নিয়োগ ঘিরে তৈরি হচ্ছে একের পর এক জটিলতা। কোথাও পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে বাতিল, কোথাও চূড়ান্ত সুপারিশের পরও মিলছে না নিয়োগপত্র। পুলিশি যাচাইয়ে বাদ পড়ছেন সুপারিশপ্রাপ্তরা। আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগ দিয়ে বিতর্ক ও আন্দোলনের মুখে পড়ছে সরকার। সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে পরীক্ষা স্থগিত, প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগপত্র না পেয়ে প্রার্থীদের আন্দোলন এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্তদের একাংশের প্রথম দফায় নিয়োগ না পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে। ভিসি নিয়োগ ঘিরেও বারবার আন্দোলন ও নিয়োগ পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।
গত শনিবার নিয়োগ পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে বাতিল করা হয় পরীক্ষা। সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে (২৪২টি পদ) নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ওঠে। এই পরীক্ষায় অংশ নিতে সারা দেশ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ প্রার্থী ঢাকায় আসেন। রাজধানীর ১০০টি কেন্দ্রে পরীক্ষার আয়োজন করা হলেও পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসায় তা স্থগিত করা হয়। হঠাৎ পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। কেউ কেউ প্রবেশপত্র পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানান।
এদিকে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও শত শত প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছিলেন। সরকারের তথ্যমতে ৮১৭ জন প্রার্থী চূড়ান্ত নিয়োগপত্র থেকে বাদ পড়েন। প্রার্থীদের কেউ কেউ নিরাপত্তা যাচাইয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদনের কারণে নিয়োগ আটকে যাওয়ার অভিযোগ করলেও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চান। এ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতারা সমালোচনা করেন। বঞ্চিতরা আন্দোলন করেন। এরপর ৮৩ জনকে বাদ দিয়ে নিয়োগপত্র দেয়া হয়। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল।
ওদিকে, ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয় পুলিশি যাচাইয়ে। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৬৬৫ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করলেও প্রথম দফায় ৩০শে সেপ্টেম্বর ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রার্থীরা। কেউ কেউ আন্দোলনে নামেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. জসিম উদ্দীনও প্রথম দফায় বাদ পড়ায় হতাশা প্রকাশ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহুতির ঘোষণা দেন।
১লা অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাকি প্রার্থীদের নিয়োগের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না। পরে ৫ই অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সবমিলিয়ে ৬৫১ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে সুপারিশপ্রাপ্ত সবাইকে একসঙ্গে নিয়োগ না দেয়া, যাচাই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবিও জোরালো হয়েছে।
এদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক ও অসন্তোষ থামছেই না। একের পর এক ভিসি নিয়োগ ঘিরে তৈরি হচ্ছে জটিলতা। কোথাও আন্দোলনের মুখে ভিসি পরিবর্তন, কোথাও নিয়োগ বাতিলের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ভিসি পরিবর্তনের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ২০ দিনে গড়িয়েছে। সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলনে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও যুক্ত হয়েছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে নতুন ভিসি’র নিয়োগ বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও ভিসি’র পদত্যাগ ও অপসারণের দাবিতে আন্দোলন হয়। নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিয়োগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভিসি’র নিয়োগ বাতিল করা হয়। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) ভিসি নিয়োগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। একপর্যায়ে নিয়োগের বিরোধিতা করে ‘রেড কার্ড’ প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ভিসি নিয়োগের আগে প্রার্থীদের যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও অতীত কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এসব বিষয়ে বিরোধী দলের গঠিত ছায়া শিক্ষামন্ত্রী ইলিয়াস মোল্লা বলেন, ’২৪ এর আন্দোলন ছিল কোটার বিরুদ্ধে, বৈষ্যমের বিরুদ্ধে। মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ হবে- এটাই ছিল কথা। কিন্তু সরকার কেন মেধা বাদ দিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে দলীয় লোক বসাচ্ছেন? আমরা মনে করি কাজটা ঠিক হচ্ছে না। প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাওয়ার বিষয়ে বলেন, আগের রাতেই বোঝা গিয়েছিল প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। তাহলে রাতেই ঘোষণা দেয়া উচিত ছিল। এটা ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে টোটাল ফেইলিয়র। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দৃষ্টন্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।
