ছো টবেলা থেকে জেনে এসেছি দেশ কাকে বলে কিংবা রাষ্ট্র কি জিনিস। অথবা সরকার কাকে বলে। দেশ বলতে একটি ভূখণ্ড। একটি জন্মভূমি। একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ জাতিসত্তার বাসস্থান। এরকম বাসস্থান তো একই জনগোষ্ঠীর একাধিক দেশ হতে পারে। কারও ভূমি হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ, কারও ভূমি হতে পারে বাংলাদেশ। কেউ বাস করতে পারে রাশিয়ার বিরাট ভূখণ্ডে। দেশ নিয়ে আমাদের যে আবেগ সেটা একান্তই জন্মভূমির আবেগ। যে স্থানে আমরা জন্মগ্রহণ করি সেটাকেই আমরা জন্মভূমি বলি, সেটাকেই আমরা বলি দেশ। আর রাষ্ট্র হচ্ছে এই দেশকেই আইনগতভাবে গড়ে তোলা। একই ভাষা, একই ধর্মভিত্তিক অনেকগুলো দেশ হতে পারে। আর যে আইনের মধ্যদিয়ে একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয় তাকে আমরা বলতে পারি সরকার। এই যে নানারকম চিন্তামূলক জিনিস ছড়িয়ে থাকে, আমরা অনেক সময় দেশ বলতে যা বুঝায় রাষ্ট্র বলতে তাই বুঝিয়ে দেই। রাষ্ট্র বলতে যা বুঝায় সরকার বলতেও তা-ই বুঝিয়ে দেই। কিন্তু আমরা যদি আরেকটু সতর্ক হতে পারি, আরেকটু নির্দিষ্ট হতে পারি তবে হয়তো এইসব কনফিউশন দূর হতে পারে। আমেরিকা অনেকগুলো জাতি কাঠামো নিয়ে একটি রাষ্ট্র। ইংল্যান্ডও একই রকম। ভারতবর্ষও অনেকগুলো জাতিসত্তা নিয়ে গঠিত।
এর বাইরে আমরাই-বাংলা ভাষাভাষিরাই আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে বোঝানো যাবে বাঙালি মুসলমানরাই আলাদা একটি ভূখণ্ড গড়ে তুলেছি তার নাম বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের- আবেগ অনেক বেশি, ভালোবাসা অনেক বেশি।
দেশ একটি আবেগের পরিচয় বহন করে। দেশের নানা প্রকৃতি দেখা যায়। যেমন নদী নালা পাহাড় পর্বত। সেই পরিচয়ের মধ্যে পশু-পাখি, প্রাণী, নদ-নদী সবকিছুরই আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে। চুলের রং, শারীরিক গড়ন সবই আলাদা। খাদ্যাভ্যাস, যানবাহন সবকিছুরই নিজস্বতা থাকে। তখন দেশ আবেগময় কিংবা নিজস্ব হয়ে ওঠে। সেই দেশ শুধু আমারই দেশ। সেই দেশে আমার জন্ম, আমার মৃত্যু। আলো হাওয়ায় বেড়ে উঠি, দেশের প্রতি আমাদের নিজস্ব আবেগে আমরা বেঁচে উঠি। একসময় পৃথিবীতে বড় বড় দেশ ছিল এবং ছোট ছোট রাষ্ট্র কাঠামো ছিল। এথেন্স গ্রীক রাষ্ট্রের অনুগত একটি দেশ। গ্রীসের ছোট ছোট অসংখ্য রাষ্ট্র ছিল একদা। আলেকজান্ডার ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা। সক্রেটিস ছিলেন এথেন্সের দার্শনিক। পেরিক্লিস ছিলেন এথেন্সের নৃপতি। এথেন্স তখন পৃথিবীর উন্নততর রাষ্ট্র। মানুষের মূল্যবোধ, ন্যায়বোধ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি-সব মিলিয়ে এথেন্স এগিয়ে চলেছে দুর্দান্ত গতিতে। সেই সময়ের বিখ্যাত শাসক ছিলেন এই পেরিক্লিস। তিনি বিখ্যাত বক্তা ছিলেন। তিনি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘হে এথেন্সের তরুণেরা আজ যে এথেন্সে তোমরা বড় হচ্ছো সেটি সুন্দর সুশাসন আর সমৃদ্ধশালী এথেন্স। তোমরাই এই এথেন্সকে সৌন্দর্যে, বিত্তে এমন এথেন্স রেখে যাও যেন তোমাদের কালকে পরবর্তী প্রজন্ম ধারণ করে।’ পেরিক্লিসের এই বক্তব্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে খাঁটি দেশপ্রেম। বাংলাদেশের মানুষের এখন সময় এসেছে দেশকে ভালোবাসার। জাতি হিসেবে বড় হওয়ার। বড় স্বপ্ন দেখার। সময় এসেছে ভালো কাজ করার।
এই সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের বাংলাদেশ। চির মনোহর, চির রূপসী এই দেশ আমার জননী স্বরূপ। এই দেশ আমার মাতৃভূমি। ঋতু বৈচিত্র্যের বাংলাদেশকে আমরা ভালোবাসি মায়ের মতো। নদী আমার মা। দেশ আমার মা। স্বদেশপ্রেম নিয়ে কবিরা লিখেছেন কবিতা। গায়কেরা বেঁধেছেন গান। পুঁথিকার রচনা করেছেন পুঁথি। দেশপ্রেম নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র। তৈরি হয়েছে কতো নাটক। প্রতিটি মানুষের ভেতরে থাকে প্রেম। দেশপ্রেম মানুষের সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। দেশ নিয়ে মানুষ স্বপ্ন দেখে। এই স্বপ্ন থেকেই তো বৃটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি দেশ পাওয়ার। স্বাধীনভাবে কথা বলার। অধিকার আদায়ের জন্যই আমরা যুদ্ধ করেছি। জীবন উৎসর্গ করেছি। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ পাবার আকাঙ্ক্ষা থেকেই দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ জেগে উঠেছিল। তাদের ভেতরে ছিল দেশপ্রেম। ছিল ভালোবাসা। জননী, দেশ মাতার প্রতি অন্তরের টান। এটা নাড়ির টান। মায়ের প্রতি সন্তানের টান। মাকে যেমন সন্তান আগলে রাখে তেমনি করেই আমরা দেশকে আগলে রাখি। বুকের মধ্যে পরম যত্ন করে রাখি। এখনো কতো দেশের মানুষ সংগ্রাম করছে একটি স্বাধীন দেশ পাবার জন্য! এসবই হচ্ছে দেশপ্রেম থেকে।
‘টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য বগুড়া গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানটি যেহেতু বগুড়ায় তাই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন তারা চেষ্টা করছিলেন বগুড়ায় জন্ম নেয়া কিংবা বেড়ে ওঠা শিল্পীদের খুঁজে বের করতে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন?
তারা আমাকে জানালেন, যেহেতু বগুড়ায় অনুষ্ঠান সেজন্য স্থানীয় শিল্পী যারা আছেন তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারলে অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য বাড়বে। জেলার লোকরা আনন্দিত হবে।
ব্যাপারটা আমি আন্তর্জাতিক অনেক অনুষ্ঠানেও লক্ষ্য করেছি। আন্তর্জাতিক কোনো চলচ্চিত্র উৎসব যদি প্যারিসে হয় তাহলে সেখানকার জনপ্রিয় কিংবা পরিচিত শিল্পীকে রাখা হয়। যদি জার্মানিতে হয় তাহলে সেখানকার কোনো শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। যখন দর্শকরা দেখেন তাদের স্থানীয় কোনো শিল্পী অনুষ্ঠানে আছেন কিংবা সেই এলাকার বিখ্যাত স্থান সম্পর্কে বর্ণনা করা হয় তখন সেখানকার লোকজন খুশি হয়। আনন্দিত হয়, উৎসাহিত হয়, মনে করে তার পাশের বাড়ির শিল্পী বুঝি পারফর্ম করছেন। মঞ্চে উঠে যখন সেই পারফর্মার বলেন যে- এটাই আমার দেশ বা জেলা তখন দর্শকরা উল্লসিত হন, গর্ব অনুভব করেন। এটা নেহাৎই কথা প্রসঙ্গে বলা হয়। আসলে তিনি যেখানে বেড়ে উঠেছেন, যেখানকার ধুলো-মাটি গায়ে মেখে বড় হয়েছেন অথবা এখানে তার পৈতৃক ভিটা সেই সুবাদে কথাটা বলা হয়। এটা হয় আঞ্চলিকতা থেকে। যেমন কেউ বগুড়া, কেউ রাজশাহী, কেউ দিনাজপুর জেলার অধিবাসী কিন্তু দেশ তার বাংলাদেশ। প্যারিসের কথা বললেও দেশ তো ফ্রান্স। কিন্তু আমরা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাই- মনে করি এই অঞ্চলই আমাদের দেশ। এটা নাড়ির টান, জন্মভূমির টান, মাতৃভূমির টান। যত কথাই আমরা বলি না কেন, যে মাটিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই মাটিটা আমার, এটাই আমার দেশ। বহুকাল ধরে আমরা জেনে এসেছি দেশ কাকে বলে কিংবা রাষ্ট্র কাকে বলে। কিংবা আমরা যে অঞ্চলে বসবাস করি সেটা জেলা-উপজেলা, মহকুমা তার ঐতিহ্য। এখানে অতীতকে আমরা সম্মান করবো। অতীতকে আমরা মনে করবো। অতীতের যেটা ভালো সেটা আমরা গ্রহণ করবো। একই সঙ্গে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব সময়ের জন্য একটা কথা মনে রাখবো ‘অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তরে যেন তৃণ সমদহে’। এই কথাটা মনে রাখা প্রয়োজন আমরা যারা এই প্রজন্ম-তাদের সবাইকে হাতে হাত ধরে এগিয়ে যেতে হবে সত্যের দিকে আলোর দিকে।
আজকের বাংলাদেশে তরুণ সমাজের প্রতি এথেনিয়ন নৃপতি পেরিক্লিসের কথা ধার করে বলতে চাই-‘হে বাংলাদেশি তরুণেরা এমন কাজ করো রূপে গুণে সম্পদে সমৃদ্ধিতে, আইনের শাসনে, বাংলাদেশ যেন হয় পৃথিবীর সেরা দেশ’।
