আইএমএফের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নামলো ৩.২ শতাংশে

আইএমএফের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নামলো ৩.২ শতাংশে

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ তার পূর্বাভাসে বলেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আইএমএফ। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পর এই পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে তারা। এপ্রিলে জিডিপির হার ৪.৩ শতাংশ হবে বলে ধারণা দিয়েছিল আইএমএফ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা চলাকালে মঙ্গলবার প্রকাশিত সংস্থাটির ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে নতুন এই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সর্বশেষ হিসাবের চেয়েও কম।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে। গত এপ্রিলে সংস্থাটি ৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। অন্যদিকে, এডিবি গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক আর্থিক ও উন্নয়ন সংস্থার পূর্বাভাসই এখন নিম্নমুখী। প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এর আগের অর্থবছরে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি দেখা গিয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮.৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেই নিম্নমুখী প্রবণতা আর অব্যাহত না-ও থাকতে পারে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৬ শতাংশ। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩.৫ শতাংশ। অর্থাৎ সামান্য উন্নতি হলেও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চিত্রে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরে ভারত ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে ধারণা করছে আইএমএফ। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৪.৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধির হিসাবে এগিয়ে থাকবে ভারত। ভুটানের প্রবৃদ্ধি ৬.৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৬.৫ শতাংশ। মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ২.৫ শতাংশ। নেপাল ও শ্রীলঙ্কা উভয় দেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করছে আইএমএফ। নেপালে মূল্যস্ফীতি ৫.৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৫.৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছিল, বাংলাদেশ টানা চতুর্থ বছরের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মন্থরতা এবং সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক আগের পূর্বাভাসের তুলনায় অধিকাংশ দেশের প্রবৃদ্ধির হিসাব সংশোধন করেছে। তবে বাংলাদেশকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ধারাবাহিকভাবে কমানো হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.১ শতাংশে পৌঁছেছিল। এরপর থেকে প্রবৃদ্ধির গতি কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসে। বিশ্বব্যাংকের ধারণা, ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির এই দুর্বলতা অব্যাহত থাকতে পারে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার আশা করেছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সেই পুনরুদ্ধার এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। এ কারণে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণপ্রবাহের মন্থরতা এবং সরকারের কঠোর রাজস্ব সীমাবদ্ধতার প্রভাব আগের ধারণার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও দুর্বল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শিল্প খাতে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাত সংকুচিত হয়েছে, যা করোনা মহামারির পর প্রথম ঘটনা। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আস্থা কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সব মিলিয়ে নতুন বিনিয়োগে গতি আসছে না। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ৩৩ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে এই চিত্রকে। এদিকে রাজস্ব সংকট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের নানা সমস্যার কারণে সরকারি বিনিয়োগও ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে নেমে এসেছে। এতে স্বল্প মেয়াদে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, দুর্বল ব্যাংক খাত, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর মধ্য দিয়ে সেই চাপেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।