১১ বছরের মেয়ের বর ২০ বছরের যুবক, দুই বছরের শিশুরও বাগদান

আফগানিস্তানে ভয়াবহ চিত্র

১১ বছরের মেয়ের বর ২০ বছরের যুবক, দুই বছরের শিশুরও বাগদান

ফন্ট সাইজ:

‘আমি এখনো শিশু। এই বয়সে বিয়ে করা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে না।’ কথাগুলো আফগানিস্তানের ১৫ বছর বয়সী দারেল্লার। খরায় বাস্তুচ্যুত এই কিশোরী এখন ৩০ বছর বয়সী স্বামীর সংসারে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাবার বাড়িতে এসে নিজের বিয়ের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে এমনটি বলেছে সে।
আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাদঘিস প্রদেশে খরা ও ফসলহানির কারণে ঋণ শোধ, খাবার কেনা কিংবা চিকিৎসার খরচ জোগাতে মেয়েশিশুদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন বহু পরিবার। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটিতে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।

১১ বছরের খাতিরার বিয়েও ঠিক হয়েছে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে। পরিবারের ঋণ শোধ করতে তাকে বিয়ের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা হয়েছে।

খাতিরা বলে, ‘আমি এতে খুশি নই।’ তার মা নূর বিবি জানান, বাগদানের পর থেকে মেয়েটি দুশ্চিন্তা করে, কান্নাকাটি করে এবং বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। হবু স্বামী বাড়িতে এলে পালিয়ে যায় সে।
বাদঘিসের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী খরা ফসল নষ্ট করছে, শুকিয়ে যাচ্ছে চারণভূমি। জীবিকা হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছেন। কাজ না পেয়ে অনেকেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন।

তেমনি পাঁচ বছরের নাজিলার হবু স্বামীর বয়স ১৫ বছর। দুই বছরের ফাতেমাহকেও বিয়ের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছেন তার বাবা-মা। ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত আট বছরের ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে পরিবারটিকে। মেয়েটি বিয়ের পর ১৫ ঘণ্টার দূরত্বে চলে গেলে তাকে আর দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তার মা।

কোনো কোনো পরিবার বেঁচে থাকার জন্য আরও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এক বাবা খাবারের ব্যবস্থা করতে না পেরে নিজের ১০ বছর বয়সী ছেলের একটি কিডনি বিক্রি করেছেন।
খোশকিয়ান গ্রামের আবদুল আজিজ আট বছরে সাতবার গমের ফসল হারিয়েছেন। ঋণ শোধ করতে তিনি পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তার এক মেয়ে মাজরি মাত্র ১২ বা ১৩ বছর বয়সে স্বামীর বাড়িতে চলে যায়। এখন ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে দুই সন্তানের মা সে।

মেয়েদের বিয়ের অর্থ সাধারণত কিস্তিতে পরিশোধ করা হয়। পুরো অর্থ দেয়া হলে পাত্রপক্ষ মেয়েকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পরই তাদের সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হয়।
আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনালের আফগানিস্তানবিষয়ক কর্মকর্তা মার্ক ক্যালডার বলেন, অল্প বয়সে বিয়ে মেয়েদের প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে। অথচ সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের চিকিৎসা দেয়ার ক্লিনিকগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

১২ বছর বয়সী আয়েশার মা সারা চান, মেয়েকে যেন এখনই স্বামীর বাড়িতে যেতে না হয়। ঋণ শোধ করতে তার স্বামী মেয়েকে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বিয়ের অর্থ পেয়েও পরিবারের দারিদ্র্য কাটেনি। দুই মাসের বাড়িভাড়া বাকি, বাড়িওয়ালা ঘর ছেড়ে দিতে বলেছেন।

সারা মেয়ের সামনে বিয়ের কথা বলতে পারেন না। কারণ, এসব শুনলেই আয়েশা কেঁদে ফেলে। তাই আপাতত মেয়েকে পড়াশোনা করতে দেন তিনি—যত দিন সম্ভব তার শৈশবটুকু বাঁচিয়ে রাখার আশায়।