বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত কারণে প্রায় দুই লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এই মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে তামাক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০২৬) পাস হয়েছে এবং গত ১০ এপ্রিল ২০২৬ থেকে তা কার্যকর হয়েছে। নতুন আইনে তামাক নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী যুক্ত হয়েছে। এখন এই আইনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো—দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন করা। বিধিমালা ছাড়া এই আইন অনেকটাই ইঞ্জিনবিহীন গাড়ির মতো। কাগজে আইন থাকলেও বাস্তবে তার সুফল পেতে হলে দ্রুত বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি।
একটি আইনে নীতিগত বিধান নির্ধারিত হলেও সেই বিধানগুলোকে সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কাঠামোর মধ্যে আনতে বিধিমালার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে দায়িত্ব, পদ্ধতি, সীমারেখা, নজরদারি ও জবাবদিহির মতো বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করার ক্ষেত্রে বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সংশোধিত আইন প্রণয়নের পর বিধিমালা প্রণয়নে অযথা দীর্ঘসূত্রিতা না করে দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।
সংশোধিত আইনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—পাবলিক প্লেস, সকল যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক পাবলিক পরিবহণে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার ও ধূমপান এলাকার ব্যবস্থা রাখা নিষিদ্ধ; বিক্রয়স্থল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সকল প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, প্রেক্ষাগৃহ এবং চলচ্চিত্রে যেকোনো উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিষিদ্ধ; সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির নামে কোন তামাক কোম্পানির নাম, সাইন, ট্রেডমার্ক ও প্রতীক ব্যবহার এবং কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির নামে সহায়তা প্রদান নিষিদ্ধ; ১৮ বছরের নিচে কারও কাছে ও কারও দ্বারা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিষিদ্ধ; শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশু পার্কের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিষিদ্ধ; পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ‘নো-স্মোকিং সাইনেজ’ স্থাপন বাধ্যতামূলক ইত্যাদি।
এসব বিধানের অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে এবং কোন সীমারেখার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো কার্যকর কাঠামো পাবে তা স্পষ্ট করার জন্য বিধিমালা অপরিহার্য। তাই আইন প্রণয়নের পর এখন বিধিমালা প্রণয়নেই অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামাক ব্যবহারকারী দেশ। গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে-২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৩৫.৩ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই হার ২০০৯ সালের ৪৩.৩ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে ৩৫.৩ শতাংশে নেমে এলেও এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। তার সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। এঅঞঝ ২০১৭-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার ৩৫.৩ শতাংশ, যেখানে ভারতে ২৮.৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯.১ শতাংশ। তামাকের এই ব্যাপক ব্যবহার কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকিই তৈরি করছে না; এর রয়েছে বড় অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতিও। টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৩ সালে মোট মৃত্যুর ১৮.২৭ শতাংশ তামাক ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল; তামাকজনিত মৃত্যুর হিসাব প্রায় ২ লাখ।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট ও ইকোনোমিক্স ফর হেলথ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা; বিপরীতে তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের তুলনায় তামাকের অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি।
এই বাস্তবতায় তামাক নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সেই আইনের পরবর্তী কাঠামো অর্থাৎ বিধিমালা প্রণয়নেও একই মাত্রার গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাসের পর বিধিমালা প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রিতা প্রায়ই তামাক শিল্পকে প্রভাব খাটানোর সুযোগ করে দেয়। তাই বিধিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া হতে হবে দ্রুত এবং জনস্বার্থভিত্তিক।
বাংলাদেশ ২০০৩ সালে WHO Framework Convention on Tobacco Control (WHO FCTC)-এ স্বাক্ষর করেছে। এটি তামাক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য চুক্তি। ঋঈঞঈ-এর বিভিন্ন ধারা তামাক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোকে স্পষ্ট করেছে। কিন্তু আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা, যেমন জনস্বাস্থ্য নীতিকে তামাক শিল্পের প্রভাব থেকে সুরক্ষা, তামাক ছাড়তে সহায়তা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো আরো সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই সংশোধিত আইনের বিধিমালা প্রণয়নের সময় এসব বাধ্যবাধকতা ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকাকে কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার হিসেবে নয়, দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে কার্যকর করার একটি ব্যবহারিক কাঠামো হিসেবেও বিবেচনা করা দরকার।
সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকোসহ সকল উদীয়মান তামাক পণ্যের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য ঘাটতি। সেই সাথে খুচরা শলাকা ও খোলা তামাকজাত পণ্যের বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে শর্তসাপেক্ষে নির্ধারিত ধূমপান এলাকা রাখার সুযোগও রয়ে গিয়েছে।
এসব সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলোও বিধিমালা প্রণয়নের সময় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, তামাকজাত পণ্যের ধরন, বাজারজাতকরণ কৌশল ও ব্যবহারের ধরন পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকেও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। ফলে সংশোধিত আইনের বিধিমালা প্রণয়নের সুযোগটি কেবল বিদ্যমান বিধানগুলোকে বিস্তারিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করার একটি নীতিগত সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেননা আইনের ভাষা যত শক্তিশালীই হোক, কার্যকর বিধিমালা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োগকারী সংস্থা আইনের ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
তাই সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা অংশীজনদের এখন মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রণয়ন করা। সরকার তামাকমুক্ত দেশ গড়ার যে অঙ্গীকার করেছে, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তার নীতিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন দ্রুত ও যথাযথ বিধিমালা প্রণয় সেই ভিত্তিকে আরও সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ করবে এবংলাখো মানুষের জীবনকে রক্ষা করবে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সদস্য, নারী মৈত্রী তামাক বিরোধী মায়েদের ফোরাম।
