বাংলাদেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানির খরচ কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্দরের অদক্ষতা ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার জটিলতা। চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, কাস্টমস ও ব্যাংকিং সেবার সমন্বয়হীনতা, খালি কনটেইনারের স্তূপ এবং সড়কনির্ভর পরিবহনব্যবস্থার কারণে বাড়ছে ব্যবসার খরচ। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, রপ্তানির সময়সীমা, পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর। এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তিকে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসাবে দেখছে সরকার।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ডিজিটাল সেবা চালুর মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানো হচ্ছে। তবে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নতুন টার্মিনাল কিংবা প্রযুক্তি চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বন্দরের সঙ্গে কাস্টমস, ব্যাংক, পরিবহন, ডিপো ও শিপিং এজেন্টদের কার্যক্রম সমন্বিত করতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে আসতেই টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে চুক্তিকে ‘দেশ বিক্রির চুক্তি’ বলা সস্তা ও অমূলক কথা। এটি টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তি। মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ চাইলে চুক্তি নবায়ন করবে, অন্যথায় এর অবসান ঘটাবে। তিনি বলেন, দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে হবে। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে না পারলে বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হবে। এ কারণেই সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে চায়। মন্ত্রী আরও জানান, সরকার নিশ্চিত হয়েছে যে টার্মিনাল পরিচালনার পরিবর্তনে বর্তমানে বন্দরে কর্মরত কারও কর্মচ্যুতি ঘটবে না। দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে কর্মীদের পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর ফলে আগে বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে যেসব কাজ করতে হতো, সেগুলো এখন একই ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে করা সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে বন্দর, কাস্টমস, ব্যাংক, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিভিন্ন কার্যক্রম একটি প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, আগে যে কাজে পাঁচ দিন লাগত, নতুন ব্যবস্থায় তা আধঘণ্টায় করা সম্ভব হবে। প্রি-অ্যারাইভাল প্রক্রিয়া, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন অনুমোদনের কাজও অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে সময় বাঁচবে, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমবে এবং কাজের জবাবদিহি বাড়বে। পর্যায়ক্রমে কাগজবিহীন কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যও রয়েছে কর্তৃপক্ষের। এর পাশাপাশি বন্দরের সেবা গ্রহণ সহজ করতে নতুন ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। আগে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার সেবাগ্রহীতাকে বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হতো। নতুন ভবনের মাধ্যমে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানো এবং সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি হ্রাসের আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম তার এক বিশ্লেষণে বলেছে, লজিস্টিকসের উচ্চ ব্যয় কমাতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের লজিস্টিকস ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। এই ব্যবধান উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করছে। আমদানি করা কাঁচামালের খরচ বাড়ার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও এর চাপ পড়ছে। তার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে একটি আমদানি কনটেইনার ইয়ার্ডে গড়ে ছয় থেকে আট দিন পড়ে থাকে। কলম্বো কিংবা হো চি মিন সিটিতে একই কাজ শেষ করছে দুই থেকে তিন দিনে। এই বাড়তি সময়ের কারণে কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছাতে দেরি হয়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং রপ্তানির নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়। সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করছে। আমদানি করা কাঁচামালের খরচ বাড়ার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও এর চাপ পড়ছে। তার মতে বন্দর, কাস্টমস, রেল, সড়ক, নৌপথ, ব্যাংক ও শিপিং খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে একটি শক্তিশালী জাতীয় লজিস্টিকস কাউন্সিল বা সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন।
বন্দর নিয়ে সিএসইআর’র বিশ্লেষণ
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর) এর “বন্দর ও অবকাঠামো জটিলতায় ব্যাহত বাণিজ্য: লজিস্টিকস ব্যয় কমাতে বাংলাদেশের করণীয়” শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটির চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে একটি আমদানি কনটেইনার গড়ে ছয় থেকে আট দিন ইয়ার্ডে পড়ে থাকে। কলম্বো কিংবা হো চি মিন সিটিতে একই কাজ শেষ হয় দুই থেকে তিন দিনে। পার্থক্যটা কয়েক দিনের মনে হতে পারে। কিন্তু একজন রপ্তানিকারকের কাছে এই কয়েক দিন মানে কাঁচামাল কারখানায় পৌঁছাতে দেরি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ক্রেতাকে দেওয়া সময়সীমা ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি এবং শেষ পর্যন্ত বাড়তি খরচে বিমানে পণ্য পাঠানো।
সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের অধিকাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য এই একটি প্রধান প্রবেশ ও বহির্গমন পথের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরটি প্রায় ৩২ লাখ টিইইউ কনটেইনার সামলেছে। কিন্তু চলতি বছরের জুনের শেষে প্রায় ৯ হাজার ৩৩০ টিইইউ কনটেইনার বন্দরের ইয়ার্ডে আটকে ছিল, যা ইয়ার্ডের প্রায় ২২ শতাংশ জায়গা দখল করে রেখেছিল। এর কিছু কনটেইনার প্রায় পাঁচ বছর ধরে আটকে আছে। কাস্টমস জটিলতা, মামলা কিংবা অন্যান্য আইনি কারণে এসব পণ্য ছেড়ে দেয়া যাচ্ছে না, আবার নিলামও হচ্ছে না। ফলে নতুন কনটেইনার রাখার জায়গায় বহু বছরের পুরোনো পণ্য জমে থাকছে।
এর প্রভাব পড়ে পুরো বন্দর ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর। একটি কনটেইনার ইয়ার্ডে যত বেশি সময় পড়ে থাকে, নতুন কনটেইনারের জন্য তত কম জায়গা সেখানে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রাক, ডিপো, জাহাজ এবং কাস্টমসের ওপর বাড়তি চাপ। ফলে একটি জায়গার অদক্ষতা ধীরে ধীরে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় সংক্রামক ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এ বছরের কাস্টমস কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির ঘটনাও আমাদের দুর্বলতার আরেকটি দিক সামনে এনেছে। ঐ সময় বন্দর কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। বিজিএমই-এর হিসাবে, তৈরি পোশাক খাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২২ কোটি ২০ লাখ ডলার। একটি জায়গায় সাময়িক অচলাবস্থা তৈরি হলেই যদি পুরো রপ্তানি শৃঙ্খল থেমে যায়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের বাণিজ্যিক অবকাঠামো এখনো প্রয়োজনীয় বিকল্প সক্ষমতা তৈরি করতে পারেনি। বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, বন্দরের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি, এমনটা বলা ঠিক হবে না। নতুন বার্থ চালু হওয়া এবং নৌবাহিনীর সহায়তায় বহির্নোঙরে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমেছে। সেপ্টেম্বর থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা শুল্কায়নের ব্যবস্থা চালু করেছে। অর্থাৎ জাহাজকে আগের মতো দিনের পর দিন সাগরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। কিন্তু সমস্যার একটি অংশ সমুদ্র থেকে এখন ডাঙায় চলে এসেছে। কারণ কাস্টমস ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকলেই পণ্য ২৪ ঘণ্টা বের হতে পারে না। শুল্ক পরিশোধের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা দরকার, ডেলিভারি অর্ডারের জন্য শিপিং এজেন্ট দরকার, কনটেইনার পরিবহনের জন্য ট্রাক দরকার। রাতে কিংবা ছুটির দিনে আরটিজিএস বন্ধ থাকলে বড় অঙ্কের শুল্ক পরিশোধে সমস্যা হয়। ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচে লেনদেনের সীমাবদ্ধতাও বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক পেমেন্টে বাধা তৈরি করে। সেপ্টেম্বরের ১৮ ও ১৯ তারিখের সপ্তাহান্তে বন্দর থেকে মাত্র ২ হাজার ৪২৩ টিইইউ কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছে, যেখানে কার্যদিবসে সাধারণত এই সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০। একটি প্রতিষ্ঠানকে সারাক্ষণ খোলা রাখলেই হবে না, পুরো ব্যবস্থাটাকেই একই রুটিনে চালাতে হবে। বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্যিক অবকাঠামোও একেবারে অনুপস্থিত নয়। রয়েছে এএসওয়াইসিইউডিএ ওয়ার্ল্ড, বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো, অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর কর্মসূচি এবং বন্দরের নিজস্ব টার্মিনাল পরিচালনা ব্যবস্থা। তারপরও কনটেইনার ছাড়তে দীর্ঘ সময় লাগে। কাস্টমসের নিজস্ব টাইম রিলিজ স্টাডিতে গড় সময় প্রায় ১১ দিন পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৩ সালের কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্সে ৪০৫টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান ছিল ৩৪৮তম।
আরেকটি সমস্যা ক্রমেই বড় হচ্ছে। সেটি হলো খালি কনটেইনার। বাংলাদেশ যত পণ্য আমদানি করে, সেই তুলনায় রপ্তানি করে কম। ফলে দেশে খালি কনটেইনার জমতে থাকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি ও রপ্তানি কনটেইনারের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৩২ টিইইউ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে রেকর্ড ৩ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৬ টিইইউ হয়েছে। এর প্রভাব ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোতেও পড়ছে। দেশের ২৪টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার মধ্যে প্রায় ৫৭ হাজার টিইইউ জায়গা খালি কনটেইনার দখল করে আছে। ফলে রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার রাখার জায়গা কমছে এবং জাহাজ ছাড়তেও দেরি হচ্ছে। এই সমস্যা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। শিপিং লাইন, ডিপো মালিক এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে বসে খালি কনটেইনার দ্রুত ফেরত পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
বন্দরের বাইরে বাংলাদেশের লজিস্টিকস ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট। দেশের পণ্য পরিবহনের ৮০ শতাংশের বেশি সড়কপথনির্ভর। রেলের অংশ প্রায় ৪ শতাংশ, যেখানে ভারতে তা প্রায় ২০ শতাংশ। অথচ নৌপথে পণ্য পরিবহনের খরচ সড়কপথের তুলনায় অনেক কম। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এই সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নৌপথকে বাণিজ্যিক সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আমরা এখনো যথেষ্ট ব্যবহার করতে পারিনি।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, বাংলাদেশের লজিস্টিকস ব্যয়ের ৩৫ থেকে ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত অদক্ষ পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ষাটের বেশি নিয়মগত প্রতিবন্ধকতাও চিহ্নিত হয়েছে। এসব বাধা দূর করতে সব সময় বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন শুধু নিয়মের সংস্কার, তথ্যের আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। সরকারের সাম্প্রতিক বড় উদ্যোগগুলো তাই বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত বছরের পর বছর আটকে থাকা কনটেইনারের আইনি জট খুলে দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং স্বচ্ছ নিলাম ব্যবস্থা কার্যকর করা। এতে বন্দরের বড় একটি অংশের ইয়ার্ড সক্ষমতা দ্রুত ফিরে আসতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ২৪ ঘণ্টা কাস্টমসের সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেও একই ছন্দে আনতে হবে। ছুটির দিনেও আরটিজিএস চালু রাখা এবং বাণিজ্যিক শুল্ক পরিশোধের ক্ষেত্রে পেমেন্ট ব্যবস্থার সীমা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা গেলে সপ্তাহান্তে পণ্য খালাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, কাস্টমসে এআইভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সব চালানকে একই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রাখলে দ্রুত ছাড়ের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। বিশ্বস্ত আমদানিকারকের কম ঝুঁকির চালান দ্রুত ছাড়তে হবে এবং উচ্চ ঝুঁকির চালানে বেশি নজর দিতে হবে। ঝুঁকিভিত্তিক শুল্কায়নই আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এরপর প্রয়োজন পরিবহন ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন চালু করা, বন্দর থেকে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো পর্যন্ত রেল সংযোগ বাড়ানো এবং নদীপথে ফিডার পরিবহন সম্প্রসারণ করা জরুরি। মংলা ও পায়রা বন্দরকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু বন্দর উন্নয়ন করলেই হবে না, সেখান থেকে শিল্পাঞ্চলে যাওয়ার সড়ক, রেল ও নৌ সংযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
একইভাবে লালদিয়া ও বে টার্মিনাল চালু হওয়ার আগেই এসব টার্মিনালের সঙ্গে জাতীয় সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের সংযোগ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে। নতুন টার্মিনাল তৈরি করে যদি ঢাকা ও প্রধান শিল্পাঞ্চলের পথে নতুন যানজট তৈরি হয়, তাহলে অবকাঠামো বাড়লেও লজিস্টিকস ব্যয় কমবে না।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, সবশেষে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বন্দর, কাস্টমস, রেল, সড়ক, নৌপথ, ব্যাংক এবং শিপিং খাতকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করার জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় লজিস্টিকস কাউন্সিল বা সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন। জাতীয় লজিস্টিকস নীতি থাকলেও বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে ছড়িয়ে থাকায় শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিতার জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেটি যেন আরেকটি সরকারি প্রকল্প হিসেবে ফাইলবন্দি না হয়, সে জন্য শুরু থেকেই স্থায়ী পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সমন্বয়ের কাঠামো তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর পরিচালনা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি পূরণে প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে। আধুনিক বন্দর পরিচালনা শুধু অবকাঠামো দিয়ে হয় না, দক্ষ মানুষ এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও প্রয়োজন। এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে এলডিসি উত্তরণের কারণে।
বাংলাদেশের সামনে এখন তাই প্রশ্ন হলো বিদ্যমান অবকাঠামো কত দ্রুত, কত স্বচ্ছভাবে এবং কত কম খরচে ব্যবহার করা যাবে। বড় প্রকল্পের পাশাপাশি আগামী কয়েক মাসেই যদি আটকে থাকা কনটেইনার সরানো, ২৪ ঘণ্টা সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে একই সময়সূচিতে আনা, খালি কনটেইনারের জট কমানো এবং রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানোর মতো সংস্কার করা যায়, তাহলে তুলনামূলক কম বিনিয়োগেই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। এখন আমাদের প্রয়োজন আরও একটি নতুন বন্দর নয়, বরং পুরো লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত বন্দর হিসেবে ভাবা। জাহাজ থেকে কনটেইনার নামার পর সেটি কারখানা বা বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে একই শৃঙ্খলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা এখন শুধু পণ্যের দামে হয় না, সময়ের ওপরও হয়। বাংলাদেশ যদি সেই সময়ের মূল্য বুঝতে না পারে, তাহলে নতুন অবকাঠামো তৈরি করেও পুরোনো অদক্ষতার বোঝা থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।
