রাজধানীর পুরান ঢাকা। সরু রাস্তা, ঘিঞ্জি গলি। আলো-বাতাসহীন ভবনে রাসায়নিকের গুদাম। প্লাস্টিক-প্রসাধন সামগ্রীর কারখানা। মার্কেটের গোডাউন। প্রতিনিয়তই এসব ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি ঘটনাতেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে ফায়ার ফাইটারদের। পানি ও পর্যাপ্ত জায়গার সংকটে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে না। অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি ও জনদুর্ভোগের পর গঠন করা হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। সুপারিশসহ বিভিন্ন মহল থেকে জারি করা হয় নোটিশ। তবে বাস্তবচিত্র ভিন্ন। একাধিকবার ঘোষণা দেয়া হলেও পুরান ঢাকার বিষয়ে আজ পর্যন্ত কোনো সরকারের আমলেই কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
সর্বশেষ গত ১২ই অক্টোবর চকবাজারের ছোট কাটরা এলাকায় মঞ্জুর খান প্লাজা মার্কেটের আগুন আবারো পুরান ঢাকার অগ্নিনিরাপত্তার দুর্বলতা সামনে এনেছে। সাততলা ভবনটির ৬ষ্ঠ তলার একটি গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ছাতা, প্রসাধনী, আতরসহ বিভিন্ন পণ্য রাখার একাধিক গুদামে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার বিকাল ৫টায় আগুন লাগলেও ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের ১০০ থেকে ১৫০ কর্মীর প্রচেষ্টায় ১২ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে পুরোপুরি আগুন নেভাতে সময় লাগে প্রায় ৩৭ ঘণ্টা। সরু রাস্তা, ঘন ধোঁয়া, বায়ু চলাচলের সীমাবদ্ধতা ও পানির সংকটে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত চারজন ফায়ার ফাইটার। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আগুন লাগা মনসুর খান প্লাজার ৬ তলাতেই ১২ থেকে ১৪টি বড় গুদাম রয়েছে। এখানেই আগুন লাগে। আর এই মনসুর খান প্লাজার আশপাশে আরও তিন থেকে চারটি মার্কেট রয়েছে। আগুন নেভানোর কাজে তাদেরকে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে মনসুর খান প্লাজার আগুনই প্রথম ঘটনা নয়। ২০১০ সালের নিমতলী, ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা, ২০২১ সালের আরমানিটোলাসহ একের পর এক বড় বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এই পুরান ঢাকায়। ২০১০ সালের ৩রা জুন রাতে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। রাসায়নিকের গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। নিমতলীর ক্ষত শুকানোর আগেই ২০১৯ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আরেকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওয়াহেদ ম্যানশনে রাসায়নিকের মজুতকে কেন্দ্র করে লাগা আগুনে ৭১ জনের মৃত্যু হয়।
২০২১ সালের ২৩শে এপ্রিল ভোরে পুরান ঢাকার আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডেও চারজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর দগ্ধ হন আরও অনেকে। ওই ভবনেও ছিল রাসায়নিকের গুদাম। ২০২৩ সালের ৪ঠা এপ্রিলও বঙ্গবাজার ও সংলগ্ন মার্কেটগুলোর প্রায় ৩ হাজার ৮৪৫টি দোকান পুড়ে প্রায় ৩০৩ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরই গঠিত হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর ১৭ দফা সুপারিশ দেয়া হয়েছিল। চুড়িহাট্টার পরও আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেয়া, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারসহ তদন্ত কমিটি ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে একাধিক সুপারিশ আসে। ২০১৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে। অদৃশ্য কারণে সেই অভিযানও স্থগিত হয়ে যায়।
আনোয়ার হোসেন নামে চকবাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, নিমতলী ট্র্যাজেডির পর সরকার ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট কেমিক্যাল জোন বা জায়গা দেয়ার কথা বলেছিল। এরপর চুরিহাট্টার আগুনের সময়েও একই কথা বলা হয়। জায়গা পর্যন্ত নির্ধারণের কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে আজ পর্যন্ত সেটা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু গড়ে উঠেছে হাজার হাজার প্লাস্টিক, প্রসাধনী, জুতাসহ বিভিন্ন কারখানা।
এদিকে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবনের মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৫টি বা ৬২ দশমিক ৬২ শতাংশের অগ্নিনিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক ছিল। বিপরীতে ৩ হাজার ৩১৬টি বা ৩১ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টি বা ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভবনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪ সালে পরিদর্শন করা ভবনেরও ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ অগ্নিঝুঁকিতে ছিল। সবচেয়ে বেশি অগ্নিঝুঁকির চিত্র পাওয়া গেছে কেমিক্যাল গুদামে। পুরান ঢাকায় এই ঝুঁকি সবচেয়ে ভয়াবহ।
সেখানে প্রায় ২৫ হাজার রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে খোদ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হচ্ছে-এসব গুদামের প্রায় ১৫ হাজারের অবস্থান আবাসিক বাসাবাড়িতে। এসব গুদামে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কিটোন, থিনার ও আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের মতো রাসায়নিক মজুত রাখা হচ্ছে। এ ছাড়াও পুরান ঢাকার আরমানিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় রাসায়নিক ও প্লাস্টিকের কাঁচামালে ঠাসা দোকান এবং গুদাম রয়েছে। এসব দোকান ও গুদামের ওপর দিয়ে ঝুলে থাকা এলোমেলো বৈদ্যুতিক তার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে আরও কয়েকগুণ।
এলাকাটির অগ্নিপ্রতিরোধে কাজ করা লালবাগ ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যেকোনো অগ্নিকাণ্ডে খবর পাওয়ার পর দ্রুত পৌঁছানোটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগুন লাগার পর প্রথম কয়েক মিনিটে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া গেলে অনেক ক্ষেত্রে আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব হয়। কিন্তু পুরান ঢাকায় এটা ঠিক বিপরীত। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাস্তার দুই পাশে দোকান, পণ্যবাহী যান, অবৈধ পার্কিং এবং মানুষের ভিড় থাকলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দ্রুত পৌঁছাতে পারে না। আগুনের বিস্তার বাড়লে তখন আরও গাড়ি, পানির সরবরাহ ও উদ্ধারকর্মী প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রবেশপথ সংকীর্ণ থাকায় একের পর এক ইউনিট কাজে লাগানো কঠিন করে তোলে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের প্রধান (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, ভবন পরিদর্শনের সময় মালিকপক্ষকে ত্রুটি ও ঝুঁকির কারণ জানিয়ে তা সংশোধনের পরামর্শ দেয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শকরা নোটিশ দেন। অনেক ক্ষেত্রে তাতেও কাজ হয় না। তখন সিটি করপোরেশন কিংবা জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। তিনি বলেন, গত ১২ই অক্টোবর চকবাজারের এলাকায় আগুন লাগা মঞ্জুর খান প্লাজা মার্কেটটিতেও জানুয়ারিতে ইন্সপেকশন বিভাগের একজন ইন্সপেক্টর পরিদর্শনের পর সেখানে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দেখতে পান। এরপর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারসহ যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ভবন মালিককে নোটিশ দেয়া হয়। সেই নোটিশের কোনো জবাব না আসায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বিস্তারিত সুপারিশ করা হয়েছিল। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম সরানো সম্ভব হতো। সিটি করপোরেশন, রাজউক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন খুব কঠিন।
