গভীর রাতে একজন মানুষের তীব্র বুক ব্যথা শুরু হলো। স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করতে থাকলেন পরিচিতজনদের। কোথায় অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাবে, কত টাকা লাগবে, কোন হাসপাতালে নেওয়া উচিত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চলে গেল মূল্যবান সময়। গ্রামের একটি বাড়িতে প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে একজন মা দুর্বল হয়ে পড়ছেন। মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষ অপেক্ষা করছেন সাহায্যের জন্য। পরিস্থিতি আলাদা হলেও তাঁদের প্রয়োজন একই—দ্রুত, দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য জরুরি চিকিৎসা।
একটি পরিবারের সবচেয়ে বিপন্ন মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স খোঁজা, ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি এবং উপযুক্ত হাসপাতাল নির্বাচনের পুরো দায়িত্ব স্বজনদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। সাহায্যের অনুরোধ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি দায়িত্বশীল ব্যবস্থা সক্রিয় হবে, রোগীর কাছে উপযুক্ত দল পৌঁছাবে এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় নেবে—এই নিশ্চয়তা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি সেবার সমন্বয়ে একটি কার্যকর জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন এখানেই। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, স্বতন্ত্র অ্যাম্বুলেন্স প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও অন্যান্য সেবাদাতাকে নির্ধারিত মানদণ্ডের আওতায় এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে হবে। মালিকানা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রোগীর অগ্রাধিকার, সেবার মান ও নিরাপত্তার নীতি হতে হবে অভিন্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩’-এর বাংলাদেশ প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বার্ষিক সংখ্যাটির দৈনিক গড় প্রায় ৮৭ জন। একই প্রোফাইলে রিপোর্ট করা মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪। প্রথমটি মডেল ভিত্তিক অনুমান, দ্বিতীয়টি রিপোর্ট করা হিসাব। এই পার্থক্য দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ আরও নির্ভরযোগ্য করার প্রয়োজন তুলে ধরে।
জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর প্রকাশনায় দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মৃত্যু সবই অ্যাম্বুলেন্স সেবার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য নয়। তবে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো সময়সংবেদনশীল অসুস্থতার ক্ষেত্রে হাসপাতালপূর্ব জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত বাংলাদেশের নির্বাচিত এলাকার দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থার মূল্যায়নেও প্রস্তুতির ঘাটতি উঠে এসেছে। এতে প্রায় ৭৫ শতাংশ অ্যাম্বুলেন্সকে অপর্যাপ্ত জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামযুক্ত অস্থায়ীভাবে রূপান্তরিত যান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মূল্যায়নে ৪১ শতাংশ গাড়ি কোনো কল সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত ছিল না বলেও উল্লেখ রয়েছে। এটি সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নের চিত্র, দেশের সব অ্যাম্বুলেন্সের বর্তমান জাতীয় হার নয়। তবু সেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা বুঝতে তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য হবে জরুরি কল থেকে হাসপাতালে নিরাপদ হস্তান্তর পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক সেবা নিশ্চিত করা। ফোন পাওয়ার পর রোগীর অবস্থার গুরুত্ব নির্ধারণ করা হবে, কাছাকাছি থাকা উপযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হবে এবং প্রয়োজনীয় হাসপাতালপূর্ব চিকিৎসা শুরু হবে। রোগীর গন্তব্য হবে এমন হাসপাতাল, যেখানে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
এই ব্যবস্থার শুরুতেই অ্যাম্বুলেন্সের মান নিয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সাধারণ মাইক্রোবাসে স্ট্রেচার, অক্সিজেন সিলিন্ডার ও সাইরেন বসিয়ে জরুরি চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় না। রোগীর পাশে চিকিৎসা কর্মীর কাজ করার জায়গা, নিরাপদ স্ট্রেচার, সরঞ্জামের যথাযথ অবস্থান এবং চলন্ত অবস্থায় রোগী ও কর্মীদের সুরক্ষা—প্রতিটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
সরকারের উচিত নির্দিষ্ট কার্যকর তারিখ ঘোষণা করে নির্দেশনা দেওয়া—এরপর নতুন করে আমদানি করা সব অ্যাম্বুলেন্স হতে হবে অনুমোদিত মানদণ্ড অনুযায়ী কারখানায় প্রস্তুত ও সনদপ্রাপ্ত পূর্ণাঙ্গ বিল্ট-ইন অ্যাম্বুলেন্স। মূল যানবাহন প্রস্তুতকারক অথবা স্বীকৃত বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স নির্মাতার তৈরি গাড়ির সম্পূর্ণ নির্মাণ ও নিরাপত্তার মান যাচাই করেই আমদানির অনুমোদন দিতে হবে।
শুধু ‘বিল্ট-ইন’ পরিচয় যথেষ্ট হবে না। স্ট্রেচার ও আসনের নিরাপদ সংযুক্তি, সিটবেল্ট, অক্সিজেন সিলিন্ডার আটকানোর ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, বায়ু চলাচল এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের উপযোগী অভ্যন্তর পরীক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের সড়ক ও জলবায়ুর উপযোগিতা, যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা এবং স্থানীয় রক্ষণাবেক্ষণ সেবাও ক্রয়ের শর্ত হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যমান অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। কোন গাড়ি জরুরি সেবা দিতে পারবে, কোনটি শুধু স্থিতিশীল রোগী পরিবহনে ব্যবহারযোগ্য এবং কোনটি প্রত্যাহার করা প্রয়োজন—তা পরীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিস্থাপনের সময় কোনো এলাকার মানুষ যেন সেবা বঞ্চিত না হন, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে।
মানসম্মত অ্যাম্বুলেন্স সহজলভ্য করতে অনুমোদিত বিল্ট-ইন অ্যাম্বুলেন্সের আমদানি শুল্কমুক্ত ঘোষণা করা উচিত। জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রেও যুক্তিসংগত কর-শুল্ক সুবিধা প্রয়োজন। তবে এই সুবিধার সঙ্গে জনসেবার সুস্পষ্ট শর্ত যুক্ত থাকতে হবে।
শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা প্রতিটি গাড়িকে জাতীয় নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অনুমোদিত কাজে ব্যবহার, নিয়মিত মানপরীক্ষা, নির্ধারিত সেবা মূল্য অনুসরণ এবং কার্যক্রমের রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার কিংবা সুবিধার অপব্যবহার হলে তা প্রত্যাহার ও আইনানুগ ব্যবস্থার বিধান থাকতে হবে। আমদানি ব্যয় কমার সুফল রোগীর সেবা মূল্যেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
যানবাহনের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় নেটওয়ার্কের প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহনের সময় অন্তত একজন স্বীকৃত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্যারামেডিকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা উচিত। প্রতিষ্ঠানের কর্মী তালিকায় নাম থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি শিফটে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যারামেডিক থাকতে হবে।
প্যারামেডিক রোগীর প্রাথমিক মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ করবেন, অনুমোদিত প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন এবং প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রোগীর অবস্থা ও দেওয়া সেবার বিবরণ সহ দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। চালকের দায়িত্ব থাকবে নিরাপদে গাড়ি চালানো। একই ব্যক্তির ওপর গাড়ি চালানো ও রোগীর সরাসরি পরিচর্যার দায়িত্ব চাপানো যাবে না।
জটিল রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত দক্ষ কর্মী, নার্স বা চিকিৎসক যুক্ত করতে হবে। উন্নত লাইফ সাপোর্ট, ভেন্টিলেটর নির্ভরশীল রোগী কিংবা বিশেষ নবজাতক পরিবহনের জন্য পৃথক জনবল ও সক্ষমতা প্রয়োজন। এ জন্য স্বীকৃত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা পরীক্ষা এবং কর্মীদের দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ করতে হবে।সব অ্যাম্বুলেন্স চালক ও সহকারীর জন্য প্রাথমিক জরুরি সহায়তা, বেসিক লাইফ সাপোর্ট এবং সিপিআর প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। রোগীকে নিরাপদে ওঠানো-নামানো, সংক্রমণ প্রতিরোধ, জরুরি অবস্থা শনাক্ত করা এবং চিকিৎসা কর্মীকে সহায়তার বিষয় প্রশিক্ষণে থাকতে হবে। চালকদের জন্য নিরাপদ জরুরি গাড়ি চালানো, সাইরেন ব্যবহারের নিয়ম ও ক্লান্তি ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
একবার সনদ নেওয়ার পর প্রশিক্ষণের দায়িত্ব শেষ হবে না। নির্ধারিত বিরতিতে হাতে-কলমে পুনঃপ্রশিক্ষণ, দক্ষতা মূল্যায়ন ও সনদ নবায়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই প্রশিক্ষণ চালক বা সহকারীকে প্যারামেডিকের বিকল্প করবে না; প্রত্যেকের কাজ ও দায়িত্ব স্পষ্ট থাকতে হবে।
মানসম্মত সেবা পেতে কর্মীদের ন্যায্য বেতন ও নিরাপদ কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। প্যারামেডিক, চালক ও সহকারীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব অনুযায়ী জাতীয়ভাবে নির্ধারিত ন্যূনতম বেতন স্কেল থাকা প্রয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং বেসরকারি খাতে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম বেতন ও সুবিধা নির্ধারণ করে এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
রাতের দায়িত্ব, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ঝুঁকি ও দুর্গম এলাকায় কাজের বিষয় বেতন কাঠামোয় বিবেচনা করতে হবে। লিখিত নিয়োগ পত্র, সময় মতো বেতন, বিশ্রাম, ছুটি, সুরক্ষা সামগ্রী ও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত ক্লান্ত কর্মী দিয়ে দিনরাত নিরাপদ জরুরি সেবা চালানো সম্ভব নয়।
কর্মীদের আয় যেন রোগী সংগ্রহ কিংবা নির্দিষ্ট হাসপাতালে পাঠানোর কমিশনের ওপর নির্ভর না করে। তাদের পেশাগত দায়িত্ব হবে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ সেবা দেওয়া।
অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ও সেবা মূল্যের জন্যও স্বচ্ছ জাতীয় কাঠামো প্রয়োজন। সাধারণ রোগী পরিবহন, বেসিক লাইফ সাপোর্ট এবং উন্নত জরুরি পরিবহনের ফি পৃথকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। দূরত্ব, সময়, জনবল, চিকিৎসা সক্ষমতা, অপেক্ষার সময় ও প্রযোজ্য টোল বিবেচনায় রাখতে হবে।
কোন সুবিধা মূল ফির মধ্যে থাকবে এবং কোন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমোদিত ব্যয় প্রযোজ্য হবে, তা আগে থেকেই জানাতে হবে। গাড়ি, বুকিং ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অনুমোদিত মূল্যতালিকা সহজে পাওয়া যেতে হবে। প্রতিটি সেবার বিস্তারিত রসিদ দিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইচ্ছামতো ভাড়া দাবি বা অঘোষিত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
জীবন সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে অগ্রিম টাকা সংগ্রহ যেন অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বিলম্ব না ঘটায়। দরিদ্র, অজ্ঞাত পরিচয় ও অসহায় রোগীর জন্য সরকারি অর্থায়নের সুরক্ষা থাকতে হবে। কোন সেবার ব্যয় সরকার বহন করবে এবং কোথায় রোগীর অংশগ্রহণ থাকবে, তা সহজ ভাষায় প্রকাশ করতে হবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে ন্যায্য চুক্তি ও সময় মতো অর্থ প্রদানের নিশ্চয়তাও প্রয়োজন। নির্দিষ্ট এলাকায় দিনরাত প্রস্তুত থাকার জন্য নির্ধারিত অর্থ এবং যাচাইকৃত সেবা দেওয়ার জন্য পৃথক মূল্য রাখা যেতে পারে। এতে কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কল কম এলেও গাড়ি ও কর্মী প্রস্তুত রাখা সম্ভব হবে।
সারা দেশের অনুমোদিত অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অভিন্ন জাতীয় রঙের বিন্যাস ও চিহ্ন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা উচিত। গাড়ির সেবার স্তর, স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর, সেবা দাতার পরিচয় এবং অভিযোগ জানানোর তথ্য স্পষ্টভাবে লেখা থাকবে। রাতে ও কম আলোয় দৃশ্যমানতার জন্য উপযুক্ত প্রতিফলক চিহ্ন প্রয়োজন।
কর্মীদের জন্যও অভিন্ন পোশাকবিধি থাকা উচিত। প্যারামেডিক, চালক ও সহকারীর দায়িত্ব যেন সহজে চেনা যায়, সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। পোশাকে নাম, পদ ও কর্মী নম্বর থাকবে; পরিচয়পত্র হবে যাচাইযোগ্য। তবে জাতীয় পরিচিতি ব্যবহারের অনুমতি পেতে গাড়ি, সরঞ্জাম ও জনবলকে মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্র হবে পেশাদার যোগাযোগ ও অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর ব্যবস্থা। ৯৯৯-এর সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের প্রশিক্ষিত মেডিকেল ডিসপ্যাচ যুক্ত করার প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। জাতীয় মানদণ্ডের অধীনে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকবে। সেখানে গাড়ির অবস্থান, সক্ষমতা ও প্রাপ্যতার তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ হবে।
কোনো গাড়ি সরকারি না বেসরকারি, তার চেয়ে রোগীর কাছে কত দ্রুত পৌঁছাতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারবে কি না—সেটিই হবে নির্বাচনের প্রধান বিবেচনা। সাধারণ ফোনকলের মাধ্যমেও সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট না থাকায় কেউ যেন বঞ্চিত না হন।
অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে হাসপাতালের প্রস্তুতিও নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় জরুরি অস্ত্রোপচার, রক্ত, স্ট্রোকের মূল্যায়ন ও চিকিৎসা, জরুরি করোনারি ইন্টারভেনশন কিংবা নবজাতকের বিশেষ সেবা পাওয়া যাবে—তার হালনাগাদ তথ্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষে থাকতে হবে। রোগীর আগমন বার্তা পেয়ে হাসপাতাল প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেবে।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি মানদণ্ড পূরণকারী বেসরকারি হাসপাতালও এই ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারে। তবে চিকিৎসার দায়িত্ব, ব্যয় ও রুগীর অর্থনৈতিক সুরক্ষার বিষয় চুক্তিতে স্পষ্ট থাকতে হবে। রোগী পাঠানোর বিনিময়ে কমিশন নিষিদ্ধ করতে হবে। গন্তব্য নির্ধারণে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ও হাসপাতালের কার্যকর সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
গ্রাম ও দুর্গম এলাকার জন্য প্রয়োজন পৃথক পরিকল্পনা। হাওর ও চরে নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে স্থলপথের গাড়ির সংযোগ স্থান, পাহাড়ে উপযোগী যান এবং দুর্যোগের সময় বিকল্প রুট নির্ধারণ করতে হবে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ ও অন্যান্য প্রথম সাড়াদানকারীকে অনুমোদিত প্রাথমিক সহায়তার প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, শিশু ও যোগাযোগে অসুবিধা আছে এমন মানুষের প্রয়োজনও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।
অর্থায়নে গাড়ি কেনার পাশাপাশি প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি, বেতন, অক্সিজেন, ওষুধ, যোগাযোগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মেরামত ও যন্ত্রের পরীক্ষার অর্থ থাকতে হবে। প্রতিটি শিফটের শুরুতে গাড়ি ও সরঞ্জামের প্রস্তুতি যাচাই করতে হবে। কোনো গাড়ি অচল হলে বিকল্প সেবা দিতে হবে।
বিদ্যমান উদ্যোগের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো যেতে পারে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণায় ৩৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন এবং পরীক্ষামূলক অ্যাম্বুলেন্স ও বাইক ভিত্তিক জরুরি সেবার কথা বলা হয়। এই অর্থ পুরো সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের জন্য, শুধু অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নয়। সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ফল মূল্যায়ন করে জাতীয় সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট পরিবহন, রাজস্ব, স্থানীয় প্রশাসন, জরুরি সেবা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। বেসরকারি সেবাদাতা, চিকিৎসক, প্যারামেডিক ও রোগীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ রাখতে হবে।
প্রথম ছয় মাসে জাতীয় জরিপ, মানদণ্ড, জনবলের চাহিদা, আমদানি ও শুল্ক সুবিধার কাঠামো, বেতন ও সেবা মূল্যের হিসাব এবং হাসপাতালের সক্ষমতার মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে মহানগর, মহাসড়ক, গ্রাম ও দুর্গম এলাকার নির্বাচিত স্থানে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালু করে ফল অনুযায়ী সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রতিটি ধাপের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, অর্থায়ন ও সময়সীমা নির্ধারিত থাকতে হবে।
এই উদ্যোগের সাফল্য বিচার করতে হবে রোগী কত দ্রুত ও কত নিরাপদে উপযুক্ত চিকিৎসা পেলেন, তার ভিত্তিতে। কল গ্রহণ, গাড়ি পাঠানো, রোগীর কাছে পৌঁছানো, হাসপাতালে আগমন ও হস্তান্তরের সময় সংরক্ষণ করতে হবে। শুধু গড় সময়ের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কত শতাংশ রোগী সেবা পেলেন এবং কোথায় বিলম্ব বেশি, তা প্রকাশ করতে হবে। অভিযোগ, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, রোগীর নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার ফল নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
একটি কার্যকর জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক চিকিৎসায় বিলম্ব কমাতে, প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ও অক্ষমতা হ্রাসের সুযোগ তৈরি করতে এবং পরিবারের ভোগান্তি কমাতে পারে। সরকারি-বেসরকারি সম্পদের ব্যবহার আরও কার্যকর হতে পারে। দুর্যোগ ও বড় দুর্ঘটনায় উদ্ধার, চিকিৎসা ও রুগী স্থানান্তরের সমন্বয়ও সহজ হবে।
এই উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং তার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। মানসম্মত বিল্ট-ইন অ্যাম্বুলেন্স, শুল্কমুক্ত আমদানি, প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক, চালক ও সহকারীর বাধ্যতামূলক জরুরি চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ, ন্যায্য বেতন, নির্ধারিত সেবা মূল্য এবং অভিন্ন পরিচিতি—সবগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।
একজন সংকটাপন্ন মানুষ সাহায্য চাইলে তার পরিবার জানবে কোথায় ফোন করতে হবে, কী সহায়তা আসবে এবং কে দায়িত্ব নেবে। কাছাকাছি থাকা উপযুক্ত সরকারি বা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাবে, পথে প্রয়োজনীয় সেবা দেবে এবং প্রস্তুত হাসপাতালে নিরাপদে হস্তান্তর করবে। মানুষের সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তে এই নির্ভরতার জায়গাটি তৈরি করাই হোক জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্কের অঙ্গীকার।
লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।
