সাধু ও ভক্তদের সমাগমে মুখর লালন শাহর আখড়াবাড়ি

তিরোধান দিবস

সাধু ও ভক্তদের সমাগমে মুখর লালন শাহর আখড়াবাড়ি

ফন্ট সাইজ:

মরমি সাধক ফকির লালন শাহের অমর গান, মানবতাবাদী দর্শন আর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মুখর হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া। একতারা, দোতারা আর ঢোলের ছন্দে বাউলগানের সুরে মেতে উঠেছেন দেশ-বিদেশ থেকে আসা সাধু-গুরু, বাউল-ফকির ও লালনভক্তরা। জাত-ধর্মের বিভেদ ভুলে লালনের আখড়াবাড়িতে মিলেছেন নানা শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষ। গানের সুরে সুরে ছড়িয়ে পড়ছে মানবতা, সম্প্রীতি আর মানুষকে ভালোবাসার চিরন্তন বার্তা।

ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনের লালন স্মরণোৎসব। ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে বাউলগানের আসর, সাধুসঙ্গ, আলোচনা সভা ও নানা আনুষ্ঠানিকতায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে আয়োজনের জৌলুশ ছাপিয়ে বারবার সামনে আসছে লালনের সেই চিরন্তন দর্শন, যেখানে জাত-পাত, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষের পরিচয়ই মুখ্য।

গতকাল বিকেল থেকেই আখড়াবাড়িতে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাউল-ফকিরদের কণ্ঠে ভেসে আসে লালনের কালজয়ী গান। কেউ একতারা হাতে সুর তুলছেন, কেউ দোতারায় বাঁধছেন ছন্দ। ঢোলের তালে তালে গানের আসরে মগ্ন হয়ে পড়ছেন ভক্ত-অনুরাগীরা। দর্শনার্থীদের কেউ মুঠোফোনে ধারণ করছেন সেই মুহূর্ত, কেউ আবার নীরবে ডুবে থাকছেন গানের সুরে।

আখড়াবাড়ি ঘিরে তৈরি হয়েছে এক আত্মিক আবহ। অনেকের কাছে এই আয়োজন শুধু গান শোনা কিংবা মেলা ঘুরে দেখার উপলক্ষ নয়, বরং লালনের জীবনদর্শনকে নতুন করে জানা ও উপলব্ধি করার সুযোগ। সাধু-গুরু ও বাউলদের কাছে ছেঁউড়িয়া যেন সাধনা, আত্মশুদ্ধি এবং মানবিক চেতনার এক মিলনক্ষেত্র।

লালন শাহের দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। তার গান ও সাধনায় বারবার উঠে এসেছে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রচলিত সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্ন করার সাহস। ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতপাতের অহংকার কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানবিক সত্তাকে বড় করে দেখেছেন এই মরমি সাধক।

‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’, ‘জাত গেল জাত গেল বলে’ কিংবা ‘মিলন হবে কত দিনে’—লালনের এমন অসংখ্য গান যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মনে আলোড়ন তুলছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ ও মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে নানা বদল। কিন্তু লালনের গানের আবেদন কমেনি। বরং বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের সময়ে তার মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

লালনভক্তদের মতে, তার গান মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়। একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জাতিগত বিভেদের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করে দেখার প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। তাই লালনকে শুধু বাউলগানের শিল্পী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, তার গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে মানুষ, সমাজ ও জীবনের গভীর অনুসন্ধান।

স্মরণোৎসব উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছেঁউড়িয়ায় এসেছেন সাধু-গুরু ও বাউল-ফকিরেরা। তাদের অনেকের কাছে লালনের আখড়াবাড়ি কেবল একটি স্মৃতিবিজড়িত স্থান নয়, বরং সাধনা ও আত্মিক সংযোগের ক্ষেত্র। বছরের পর বছর ধরে তারা এখানে আসেন গুরুর স্মরণে, সাধুসঙ্গে অংশ নিতে এবং লালনের গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভাবজগৎকে সমৃদ্ধ করতে।

এই মিলনমেলায় ধর্মীয় কিংবা সামাজিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে মানুষের প্রতি মানুষের টান। গানের আসর ও সাধুসঙ্গের মধ্য দিয়ে একে অপরের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করছেন তারা। লালনের দর্শনকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই সাংস্কৃতিক পরিসর ছেঁউড়িয়াকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।

তবে লালনসাধকদের মতে, শুধু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা কিংবা গানের পরিবেশনার মধ্যে লালনকে সীমাবদ্ধ রাখলে তার দর্শনের পূর্ণতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তার গান, জীবনদর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তা নিয়ে আরও গবেষণা, নিয়মিত চর্চা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
লালন আখড়াবাড়ির পাশাপাশি কালীগঙ্গা নদীর পাড়েও ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। নদীর তীর ঘিরে দর্শনার্থীদের আনাগোনা, স্থানীয় মানুষের ব্যস্ততা এবং মেলাকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন উৎসবকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

মেলা প্রাঙ্গণে অস্থায়ী দোকান বসিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে খাবার, খেলনা, পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। আখড়াবাড়িতে বাউলগানের আসর উপভোগের পাশাপাশি দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখছেন মেলার স্টলগুলো। তাঁদের আগমনে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও তৈরি হয়েছে বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য।

উৎসবে তরুণদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছেন লালনের গান শুনতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উৎসবের মুহূর্ত ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অনেক তরুণের মধ্যে লালনের গান ও দর্শন সম্পর্কে জানার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তাদের এই অংশগ্রহণ লালনের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও তুলে ধরছে।
সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, লালনকে শুধু কয়েক দিনের স্মরণোৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে তার গান, দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তাকে নিয়মিত চর্চার মধ্যে রাখতে হবে। পাঠ্যক্রম, গবেষণা, সংগীতচর্চা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার দর্শনকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।

তাদের মতে, সমাজে যখন নানা ধরনের বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন লালনের দর্শন মানুষকে সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দিতে পারে। তার গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, মানুষের আত্মপরিচয় ও মানবিক মূল্যবোধ অন্বেষণেরও এক শক্তিশালী অবলম্বন।

তিন দিনের লালন স্মরণোৎসব তাই শুধু একজন মরমি সাধকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন নয়; এটি তার দর্শনকে নতুন করে উপলব্ধি করারও উপলক্ষ। ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে একতারা-দোতারার সুর, সাধুসঙ্গ আর ভক্তদের মিলনমেলায় বারবার উচ্চারিত হচ্ছে সেই চিরন্তন সত্য মানুষের পরিচয়ই সবার আগে, মানবতার চেয়ে বড় কোনো বিভেদ নয়।