অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার, ফৌজদারি এখতিয়ারসহ, ‘দেওয়ানি’ লাভ করে, বাংলার কলিকাতা তখন একটি বহুজাতিক নগরী হিসেবে বিকশিত হয়েছে। আর এই ‘বহুজাতিক নগরী কলকাতায় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে’ তখন ‘হিন্দুস্তানি’ ভাষার ব্যাপক ব্যবহারও চালু হয়েছে। সে সময়, কলকাতাবাসী ‘শিক্ষিত-অশিক্ষিত, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বিপুল মানুষের ভাষা হওয়ায় ইউরোপীয় বণিকেরা হিন্দুস্তানি শিখতে চাইত।’২৬৪
ওদিকে, তখনো আদালতে ফারসি ও হিন্দুস্তানি চালু থাকার কারণে, বিচারকার্যচালাতে ইংরেজ কর্মচারীদের জন্য বাংলার পাশাপাশি ‘হিন্দুস্তানি’ ভাষা শিক্ষাও জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে, ইংরেজ কর্তৃক ১৮০০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা, ফারসি ও আরবির পাশাপাশি, হিন্দুস্তানি ভাষাচর্চাও গুরুত্ব লাভ করে। তাছাড়া, অষ্টাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিরাট অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনাধীন হয়ে পড়ায় ব্রিটিশদের কাছে হিন্দুস্তানি ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এই সময় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে গিলক্রিস্ট হিন্দুস্তানি ভাষা বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
হিন্দুস্তানি ভাষা নিয়ে গিলক্রিস্টের কেরামতি সম্পর্কে ভারতীয় ভাষাবিদ সঞ্জয় কুমার লিখেছেন যে, “গিলক্রিস্ট প্রথমে হিন্দুস্তানী ভাষার ভেতর তিনটি ধারার অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেন: প্রথমত, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত ভারতীয় নগরগুলোর আদালতে প্রচলিত ফারসি লিপিতে লিখিত ও ফারসি প্রভাবিত হিন্দুস্তানি ভাষা; দ্বিতীয়ত, ভারতের প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত ও ফারসির প্রভাবমুক্ত হিন্দি/হিন্দাভী ধরনের হিন্দুস্তানি ভাষা; তৃতীয়ত, প্রথম ও দ্বিতীয়ের মাঝামাঝি ধরনের হিন্দুস্তানি ভাষা যেটা প্রথমটির মত প্রবলভাবে ফারসি প্রভাবিত নয়, আবার দ্বিতীয়টির মত গ্রাম্যও নয়, বরং খানিকটা আরবি-ফারসি মিশ্রিত একটি মোলায়েম ভাষা।”২৬৫
কিন্তু এই গিলক্রিস্ট যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে হিন্দুস্তানি ভাষা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি অভিন্ন হিন্দুস্তানি ভাষার দুটি ধরনকে প্রবলভাবে দুটি আলাদা ভাষা হিসেবে প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন : একটি ফারসি লিপিতে লিখিত হিন্দুস্তানি — যা উর্দুরই নামান্তর হিসেবে আবির্ভূত হয়। অন্যটি, আরবি/ফারসি শব্দ বিবর্জিত ও দেবনাগরি লিপিতে লিখিত হিন্দুস্তানি — যা হিন্দি ভাষা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।২৬৬
এই কাজে গিলক্রিস্টকে সহযোগিতা করেন লাল্লোজি লাল নামের একজন বিহারি সংস্কৃত পণ্ডিত। গিলক্রিস্টের এই ভাষাসংক্রান্ত রাজনৈতিক কেরামতিই কালক্রমে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী ভাষানীতির ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
লক্ষ্য করার বিষয় হলো, ফারসি ও দেবনাগরি লিপিতে লিখিত দুই ধরনের হিন্দুস্তানি ভাষা ঔপনিবেশিক ভারতে একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ সৃষ্টি করে।সঞ্জয় কুমার যথার্থই যুক্তি প্রদান করেন যে, “দুইটি লিপি শুধু যথাক্রমে উর্দু ও হিন্দি ভাষার সঙ্গেই জড়িয়ে পড়ে না, দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কেও এই সমীকরণের ভেতর টেনে আনে। আর সেই নতুন সমীকরণটি হলো — একদিকে, ফারসি লিপি-উর্দু-মুসলমান, আর অন্যদিকে দেবনাগরি লিপি-হিন্দি-হিন্দু। এই সমীকরণটিই, শেষ পর্যন্ত, ফারসি-উর্দু-মুসলমান-পাকিস্তান ও দেবনাগরি-হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানে রূপান্তরিত হয়ে, ১৯৪৭ সালে, ভারতবর্ষকে ধর্মীয় সম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত করেছিল।
ভারতীয় রাজনীতিকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত করে নিজের শাসনকে দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে ফারসি লিপিতে লিখিত হিন্দুস্তানিকে, আবার কোনো কোনো অঞ্চলে দেবনাগরি লিপিতে লিখিত হিন্দুস্তানিকে ‘সরকারি ভাষা’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল, যা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধকে তাৎপর্যপূর্ণ পর্যায়ে উসকে দিয়েছিল।
ভারতীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ব্রিটিশ শাসকদের এই বিভেদমূলক ভাষানীতির প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিব্যক্তি ঘটে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর প্রভাবাধীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নাগপুর সম্মেলনে, ১৯২০ সালে, যখন গান্ধী দেবনাগরি লিপিতে লিখিত হিন্দিকে ভারতের ‘জাতীয় ভাষা’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে, কংগ্রেসের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে ইংরেজির বদলে হিন্দি ভাষায় পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। গান্ধী ও তাঁর কংগ্রেসের এই ভাষানীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের লখনৌ সম্মেলনে, ১৯৩৬ সালে, তৎকালীন ইউনাইটেড প্রভিন্সের লীগ ডেলিগেশন ‘মুসলিম ভারতের ভাষা হিসেবে ফারসি লিপিতে লিখিত উর্দুর স্বীকৃতি’ দাবি করে।
এসব ঘটনার অন্তর্বর্তী ও পরবর্তী বছরগুলোতে ভারতের ‘জাতীয় ভাষা’ কোনটি হবে — হিন্দি, না বাংলা, না-কি উর্দু — এ নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক হয়েছে; কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিভেদমূলক রাজনৈতিক ভাষানীতিকে পরিবর্তন করা যায়নি। ফলে, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত বিভাজনও রহিত করা সম্ভব হয়নি। বিভক্তির পর ভারতের কংগ্রেস সরকার হিন্দিকে আর পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকার উর্দুকে আপন আপন দেশের ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে গ্রহণ করে।
বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি, হিন্দি ও উর্দু ভাষা যেমন যথাক্রমে ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ভাষা হিসেবে ভারত বিভক্তিতেএকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, একই সময়ে সংস্কৃতি-প্রভাবিত বাংলা ভাষা ও আরবি/ফারসি প্রভাবিত বাংলা ভাষাও ভারতের অবিভক্ত বাংলা প্রদেশকে তেমনি প্রধানত হিন্দু ও মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে বিভক্ত করতে সাংস্কৃতিক প্রণোদনা জুগিয়েছে। সংস্কৃতায়িত বাংলাভাষার অনুরাগী হিন্দু-প্রধান ‘পশ্চিম বাংলা’ ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়, আর আরবি/ফারসি প্রভাবিত বাংলাভাষার অনুরাগী মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘পূর্ব বাংলা’ পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতালাভের পর পরই ভারত ও পাকিস্তানে ভাষাকেন্দ্রিক রাজনীতি নতুন অবয়বে হাজির হয়।
ভারতের স্বাধীনতার পর হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার পর থেকেই হিন্দির ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলা, তামিল, তেলেগু, মালয়ালাম প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধ ভাষা প্রতিরোধ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় — যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া, ভারতে দক্ষিণপন্থি হিন্দি-হিন্দুস্তান-হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রবল উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে, দেশটির অ-হিন্দি ভাষাভাষী অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভেতর আপন আপন ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি তাৎপর্যপূর্ণ গতিতে বিকশিত হয়ে চলেছে। এই ঐতিহাসিক ভাষাগত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া ভারতকে শেষ পর্যন্ত কোনদিকে অগ্রসর করবে, তা দেখার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
ওদিকে, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির জঠরে গড়ে ওঠা পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক উর্দুভাষী ক্ষুদ্র শাসক সম্প্রদায়টি, পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, প্রধানত যে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীরনির্ধারক অবদানের কারণে দেশটি তৈরি হয়েছিল, সেই জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর উপনিবেশবাদী কায়দায় আঘাত হানে। পাকিস্তানের স্বাধীনতার মাত্র সাত মাসের মধ্যে, ১৯৪৮ সালের মার্চে, দেশটির গভর্নরজেনারেল, ইংরেজি-শিক্ষিত ব্রিটিশ-প্রশিক্ষিত ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ঢাকায় এসে সদম্ভ ঘোষণা দেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। অন্য কোনো ভাষা নয়, কেবলই উর্দু।”২৬৭
অর্থাৎ জিন্নাহ তৎকালীন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ শতাংশ বাংলাভাষী মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, চার শতাংশেরও কম জনসংখ্যার উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বন করেন।
পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ শিক্ষার্থী সমাজ বাঙালি জনগোষ্ঠীর তরফে জিন্নাহর এই ভাষাগত ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈষম্যমূলকরাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিণতি উপলব্ধি করতে বিলম্ব করেনি, ফলে, তাৎক্ষণিকভাবেই তারা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং ‘উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও’ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবিতে শিক্ষার্থীগণ আন্দোলন গড়ে তোলে — যা শেষ পর্যন্ত, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, এক রক্তাক্ত সংগ্রামে পরিণত হয়। সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, শেষ পর্যন্ত, ১৯৫৪ সালের মে মাসে, পাকিস্তান উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও সাংবিধানিকভাবে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে স্বীকৃত হয়, কিন্তু একই সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছর পর্যন্ত এই স্বীকৃতি স্থগিত রেখে ইংরেজিকে রাষ্ট্রীয় ‘সকল’ কর্মকাণ্ডের ‘অফিসিয়াল’ ভাষা হিসেবে অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।২৬৮
স্পষ্টতই, এক হাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে, অন্যহাতে তা ফিরিয়ে নেয়া হয়।
বাঙালি ও বাংলা ভাষার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক অবাঙালি শাসকশ্রেণির এই প্রতারণামূলক দৃষ্টিভঙ্গির শেকড় আসলে তার পূর্বাহ্ণে অর্জিত ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরে প্রোথিত ছিল। ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে উপনিবেশিত ভারতীয় নানা জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্মাচার ও সভ্যতা সম্পর্কে ব্রিটিশ শাসকশ্রেণি যে বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করত, পাকিস্তানের পশ্চিম-ভিত্তিক অবাঙালি শাসকশ্রেণি পূর্বাঞ্চলের বাঙালি ও জনগোষ্ঠী সম্পর্কে প্রায় অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিরই চর্চা করেছে। পাকিস্তানের পূর্বাংশের বাঙালি ও বাংলা ভাষা সম্পর্কে পশ্চিমাংশের উর্দুভাষী অবাঙালি শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। পূর্বের এক পশ্চিমী গভর্নর ১৯৫০-এর দশকে একদা প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, “পূর্ব বাংলায় খাঁটি মুসলমান নেই, এরা খাতনা করায় না।
তথ্যসূত্র:
২৬৪. মোহাম্মদ আজম, বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা : ১৩১
২৬৫. Sanjay Kumar, “Faultlines of Hindi and Urdu”, Frontline, Chennai, India, Vol.-29 Number-15, July 28-August 10, 2012
২৬৬. প্রাগুক্ত
২৬৭. Mohammad Ali Jinnah “National Consolidution”, Jinnah’s speech delivered in Dhaka on March 21, 1948. পুরো বক্তৃতার জন্য দেখুন, Jinnah Speeches as Governor-General of Pakistan, 1947—1948, pp. 95-105
২৬৮. হাসান হাফিজুর রহমান, (সম্পা.) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৯৫
