কক্সবাজার সমুদ্রের পাড়ে স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে নাহিদের কাটানো প্রাণোচ্ছ্বল মুহূর্তগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। পরিবারের সঙ্গে আনন্দভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরা হলো না নাহিদের। ইনানীর টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ চার সদস্যের পরিবারটি। রিসোর্টের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুন লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে রিসোর্টের বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন নাহিদ। কিন্তু দাউদাউ আগুন তাদের বাঁচতে দেয়নি। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় তাদের মরদেহ। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বাথরুম থেকে একসঙ্গে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পুড়ে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারছেন না প্রশাসনের কর্তারা। ধারণা করা হচ্ছে- বাথরুম থেকে উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহ নাহিদের পরিবারের।
নাহিদুর রহমানের বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে। ৪১ বছর বয়সী এই কর্মকর্তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানাকে (৩) নিয়ে ঢাকার শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন। পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সৈকতসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে উঠেছিলেন। ১৬ই অক্টোবর থেকে ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত কক্ষ বুকিং ছিল তাদের। গতকাল দুপুরে রিসোর্ট ছেড়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল।
কিন্তু শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্বজনরা বারবার ফোন করেও কাউকে পাননি। সবার মুঠোফোন বন্ধ। এরপর বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়েও চারজনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি তারা। নাহিদুরের বড়ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, ভাই ও তার পরিবারের সদস্যদের কোনো সন্ধান না পেয়ে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরিবারের চারজন বেঁচে আছেন, নাকি অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন-এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
এদিকে ওই অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আগুনে মরদেহগুলোর মুখমণ্ডল পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে জটিলতা দেখা দিয়েছে। নিখোঁজ নাহিদুরের পরিবারের চারজন উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে রয়েছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পরিচয় নিশ্চিত করতে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির জানান, মরদেহগুলোর দাবিদার হিসেবে একাধিক পরিবার সামনে এসেছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
মনিরামপুরের বাড়িতে চলছে মাতম: এদিকে নাহিদের যশোরের মনিরামপুরের মোহনপুর গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছেলে, বউমা আর তাদের দুই কন্যাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান। গতকাল সকালে মোহনপুর গ্রামে গিয়ে এক শোকাতুর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। শোকাহত পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ভাঙা বিলাপে স্তব্ধ গোটা গ্রাম।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছোট ছেলে নাহিদুর রহমান। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তিনি স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে ১৫ই অক্টোবর রাতে ঢাকা থেকে রওনা হন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। পরদিন ভোরে কক্সবাজার নেমে আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখা ইনানী সী বিচের কাছাকাছি টুপটুপ রিসোর্টে চলে যান। ১৬ই অক্টোবর বেলা ১২টার দিকে রিসোর্টের ২০২ নম্বর স্যুটে উঠেন পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে। দিনভর সী বিচসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে শুক্রবার রাতের খাবার খেয়ে নাহিদুর দম্পতি ২ শিশুকন্যাকে নিয়ে ঘুমাতে যান। কিন্তু এই ঘুমই যে তাদের জীবনের শেষ ঘুম হবে তা কি কেউ জানতো?
নাহিদুর রহমান তুহিনের চাচাতো ভাই ও মনিরামপুর হাসপাতাল মোড়ের ওষুধ ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন জানান, শুক্রবার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে উঠেন তুহিন। দুইদিন অবস্থান শেষে রোববার তাদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল। শুক্রবার দিনগত রাত ১২টার পর থেকে তুহিনের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পেয়ে তুহিনের স্ত্রী তানজির ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা স্বজনরা। ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। তাদের ফোনের সর্বশেষ অবস্থান রিসোর্ট এলাকায় দেখাচ্ছিল বলে জানান রিয়াজ। তিনি বলেন, দিনভর খোঁজাখুঁজি করেও তুহিন ও তার পরিবারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
শনিবার সন্ধ্যায় রিসোর্টের শৌচাগার থেকে পরস্পরকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় চারজনের দগ্ধ লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর স্বজনদের মধ্যে তাদের বেঁচে থাকা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়। তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স শনিবার থেকে তার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। রোববার সকালে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। প্রিন্স মোবাইলে বলেন, ‘তুহিন ও তার স্ত্রী, দুই মেয়ে বেঁচে আছেন কি না, আমরা শনিবার পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে রোববার সকালে স্থানীয় প্রশাসন ও মেডিকেল টিম নাহিদ ও তার স্ত্রী সন্তানদের মৃতদেহ নিশ্চিত করেন। তারপরই আমরা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবাকে রেখে যাচ্ছি। আল্লাহ ভরসা।
মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাঈদ বলেন, কক্সবাজারের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মনিরামপুরের ওই দম্পতি ও তাদের দুই মেয়ে রয়েছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। তাদের লাশ স্থানীয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তবে এখনো লাশ শনাক্ত করা যায়নি বলে জানান তিনি।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. মিরাজুল ইসলামও একই তথ্য দেন। তিনি জানান, তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান ঘটনাস্থলে পৌঁছালে লাশ শনাক্তের কাজটি সম্পন্ন হবে। ভাইয়ের খোঁজে ইতিমধ্যে জাহিদুর রহমান ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন। টুপটুপ রেসটো অ্যান্ড রিসোর্টের ইনভয়েস সূত্রে জানা যায়, নাহিদুর রহমান ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর দুই রাতের জন্য ২০২ নম্বর সুপার ডিলাক্স কক্ষ বুক করেছিলেন। সঙ্গে ছিল তার স্ত্রী আফসানা, সাত বছর বয়সী কন্যা রোবাইনা, তিন বছর বয়সী কন্যা সুনাইনা।
নিখোঁজ জাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন। নাহিদ মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।
গত শনিবার সকালে পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়।
