পাকিস্তানের খাইবার পখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। রোববার ফেডারেল মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি অনুমোদন দেয়ার পর এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই প্রদেশে সন্ত্রাস ও সহিংসতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাদেশিক সরকার সবক্ষেত্রে ব্যর্থ। এ জন্য সেখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হচ্ছে। ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দাবি করেছে প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত করে জানায়নি। এমন অবস্থায় পিটিআই আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
ওদিকে প্রেসিডেন্ট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের আওতায় এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সংবিধানের এই দুটি অনুচ্ছেদে জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং গভর্নর শাসন জারির বিধান রয়েছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর পেশোয়ারের বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতির কারণে সেখানে অবস্থানরত সংবাদদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না মিডিয়া হাউসগুলো। টেলিযোগাযোগ খাতের সূত্রগুলো জানিয়েছে, কয়েকটি শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ডাটা সেবার গতি কমিয়ে দেয়া হয়েছে অথবা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পুরো প্রদেশে মোবাইল ডাটা কিংবা ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি।
ইন্টারনেটের স্বাধীনতা ও সংযোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, জরুরি অবস্থা জারির সময় খাইবার পখতুনখাওয়ার কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা গেছে। এদিকে, বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে খাইবার পখতুনখাওয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। পেশোয়ারের বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করতে কনটেইনার বসানো হয়েছে। পাশাপাশি শহরজুড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ফেডারেল মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে রোববার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভার সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। এ সময় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রাদেশিক সরকারের ইচ্ছাকৃতভাবে অসহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীকে প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়, যাতে তিনি সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এর এক দিন আগে প্রেসিডেন্ট জারদারির সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ওই বৈঠকে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) নেতৃত্বাধীন সরকার এবং কেন্দ্রের বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন খাইবার পখতুনখাওয়া সরকারের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত এলো। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ দমনের কৌশল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। গত ৩রা অক্টোবর দুই পক্ষের আলোচনাও ভেঙে পড়ে। ওই বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নীতি নিয়ে মতবিরোধ।
পিটিআইয়ের অভিযোগ, খাইবার পখতুনখাওয়ার নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলটিকে বাইরে রাখা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পিটিআই সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছে এবং সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে, প্রদেশে সন্ত্রাসবাদ দমনে খাইবার পখতুনখাওয়া সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করে আসছে কেন্দ্রীয় সরকার। আফগান তালেবানের সঙ্গে সংলাপের প্রশ্নেও প্রাদেশিক সরকারের অবস্থানের বিরোধিতা করছে ইসলামাবাদ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সোহেল আফ্রিদির পূর্বসূরি আলী আমিন গান্দাপুর প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে খাইবার পখতুনখাওয়া প্রাদেশিক পরিষদে একটি প্রস্তাব পাস হয়। তাতে নতুন কোনো সামরিক অভিযান শুরুর আগে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রাদেশিক সরকার ও বিধানসভার সঙ্গে পরামর্শ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে গৃহীত ওই প্রস্তাবে সতর্ক করে বলা হয়, প্রদেশের সম্মতি ছাড়া অভিযান চালানো হলে তা অভিযানের সাফল্য ব্যাহত করতে পারে এবং এর বিরূপ পরিণতির দায় কেন্দ্রীয় সরকারকে নিতে হবে। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রাদেশিক পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে খাইবার ও বান্নু জেলার কয়েকটি এলাকায় সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে।
এর প্রায় এক বছর পর সোহেল আফ্রিদি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রাদেশিক বিধানসভা একটি সর্বদলীয় বৃহৎ জিরগা আয়োজন করে। এতে গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি ও বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জিরগায় সর্বসম্মতিক্রমে কেন্দ্রীয় সরকারকে আফগানিস্তানের সঙ্গে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং আফগান নীতি নির্ধারণে খাইবার পখতুনখাওয়া সরকারকে সম্পৃক্ত করার দাবি জানানো হয়।
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদে কোনো প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট যদি সন্তুষ্ট হন যে যুদ্ধ, বহিঃশত্রুর আগ্রাসন কিংবা প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে পাকিস্তানের নিরাপত্তা অথবা দেশটির কোনো অংশের নিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে, তাহলে তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন। তবে প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণ দেখিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক বিধানসভার একটি প্রস্তাব প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট নিজ উদ্যোগে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে, ঘোষণাটি অনুমোদনের জন্য ১০ দিনের মধ্যে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে উপস্থাপন করতে হয়। বর্তমান ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট নিজ উদ্যোগে এই সিদ্ধান্ত নেননি। জরুরি অবস্থা চলাকালে পার্লামেন্ট এমন সব বিষয়ে প্রদেশের জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারবে, যেগুলো সংবিধানের ফেডারেল আইন প্রণয়ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়।
তবে এই অনুচ্ছেদ প্রাদেশিক পরিষদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পুরোপুরি কেড়ে নেয় না। কিন্তু প্রাদেশিক আইনের কোনো বিধান পার্লামেন্টের প্রণীত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে পার্লামেন্টের আইনই প্রাধান্য পাবে। ওই আইন কার্যকর থাকা পর্যন্ত সাংঘর্ষিক প্রাদেশিক বিধান অকার্যকর থাকবে। সংবিধানের ২৩৪ অনুচ্ছেদে কোনো প্রদেশে সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হলে গভর্নর শাসন জারির বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাদেশিক গভর্নরের সুপারিশ প্রয়োজন। সংবিধান অনুযায়ী, এ ধারায় জারি করা ঘোষণা পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে উপস্থাপন করতে হবে। দুই মাসের মধ্যে যৌথ অধিবেশনে প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন না পেলে ঘোষণাটির কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে। অনুমোদনের পর একইভাবে একবারে সর্বোচ্চ দুই মাস করে মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই গভর্নর শাসন ছয় মাসের বেশি বহাল রাখা যাবে না। সংবিধানের ২৩৩ অনুচ্ছেদে জরুরি অবস্থার সময় প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক অধিকার স্থগিত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট জারদারি স্বাক্ষরিত সারসংক্ষেপে এই অনুচ্ছেদের উল্লেখ ছিল না।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টা পর প্রদেশটির তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী শাফি জান দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে আটক করা হয়েছে। এর আগে পিটিআইয়ের লংমার্চে আফ্রিদির সঙ্গে ছিলেন শাফি জান। গভর্নর শাসন বা জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন আফ্রিদি। তবে আটকের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) শহিদ খাত্তাকও আফ্রিদিকে আটকের দাবি করেন। একই সঙ্গে পিটিআইয়ের এমএনএ জুনায়েদ আকবরসহ দলের আরও কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এরপর খাত্তাক জানান, এখন থেকে তিনিই লংমার্চের নেতৃত্ব দেবেন।
পরে এক বিবৃতিতে আফ্রিদি ও অন্য নেতাদের আটকের নিন্দা জানায় পিটিআই। দলটি একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ এবং প্রদেশের নির্বাচিত নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করে। পিটিআইয়ের মুখপাত্র শেখ ওয়াকাস আকরমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে বলা হয়, আফ্রিদিকে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্রীয় সরকারের জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারির সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।
জরুরি অবস্থা জারির পর প্রদেশ পরিচালনায় গভর্নরকে সহায়তা করার জন্য ১১ সদস্যের একটি টেকনোক্র্যাট উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। পরে গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি পরিষদের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। তিনি প্রদেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেন। এর আগে রোববার খাইবার পখতুনখাওয়ার নতুন মুখ্য সচিব হিসেবে ড. মুহাম্মদ ফখর আলম ইরফানকে নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অবিলম্বে এই নিয়োগ কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।
