আজ সকালে প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পানি এসেছে। বাগানের মতো সুন্দর এই শহরের বুকে সহিংসতার চিহ্ন দেখে মনে হয়েছে, সভ্যতার সংকট কখনো কখনো তার সবচেয়ে সুন্দর মুখের ওপরই আঘাত হানে। প্যারিস কেবল ফ্রান্সের রাজধানী নয়; এটি স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শিল্প ও মুক্তচিন্তার ঐতিহাসিক প্রতীক। সেই শহরের রাস্তায় ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের দৃশ্যকে নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকটের প্রশ্নও সামনে আসে।
১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভকে ঘিরে ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জনঅসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, বিরোধী বামপন্থীরা পুলিশের কৌশল ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উভয়পক্ষই নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রশ্নকে সামনে এনেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ যখন সহিংসতা, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের রূপ নেয়, তখন তার দায় কে বহন করবে? রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাকি সেইসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী, যারা প্রতিবাদের আড়ালে অপরাধ সংঘটিত করে?
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব রাজতন্ত্রের বৈধতা, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকটে ইতিহাসের কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছিল। স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ আধুনিক গণতন্ত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু সেই বিপ্লবের ইতিহাসও রক্তপাত, প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের অন্ধকার অধ্যায়ে ভরা। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট: জনতার ক্ষোভ ন্যায়সংগত হতে পারে, কিন্তু ক্ষোভের প্রতিটি বহিঃপ্রকাশ ন্যায়সংগত নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কখনোই অন্যায় করার লাইসেন্স হতে পারে না।
২০১৮ সালের এরষবঃং লধঁহবং বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনও দেখিয়েছিল, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভ কীভাবে একটি জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও করনীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হয়। কিন্তু আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘটিত সহিংসতা জনসমর্থন, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সহিংসতার পেছনে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতার অভিযোগ তুলেছেন। জ্যঁ-লুক মেলেশোঁ পুলিশের ভূমিকা ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মেরিন ল্য পেন ও জর্দান বারদেলার মতো ডানপন্থী নেতা আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবি জোরালো করেছেন।
তবে রাজনৈতিক নেতাদের অভিযোগ আর প্রমাণিত সত্য এক বিষয় নয়। কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে পরিকল্পিত সহিংসতার জন্য দায়ী করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
এই সহিংসতা কি বিচ্ছিন্ন অপরাধের ফল, নাকি এর পেছনে সংগঠিত উসকানি ছিল? হামলাকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ, পূর্বপরিকল্পনা কিংবা অর্থায়নের কোনো প্রমাণ আছে কি? কর্তৃপক্ষ কি আগে থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত ছিল? পুলিশ কি যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েছিল? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকলে তার দায় কে নেবে?
২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই অস্থিরতার রাজনৈতিক তাৎপর্যও উপেক্ষা করা যায় না। নির্বাচনের প্রথম দফা আগামী বছরের ১৮ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফা ২ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে বর্তমান সহিংসতা নির্বাচনী বিতর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
সহিংসতার দৃশ্য কঠোর নিরাপত্তা, শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিকে জোরালো করতে পারে। অন্যদিকে, পুলিশের আচরণ ও বলপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনতে পারে।
এখানেই রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত। সরকার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিতে পারে; বিরোধীরা সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরতে পারে; ডানপন্থীরা নিরাপত্তাকে প্রধান নির্বাচনী ইস্যু করতে পারে; বামপন্থীরা সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও সরকারি নীতির সমালোচনা করতে পারে।
কিন্তু নির্বাচনের আগে সহিংসতা ঘটছে বলেই সেটি নির্বাচনী ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নয়। রাজনৈতিক সুবিধা, রাজনৈতিক দায় এবং অপরাধমূলক পরিকল্পনা-তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এগুলোকে এক করে দেখলে প্রকৃত সত্য আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিধা থাকতে পারে না- কোনো রাজনৈতিক ক্ষোভ, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কিংবা নেতৃত্বের অযোগ্যতাই নিরীহ মানুষের ওপর হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের বৈধতা দিতে পারে না।
প্রতিবাদ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারের নামে অন্যের জীবন, জীবিকা ও সম্পদ ধ্বংস করা প্রতিবাদ নয়- এটি নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান লুট করে, একজন শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ধ্বংস করে কিংবা সাধারণ নাগরিককে আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দিয়ে কোনো ন্যায়সংগত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা যায় না।
প্যারিস বেঁচে থাকুক। ফ্রান্সের গণতন্ত্র বেঁচে থাকুক। স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ বেঁচে থাকুক। বিপ্লবের নামে যেন নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, আর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে যেন নাগরিক স্বাধীনতা পদদলিত না হয়।
