নিজের দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে গোপনে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সামরিক তথ্য ও যুদ্ধপরিকল্পনা সরবরাহ করেন ২৬ বছর বয়সী এক রুশ সেনা কর্মকর্তা। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে চালানো হামলায় ৩০০ জনেরও বেশি রুশ সেনা নিহত হয়। এরপর ফ্রন্টলাইন পেরিয়ে ইউক্রেনে পালিয়ে যান তিনি। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত একটি রুশ স্বেচ্ছাসেবক ইউনিটে যোগ দেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে এ খবর দিয়েছে এনডিটিভি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লেফটেন্যান্ট লেভ স্তুপনিকভ রুশ সামরিক বাহিনীতে তার পদের সুবিধা নিয়ে ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের সংবেদনশীল তথ্য দিতেন। তার দায়িত্বের কারণে তিনি রুশ সেনাদের গতিবিধি, যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং নজরদারি ড্রোন ও ক্যামেরার লাইভ ফিড ব্যবহারের সরাসরি সুযোগ পেতেন। তবে এই সিদ্ধান্তের জন্য তাকে ব্যক্তিগত জীবনে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। ইউক্রেনে পৌঁছানোর পর স্ত্রীর সঙ্গে তার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার স্ত্রী তার বিরুদ্ধে দেশ এবং বৈবাহিক সম্পর্কের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগ তোলেন।
যেভাবে তথ্য পাচার ও হামলা
বুদিয়োনি মিলিটারি একাডেমি অব দ্য সিগন্যাল কোরের স্নাতক স্তুপনিকভকে দোনেৎস্ক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর ভুহলেদার দখলের দায়িত্বে থাকা একটি ব্যাটালিয়নের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তার দায়িত্ব ছিল কমান্ডারদের সঙ্গে ফিল্ড ইউনিটের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা এবং ড্রোন নজরদারির তথ্য সরবরাহ করা। কিন্তু তিনি উল্টো গোপনে ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের কাছে রুশ বাহিনীর সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও অভিযানের পরিকল্পনার তথ্য পাঠাতে শুরু করেন।
পূর্ব ইউক্রেনের এক তীব্র শীতের সকালে স্তুপনিকভ পেটে ব্যথার ভান করে অন্য সেনাদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। এর কিছুক্ষণ পরই তার পাঠানো সুনির্দিষ্ট স্থানাঙ্কে (কো-অর্ডিনেটস) আঘাত হানে ইউক্রেনীয় ক্ষেপণাস্ত্র। ওই হামলায় ইউক্রেনের অন্যতম শীর্ষ টার্গেট হিসেবে পরিচিত কর্নেল গুসেইন মুসায়েভসহ ৬৮ জন রুশ সেনা নিহত এবং আরও ৬০ জন আহত হন। হামলার পর ইউক্রেনীয় যোগাযোগকারী তার কাছে কোনো বিস্ফোরণ হয়েছে কি না জানতে চেয়ে ছবি চাইলে স্তুপনিকভ উত্তর দিয়েছিলেন, এখানে কেবল মাংস পড়ে আছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্তুপনিকভের মতো এমন হাজার হাজার রুশ নাগরিক ও সেনা এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কিয়েভের গোয়েন্দাদের নিয়মিত তথ্য দিচ্ছেন।
মায়ের সহায়তায় ইউক্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে মস্কোর পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই যুদ্ধের চরম বিরোধী হয়ে ওঠেন স্তুপনিকভ। সাধারণ মানুষের ওপর বোমা হামলা দেখে তিনি এটিকে ‘অশুভ’ হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্যদিকে তার ৪৯ বছর বয়সী মা তাতিয়ানা ইয়ান্তসেনও ছিলেন পুতিনবিরোধী একজন সক্রিয় কর্মী। ফ্রন্টলাইনে ছেলে যোগ দেয়ার তিন মাস পর, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের সহযোগী কম্পিউটার প্রোগ্রামার দিমিত্র কারপেনকোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন তাতিয়ানা। কারপেনকো এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে রুশ তথ্যদাতাদের একটি বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিলেন। এমনকি যুদ্ধ সংক্রান্ত তথ্য দেয়া রুশ সেনাদের জন্য আড়াই লাখ রুবল (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ টাকা) পুরস্কারের ঘোষণাও ছিল তার। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই স্তুপনিকভের পালানোর ছক চূড়ান্ত করা হয়।
সীমান্ত পেরিয়ে দলবদল
২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক রাতে নিজের রুশ ইউনিট থেকে পালিয়ে উত্তর দিকে ইউক্রেনীয় অবস্থানের দিকে রওনা হন স্তুপনিকভ। ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার থেকে ড্রোন ক্যামেরায় লাইভ দেখে তার গতিবিধি নজরদারি করছিল ইউক্রেনীয় বাহিনী। প্রায় ৪০ মিনিট হেঁটে ইউক্রেনের ৭২তম ব্রিগেডের অবস্থানের কাছে পৌঁছান তিনি। রুশ ইউনিফর্মে তাকে আসতে দেখে ইউক্রেনীয় সেনারা রাইফেল তাক করে পূর্বনির্ধারিত গোপন পাসকোড জানতে চায়। স্তুপনিকভ পাসকোড দেন— ‘পিনাট শপ’। এরপরই তাকে নিরাপদে নিজেদের হেফাজতে নেয় ইউক্রেনীয় বাহিনী। পরবর্তীতে স্তুপনিকভ ক্রেমলিনবিরোধী জাতিগত রুশদের নিয়ে গঠিত ইউক্রেনীয় সামরিক ইউনিট ‘রাশিয়ান ভলান্টিয়ার কোর’ (আরভিসি)-এ যোগ দেন এবং বর্তমানে তাদের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৫ সালের শুরুতে তার মা ও বোনও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইউক্রেনে চলে যান। সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে স্তুপনিকভ দাবি করেন, তিনি কোনো শপথ ভঙ্গ করেননি। সামরিক একাডেমিতে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন, যা পুতিনের ইউক্রেনে হামলার মাধ্যমেই মূলত ধ্বংস হয়েছে।
