ইয়েমেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সৌদি আরবকে চাপে ফেলার বড় কৌশলে পরিণত হয়েছে হুতিদের হামলা। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং দেশটির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগ সম্মেলনগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) দুই দিক থেকে চাপে ফেলতে চাইছে হুতিরা।
একদিকে ইয়েমেন নিয়ে নিজেদের দাবি মেনে নিতে রিয়াদকে বাধ্য করা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তোলা মার্কিন অবরোধ শিথিল করতে রাজি করানো। সৌদি, ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও হুতিদের হিসাব হলো, সৌদি আরবের সমৃদ্ধি, বিপুল বিনিয়োগের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অস্থিতিশীলতার প্রতি সংবেদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটিকে দুর্বল জায়গায় আঘাত করা সম্ভব। পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালি থেকে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত সংঘাতের মধ্যে সৌদিকে চাপের মুখে রাখাই এই কৌশলের লক্ষ্য।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে রয়েছে ইরান। কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের মাইকেল নাইটস বলেন, আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করে ওয়াশিংটনের কৌশলের মূল্য বাড়িয়ে দিতে চাইছে তেহরান।
তার ভাষায়, ‘ইরান এখন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে রয়েছে।’ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে না পেরে তেহরান ও হুতিরা সৌদির ওপর আঘাত হানছে।
তিনি বলেন, ‘তারা সৌদিকে আঘাত করছে, দুর্বল জায়গাটিতে আঘাত করছে।’ তার মতে, সৌদির অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
ইরানের অবরোধ তুলে নেয়ার দাবি
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শিথিল করার বিষয়ে হুতিদেরও সরাসরি স্বার্থ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান তাদের প্রধান সমর্থক। তেহরানের ওপর চাপ কমলে হুতিদের রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার সক্ষমতা বাড়তে পারে। অস্ত্র ও অর্থের যে প্রবাহের ওপর হুতিদের নির্ভরতা রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী তার গুরুত্বপূর্ণ উৎস ইরান।
তবে হুতিদের নিজস্ব দাবিও রয়েছে। দুই সৌদি ও তিন আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, হুতিরা ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযান এবং বন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার চায়। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে নিয়মিত বিমান চলাচল চালু, সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ পুনরায় শুরু, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি রিয়াদের সমর্থন বন্ধের দাবিও রয়েছে তাদের। এসব দাবি পূরণ হলে ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হুতিদের শাসন আরও সুসংহত হবে।
ইরানি জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হামলা চালিয়ে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নতুন করে সাজানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে কাজ করছে তেহরান ও তার মিত্ররা।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না রিয়াদ; বরং আলোচনার পথ বেছে নিতে হবে। সৌদি বিধিনিষেধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হুতিদের হামলা চলবে।
তবে এই কৌশল সৌদি যুবরাজকে কঠিন এক সংকটে ফেলেছে বলে মনে করছেন সৌদি অবস্থান সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো। সংঘাত বাড়লে মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার হুতিদের দাবি মেনে নিলে সৌদি শক্তিকে বছরের পর বছর ধরে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসা একটি গোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির ঝুঁকিও তত বাড়বে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সৌদি সরকারের মিডিয়া দপ্তর, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হুতিদের একজন মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।
বড় বিনিয়োগ সম্মেলনেও প্রভাব
গত এক সপ্তাহে সৌদিতে হুতিদের হামলার পরিধি বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা এবং বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলা। আরামকোর স্থাপনায় হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনটির কয়েকটি তলায়।
এসব হামলার প্রভাব পড়েছে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আয়োজনেও। রিয়াদের প্রধান তেল সম্মেলন ব্যাহত হয়েছে, সেখান থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন শীর্ষস্থানীয় তেল নির্বাহীরা।
বার্ষিক বৈশ্বিক বিনিয়োগ সম্মেলন ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (এফআইআই) অংশগ্রহণকারীদের দূর থেকে যুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছেন আয়োজকরা।
সৌদির গভীরে হামলা চালানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে হুতিদের। ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর স্থাপনাগুলোতে হামলার কারণে সাময়িকভাবে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যাহত হয়েছিল। এর আগে ২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। এরপর তাদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে রিয়াদ। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থার পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
তবে রিয়াদভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগেরের মতে, সৌদি নেতারা এখন সামরিক চাপ প্রয়োগকেই একমাত্র কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আর আলোচনার সুযোগ নেই।’
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, হুতিরা এখন নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান থেকে দরকষাকষি করছে বলে মনে করে। সানায় নিজেদের কর্তৃত্বের স্বীকৃতি এবং ইয়েমেনের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার দাবি জানাচ্ছে তারা। তার ভাষায়, ‘হুতিরা এখন বিজয়ীর মতো শান্তিচুক্তি চাইছে।’
সৌদি অবস্থান সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর মতে, গত বছর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছিল। পরে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালাতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ কম।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অনীহার কারণে রিয়াদ এমন এক সংঘাতের মুখে পড়েছে, যেখানে শুধু সামরিক চাপ দিয়ে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করা কঠিন হতে পারে।
সৌদি আরবের হারানোর ঝুঁকি বেশি
রয়টার্সকে গত মাসে সূত্রগুলো জানিয়েছিল, হুতিদের অভিযান শুরুর পর মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের কাছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প সরাসরি মার্কিন হামলায় সম্মতি দেননি। এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের প্রস্তাব দেয়। পরে ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেয়ার কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত বিষয়টি পিছিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত দেন।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আগের বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ওই বক্তব্যগুলোতে সৌদি আরবে হুতিদের হামলার নিন্দা জানানো হয়েছিল। হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে আসায় বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সংঘাতটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
হুতিদের ধারণা, সময় ও ভৌগোলিক অবস্থান তাদের পক্ষে কাজ করছে। সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছে অবস্থানের পাশাপাশি হুতিদের বড় সুবিধা হলো, এই সংঘাতে তাদের হারানোর মতো সম্পদের পরিমাণ সৌদি আরবের তুলনায় অনেক কম।
তিনি বলেন, ‘সৌদির অবকাঠামোর মূল্য হুতিদের অবকাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি। সৌদিদের তুলনায় তাদের হারানোর ঝুঁকি অনেক কম।’
ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক ফারেয়া আল-মুসলিমির মতে, রিয়াদের বিরুদ্ধে হুতিদের অভিযান আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। তবে এর ফলে সমগ্র আরব উপদ্বীপজুড়ে আরও বিস্তৃত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তার মতে, এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৩ সালে সৌদি আরবের সমর্থনে তৈরি হওয়া শান্তির রূপরেখার ভেঙে পড়া। ওই পরিকল্পনায় হুতিদের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন এবং পুনর্গঠনের জন্য অর্থায়নের পথ তৈরি করার কথা ছিল। এর আওতায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ ও পুনর্গঠনে সহায়তা দেয়ার কথা ছিল রিয়াদের।
কিন্তু লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে হুতিদের ঘনিষ্ঠতাও বেড়েছে।
আল-মুসলিমি বলেন, ‘আমরা কল্পনা করা যায় এমন সবচেয়ে খারাপ পরিণতির দিকে এগোচ্ছি। ২০১৫ সালের চেয়েও ভয়াবহ যুদ্ধ হতে পারে। এবার রক্তপাত আরও বেশি হবে এবং সৌদি যুদ্ধে জড়াবে আগের চেয়ে কম মিত্র নিয়ে।’
তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্য ছাড়া হুতিদের বিরুদ্ধে সফল সামরিক অভিযান সম্ভব নয়। বিশেষ করে সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
তিনি বলেন, ‘হুতিরা শুধু সৌদি আরবের জন্য হুমকি নয়। তারা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর অঞ্চলের জন্য হুমকি। এটি শুধু সৌদির যুদ্ধ নয়, এটি উপসাগরীয় যুদ্ধ।’
