জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদার রক্ষাই হবে আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সাভার সেনানিবাসে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। সাভার সেনানিবাসে পেশাগত সাফল্যের জন্য সেনাবাহিনীর ৭টি ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রদান উপলক্ষে এই অনুষ্ঠান হয়।
ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডপ্রাপ্তরা হলো- প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সাত এবং বত্রিশ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, পঁচিশ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, নবম ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন এবং ছাপান্ন ও সাতান্ন ইস্ট বেঙ্গল। সকালে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব. একেএম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ জামান ও নবম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ও সাভার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোল্লা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। পরে প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহণ করেন এবং প্যারেড পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বলতে চাই, জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদার রক্ষাই হবে আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার। বাংলাদেশ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা সুদৃঢ় করতে চায়।
ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রাপ্তির গৌরব অর্জনকারী ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এই ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড শুধু একটি পতাকা নয় বরং এটি একটি ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারিত্ব এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক। জাতীয় পতাকার গৌরবময় উড্ডয়ন প্রতিনিয়ত আমাদেরকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেই জাতীয় পতাকা আপনাদের হাতে তুলে দেয়া হলো। জাতীয় পতাকা অর্জনের অর্থ হলো আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আরও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার নতুন শপথ। পতাকার মান রক্ষা করা সকল সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্বীকার করার উপায় নেই বিভিন্ন সময় সশস্ত্রবাহিনীর ইমেজ বিনষ্টের অপচেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের মনে রাখা জরুরি, স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়েই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর বর্বরোচিত হামলা শুরু হলে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ‘উই রিভল্ট’ উচ্চারণ করেছিলেন। ‘উই রিভল্ট’ উচ্চারণ করেই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ফিরে তিনি সেনাবাহিনীর সকল বাংলাভাষী কর্মকর্তা এবং সৈনিকদের জড়ো করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সে সম্পর্কে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিজের লেখা একাধিক নিবন্ধে সেটি উল্লেখ রয়েছে। ‘একটি জাতির জন্ম’ এই নিবন্ধে শহীদ প্রেসিডেন্ট লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন, সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটালিয়নের অফিসার, জেসিও আর জোয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানতো। আমি সংক্ষেপে বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে দৃষ্টচিত্রে এ আদেশ মেনে নিলো। আমি তাদের একটি সামরিক পরিকল্পনা দিলাম। তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সাল, বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন এই দিনটিকে স্মরণ রাখবে ও ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনোদিন ভুলবে না। কোনোদিনও না।
সরকারপ্রধান বলেন, শহীদ জিয়ার লেখা এসব তথ্য ১৯৭২ সালে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা, ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা এবং ১৯৮০ সালের দৈনিক দেশ পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এই তথ্যে প্রমাণিত, বাংলাদেশের জন্ম যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্ম ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে গণহত্যার বিরুদ্ধে এক, দুই, তিন, চার এবং অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাংলাভাষী সৈনিক সদস্যরা পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ২৬শে মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে তিনি (জিয়াউর রহমান) বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর ২৭শে মার্চ পুনরায় তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যে ঘোষণাটি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধে একজন সেনা কর্মকর্তা এমন ঐতিহাসিক ও বিরোচিত ভূমিকা নিঃসন্দেহে সেনাবাহিনীর জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক এক গৌরবজনক অধ্যায়। এ কারণেই স্বাধীনতাপ্রিয় দেশপ্রেমিক জনগণ সেনাবাহিনীর যেকোনো সাফল্যকে বাংলাদেশের সাফল্য বলেই গণ্য করে।
তিনি বলেন, একটি আধুনিক সশস্ত্রবাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র সরঞ্জাম বা জনবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থার মধ্যে। সর্বোপরি চেইন অব কমান্ড। বর্তমান সরকার সশস্ত্রবাহিনীকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার এবং সর্বাধুনিক হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। একইসঙ্গে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সশস্ত্র সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সৈনিকগণ সংবিধান, আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকবেন- এটিই জনগণের প্রত্যাশা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বের নিরাপত্তা পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের ধরন এবং কৌশল। স্থল, সমুদ্র এবং আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাস্তবতায় আমাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নেয়ার কাজ চলমান। বর্তমান সরকার সর্বক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং প্রতিরক্ষা সামগ্রী দেশে উৎপাদনের জন্য দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছে। তবে প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়। আমাদের এমন একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রয়োজনের মুহূর্তে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারবে।
তিনি বলেন, সশস্ত্রবাহিনী শুধু দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্বই পালন করে না। দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতেও সশস্ত্রবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি বিদেশের শান্তিরক্ষা মিশনেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এসেছে সশস্ত্রবাহিনী। সরকার সেনাসদস্যদের কল্যাণ, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং অবসর পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ইতিমধ্যেই জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০% থেকে ১৩৮% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেনাসদস্যদের জীবনযাপনের মান আরও উন্নত করার লক্ষ্যে ওয়ান রংক ওয়ান পেনশন বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব. একেএম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ জামান ও নবম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ও সাভার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোল্লা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
