয়ার তাদের নিজ নিজ দর অনুযায়ী বরাদ্দ করা হবে। সর্বোচ্চ দরদাতাদের দিয়ে শুরু করে বরাদ্দ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলবে। একই দামে শেয়ারের চাহিদা অবশিষ্ট বরাদ্দের চেয়ে বেশি হলে আনুপাতিক হারে শেয়ার বরাদ্দ করা হবে। রোড শো শেষে বিনিয়োগকারী, বিশ্লেষক বা আগ্রহী ব্যক্তিরা তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদের মূল্যায়ন ও প্রস্তাবিত দর জমা দিতে পারবেন। স্বীকৃত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থাকলে তার মাধ্যমে অথবা সরাসরি কাগজে এ প্রস্তাব দেওয়া যাবে। রোড শো থেকে পাওয়া মূল্যায়নের সারসংক্ষেপ প্রসপেক্টাসে প্রকাশের প্রস্তাবও রয়েছে। এতে পঞ্চম, ২৫তম, ৭৫তম ও ৯৫তম পার্সেন্টাইল, গড় ও মধ্যকের মতো পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

লোকসানি কোম্পানির আইপিওর সুযোগ
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী আইপিওতে আসতে হলে কোম্পানির সর্বশেষ অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা থাকতে হবে এবং আবেদনের সময় কোনো পুঞ্জীভূত লোকসান থাকা যাবে না। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে এ শর্তে ছাড় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি, অন্তত ৫০০ কোটি টাকার মোট সম্পদ রয়েছে এমন মূলধননিবিড় কোম্পানি এবং গ্রিনফিল্ড বা নতুন প্রকল্পের কোম্পানির ক্ষেত্রে কমিশন ছাড় দিতে পারবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আবেদন এবং স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ প্রয়োজন হবে।

এ ধরনের কোম্পানিকে প্রসপেক্টাসে মুনাফায় যাওয়ার বিস্তারিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। পরিকল্পনায় সম্ভব হলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির দুই বছরের মধ্যে লাভজনক হওয়ার লক্ষ্য রাখতে হবে। পরিকল্পনাটি আন্তর্জাতিক মানের নির্ধারিত নিশ্চয়তা-সংক্রান্ত মানদণ্ড অনুসারে প্রি-আইপিও যাচাইকারী নিরীক্ষককে পরীক্ষা ও যাচাই করতে হবে।
এছাড়া যেসব কোম্পানির বর্তমান প্রকল্প বা কার্যক্রম নির্দিষ্ট মেয়াদের, তাদেরও আইপিওতে আসার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন প্রকল্প গ্রহণ বা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট ও নথিভুক্ত পরিকল্পনা থাকতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট কোম্পানিও এ সুযোগের আওতায় আসতে পারে।

এ পরিবর্তন কার্যকর হলে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদনির্ভর কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে কোম্পানিকে তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ মুনাফার সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে।

​আইপিওতে মূলধন ও শেয়ার ছাড়ার শর্ত

খসড়ায় সাধারণ কোম্পানির ক্ষেত্রে আইপিওর আগে বিদ্যমান পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাধারণ নিয়মে আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্তির পরের পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে হবে। বিমা কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির তালিকাভুক্তি পরবর্তী পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা হতে হবে। তবে আইপিওর আগে নিট সম্পদমূল্য অন্তত ৫০০ কোটি টাকা এমন কোম্পানি তালিকাভুক্তির পরের পরিশোধিত মূলধনের ৫ শতাংশের কম নয়, তবে ১০ শতাংশের নিচে শেয়ার ছাড়তে পারবে।

বিদেশি শেয়ারধারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা রয়েছে এমন কোম্পানি, বিটিআরসিতে নিবন্ধিত নির্দিষ্ট কোম্পানি এবং বার্ষিক টার্নওভার বা মোট সম্পদ ৫০০ কোটি টাকার বেশি এমন কোম্পানির জন্য আইপিও ও অফার ফর সেল (ওএফএস) মিলিয়ে শেয়ার ছাড়ার বিশেষ ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিট সম্পদমূল্য কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা হওয়ার শর্তও রয়েছে নির্দিষ্ট শ্রেণির কোম্পানির জন্য। এ ধরনের হাইব্রিড পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্তির পরের পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৫ শতাংশ নতুন শেয়ার হিসেবে ছাড়তে হবে। আইপিও ও ওএফএস মিলিয়ে মোট শেয়ার ছাড়ার পরিমাণ কমপক্ষে ১০ শতাংশ হতে হবে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, তালিকাভুক্তির প্রথম এক বছরের মধ্যে ওএফএসের মাধ্যমে তালিকাভুক্তির পরের পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ার বিক্রি করা যাবে না।

তালিকাভুক্তির পর ৩০ দিনে শেয়ার বিক্রি

ওএফএসের মাধ্যমে উদ্যোক্তা, পরিচালক বা বিদ্যমান শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির জন্য আলাদা বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে নতুন শেয়ার ইস্যুর পাশাপাশি বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসার পথ নির্ধারণ করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে হাইব্রিড আইপিও সম্পন্ন করে জনসাধারণের কাছে ছাড়ার জন্য নির্ধারিত শেয়ারের অন্তত ৫ শতাংশের সাবস্ক্রিপশন পাওয়ার পর, অন্যান্য প্রযোজ্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির যোগ্য বিবেচনা করা হবে।
তালিকাভুক্তির প্রথম দিনের জন্য বুক বিল্ডিংয়ে নির্ধারিত কাট-অফ প্রাইসকে রেফারেন্স প্রাইস হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। এরপর ওএফএসের আওতায় প্রতিশ্রুত শেয়ার প্রথম লেনদেনের দিন থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে।
প্রথম লেনদেনের দিন ওএফএসে বিক্রির প্রতিশ্রুত মোট শেয়ারের অন্তত ২৫ শতাংশ ছাড়তে হবে। বাকি শেয়ার পরবর্তী ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে। এ সময়ের জন্য প্রতিশ্রুত শেয়ার সংশ্লিষ্ট লক-ইন বিধান থেকে অব্যাহতি পাবে।
এছাড়া তালিকাভুক্তির তারিখ থেকে এক বছর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কোনো ওএফএস বিক্রেতা ওই কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারবেন না। শেয়ার বিক্রির অগ্রগতি সম্পর্কে বিক্রয়কারী ব্রোকারকে প্রতিদিন স্টক এক্সচেঞ্জে প্রতিবেদন দিতে হবে। বিক্রির প্রতিশ্রুতি পূরণের পর তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্রোকারকে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে হবে। ইস্যুকারী কোম্পানি ও ইস্যু ম্যানেজারকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিশন ও সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে যৌথ প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বণ্টনে পরিবর্তন
আইপিওতে কোন শ্রেণির বিনিয়োগকারী কত শতাংশ শেয়ার পাবেন, সেই বণ্টনেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। স্থির মূল্য পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ, ইস্যুকারী কোম্পানির স্থায়ী কর্মীদের জন্য ৫ শতাংশ, অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ১০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৬৫ শতাংশ শেয়ার রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য ৩৫ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ, স্থায়ী কর্মীদের জন্য ৫ শতাংশ, অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ১০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪০ শতাংশ শেয়ার বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ড, স্থায়ী কর্মী ও অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নির্ধারিত অংশের কোনো শেয়ার অবিক্রীত থাকলে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশে স্থানান্তর করা হবে।

অতিরিক্ত আবেদন বা ওভারসাবস্ক্রিপশনের ক্ষেত্রে যোগ্য বিনিয়োগকারী, মিউচুয়াল ফান্ড ও স্থায়ী কর্মীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে শেয়ার বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও অনাবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে শেয়ার বরাদ্দ করা হবে।
এ লটারি ব্যবস্থা স্টক এক্সচেঞ্জকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে হবে। এর অ্যালগরিদম ও কার্যপ্রণালি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে যাচাই করানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি বরাদ্দ-সংক্রান্ত সব কার্যক্রমের সময়ক্রমিক রেকর্ড রাখার জন্য অডিট ট্রেইল ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আইপিওর অর্থ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ
আইপিও বা পুনরায় মূলধন সংগ্রহের মাধ্যমে (আরপিও) পাওয়া অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, এ অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ দিয়ে কোম্পানির বিদ্যমান ঋণ বা বিনিয়োগ পরিশোধ করা যাবে। তবে সংশ্লিষ্ট ঋণ বা বিনিয়োগ কোম্পানির কোনো প্রকল্প অথবা ভারসাম্য রক্ষা, আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে হবে। অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া যে ঋণ পরিশোধ করা হবে, তা খেলাপি বা পুনঃতফসিল করা হওয়া চলবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ জমা দিতে হবে, যাতে ঋণটি খেলাপি বা পুনঃতফসিল করা হয়নি বলে নিশ্চিত করা হয়।
আইপিওর অর্থ দিয়ে যৌথ উদ্যোগ, সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো কোম্পানি অধিগ্রহণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও শর্ত রয়েছে। এ ধরনের বিনিয়োগে জনসাধারণের কাছ থেকে সংগৃহীত মোট অর্থের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা যাবে। বিনিয়োগের ধরন, প্রত্যাশিত সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ও আর্থিক অবস্থার বিবরণ প্রকাশ করতে হবে। অর্থের সম্পূর্ণ ব্যবহার শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষক দিয়ে নিরীক্ষিত ব্যবহার-প্রতিবেদন কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হবে। এছাড়া জনসাধারণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ জমা রাখার জন্য আলাদা এসক্রো ব্যাংক হিসাব খোলার প্রস্তাব রয়েছে। এ হিসাবে জমা অর্থ কেবল প্রসপেক্টাসে প্রকাশিত উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহার করা যাবে এ বিষয়ে ব্যাংককে লিখিত নির্দেশনা দিতে হবে।

তালিকাভুক্তির পর শেয়ার বিক্রির নিষেধাজ্ঞা
শেয়ার লক-ইন বা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিক্রি না করার বিধানেও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বরাদ্দ পাওয়া যোগ্য বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের ৫০ শতাংশ প্রথম লেনদেনের দিন থেকেই বিক্রির জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাকি ২৫ শতাংশ ৬০ দিন এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ ৯০ দিনের জন্য লক-ইনে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের শেয়ার প্রথম লেনদেনের দিন থেকে দুই বছর লক-ইনে থাকবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের তারিখ থেকে তিন বছর অথবা তালিকাভুক্তির প্রথম লেনদেনের দিন থেকে দুই বছর, যেটি পরে শেষ হবে সে সময় পর্যন্ত লক-ইন রাখার প্রস্তাব রয়েছে। খসড়ায় আরও কিছু ক্ষেত্রে এক বছরের লক-ইনের মেয়াদ কমিয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কোন শ্রেণির শেয়ারের ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট বিধানের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

ইস্যু ম্যানেজারের দায়বদ্ধতা বাড়ছে
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইপিও প্রক্রিয়ায় ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্ব ও জবাবদিহি আরও স্পষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। ইস্যু ম্যানেজার প্রয়োজনে অন্য মার্চেন্ট ব্যাংকার নিয়োগ করতে পারবে। তবে নির্দিষ্ট কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানকে দিলেও পুরো পাবলিক অফারের চূড়ান্ত দায়িত্ব ও জবাবদিহি ইস্যু ম্যানেজারের ওপরই থাকবে।
একই সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জকে আবেদন পাওয়ার ২০ দিনের মধ্যে কোম্পানির কারখানা, পরিচালনাস্থল বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং আর্থিক বিবরণী ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করতে হবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জ প্রয়োজন অনুযায়ী কোম্পানি, পরিচালক, কর্মকর্তা, নিরীক্ষক, ইস্যু ম্যানেজার, মূল্যায়নকারী, ব্যাংক, আন্ডাররাইটার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য, নথি, সনদ বা ব্যাখ্যা চাইতে পারবে। এ ছাড়া আইপিওর প্রসপেক্টাসে কোম্পানির দায়বদ্ধতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। কোম্পানিকে নিশ্চিত করতে হবে যে, সব যুক্তিসংগত অনুসন্ধান ও যাচাইয়ের পর প্রসপেক্টাসে প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রকাশিত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে সত্য, ন্যায্য ও সঠিক।