যুদ্ধের নতুন ফাঁদে সৌদি আরব

সিএনএনের বিশ্লেষণ

যুদ্ধের নতুন ফাঁদে সৌদি আরব

ফন্ট সাইজ:

এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের মাটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার পর রিয়াদ কীভাবে এর জবাব দেবে, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা একের পর এক হামলা চালিয়ে সৌদিকে চাপে ফেলছে।
পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ, স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—সব মিলিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে রিয়াদ।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করতে গত সপ্তাহে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি। কিন্তু হুতি বিদ্রোহীরা এখন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। উল্টো সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করেছে তারা।

এরই ধারাবাহিকতায় সপ্তাহান্তে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের অনুসৃত কৌশল থেকে শিক্ষা নিয়ে হুতিরাও দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল পাল্টা আঘাতের হুমকি দিচ্ছে।
সৌদির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে তারা।

রিয়াদের বিরুদ্ধে হুতিদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে রিয়াদের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান ইয়েমেনের মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। তবে সাম্প্রতিক হামলাকে শুধু সৌদির সঙ্গে হুতিদের পুরোনো বিরোধের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং একে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের সম্প্রসারণ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

স্থলযুদ্ধে নামবে সৌদি বাহিনী?
হুতিদের সামরিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে গত ১১ বছর ধরে সামরিক অভিযান ও আলোচনার পথ অনুসরণ করেছে সৌদি আরব। কিন্তু তাতে হুতিদের শক্তি পুরোপুরি খর্ব করা যায়নি। বরং সীমান্তের ওপারে বড় বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে তারা। ঘনবসতিপূর্ণ তাইজের মতো আরও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে হুতিরা।
সৌদি রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করা লেখক ও বিশ্লেষক আলি শিহাবি সিএনএনকে বলেন, “এই হুমকির স্থায়ী সমাধান করতে হবে।” তার মতে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ময়দানে কতটা সফল হয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। সৌদি বিমানশক্তি দিয়ে তাদের ব্যাপক সহায়তা করছে।

এ পর্যন্ত হুতিবিরোধী ইয়েমেনি জোটকে আকাশপথে সহায়তা দেয়ার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমিত রেখেছে সৌদি আরব। নিজস্ব স্থলসেনার বড় ধরনের উপস্থিতি এড়িয়ে চলেছে দেশটি। কিন্তু রিয়াদের বিমানবন্দরে শনিবারের হামলার পরও এই সংযম বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইয়েমেনে বিপুলসংখ্যক সৌদি সেনা পাঠালে দুর্গম ভূখণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে দেশটি। এতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি সৌদি আরবকে স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়িয়েছে হুতিরা
প্রায় দুই দশক আগেও হুতিরা ছিল মূলত একটি ছোট ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন। কিন্তু ইরানের সহায়তায় তারা এখন শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। তাদের হাতে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা দিয়ে ইসরাইলের তেল আবিব পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে তারা।

বছরের পর বছর হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, বিদ্রোহীরা তাদের যুদ্ধকৌশল উন্নত করেছে। হামলার ধরন আরও আধুনিক হয়েছে, তারা ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালাচ্ছে এবং গোয়েন্দা সক্ষমতাও বাড়িয়েছে।
ইয়েমেনের সরকার অভিযোগ করেছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে হুতিরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা ও কার্যকারিতায় পরিবর্তন এনেছে।

ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আগের তুলনায় দ্রুতগতিতে উড়ে যায় এবং তাপ শনাক্তকারী ব্যবস্থা ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধাবিত হয়। তবে শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সৌদি আরবের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা আরও বাড়াবে, নাকি সরাসরি স্থলযুদ্ধে জড়াবে? আবার বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ না নিলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে, সেটিও রিয়াদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

একদিকে ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে সৌদি নেতৃত্বকে।