দুদকের দুর্নীতির মামলায় বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান কাতারে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত ১৫ই অক্টোবর দোহায় তাকে গ্রেপ্তার করে কাতার পুলিশ। গতকাল ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এবার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করতে তৎপর সংস্থাটি। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির সচিব সাইদুর রহমান খান। তিনি বলেন, শনিবার অনানুষ্ঠানিকভাবে হান্নানের গ্রেপ্তারের খবর পেয়েছিল দুদক। রোববার বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখার মাধ্যমে ইন্টারপোল থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন তিন বছর: শেখ আব্দুল হান্নান ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ২০২১ সালের ১২ই জুন তিনি বিমান বাহিনীর ১৬তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ১১ই জুন পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। দুদক সূত্র জানায়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে হান্নান এবং তার স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা রয়েছে। প্রথম মামলায় হান্নানের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০৬ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও পেয়েছে দুদক।
অন্যদিকে, তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯১ লাখ ৯০ হাজার ৩০৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার নামে থাকা ৩২টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলায় তাহমিদাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তাকে সহযোগিতার অভিযোগে আসামি করা হয়েছে হান্নানকেও।
বিদেশে সম্পদের খোঁজ: ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, নিয়োগ বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে সাবেক এই বিমান বাহিনী প্রধানের বিরুদ্ধে। বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও তদন্ত করছে দুদক। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানে ২০২৫ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি তিন সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়। পরে একই বছরের ২৭শে জুলাই হান্নান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে হান্নানের কাতার, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে থাকা সম্পদের তথ্য চেয়ে চলতি বছরের ২৩শে মে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দেয় দুদক। একই বিষয়ে ২১শে জুন পুলিশের এনসিবি শাখার কাছেও তথ্য চাওয়া হয়। আদালতের আদেশে হান্নান ও তার স্ত্রীর নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এসব সম্পদ দেখভালের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে রিসিভার। হান্নানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদক সচিব।
এদিকে, বিদেশে অবস্থান করা সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদসহ অন্য অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতি নিয়েও কথা বলেন দুদক সচিব। তিনি জানান, অভিযুক্তদের ফিরিয়ে আনতে দুদকের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে। বিদেশি কর্তৃপক্ষ যেসব তথ্য চাইছে, সেগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে। অচিরেই ইতিবাচক ফল পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী দুদক।
জমি-ফ্ল্যাট ক্রোক, ৩৮ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ: দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হান্নানের নামে থাকা জমি, বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট ও ছয়টি ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে আদালত ক্রোক ও অবরুদ্ধের আদেশ দেন। পরে ২০২৫ সালের ২৪শে মে হান্নান, তার স্ত্রী তাহমিদা বেগম ও ছেলে শেখ লাবিব হান্নানের নামে থাকা মোট ৩৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়। এসব হিসাবের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর এবং সম্পদ হস্তান্তর ঠেকাতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল দুদক। এ ছাড়া, হান্নানের নামে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার কিসমত মালিপাটন মৌজায় থাকা ৩৪ শতাংশ জমি ক্রোকের আদেশ দেন আদালত। গত ২০শে সেপ্টেম্বর এ আদেশ দেয়া হয়। তার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। আদালতের আদেশে ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা সম্পদ দেখভালের জন্য রিসিভারও নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।
