বগুড়ার বাড়িতে ছুটি কাটিয়ে শাহেদ ফিরেছিলেন প্রবাসের কর্মস্থলে। আর কুমিল্লার নাসরুল্লাহ বদর যাচ্ছিলেন পবিত্র ওমরাহ পালনে। বিমানে বসেই গায়ে জড়িয়ে ছিলেন ইহরামের সাদা কাপড়। কিন্তু দুজনের কেউই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। তাদের যাত্রা থেমে যায় সৌদি আরবের বিমানবন্দরে। রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ এ হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই বাংলাদেশি। তারা হলেন- বগুড়ার মোহাম্মদ শাহেদ আহম্মেদ ও কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের মাওলানা নাসরুল্লাহ বদরপুরী। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাদের মৃত্যুতে পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
শেষ ফোনের পরই শাহেদের মৃত্যুর খবর
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, বগুড়া থেকে জানিয়েছেন, মোহাম্মদ শাহেদ আহম্মেদ জীবিকার তাগিদে চার বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। প্রায় এক মাস আগে দুই মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন শাহেদ। পরিবারের সঙ্গে আরও কিছুদিন থাকার ইচ্ছা থাকলেও কাজের তাগিদে শুক্রবার আবারো সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন তিনি।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের সন্তান শাহেদের বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা ছাহেরা বেগম। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর শনিবার বাংলাদেশ সময় বিকালে স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলীর সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় তার। কুশল বিনিময়ের পর ফোন রেখে দেন শাহেদ। কিছুক্ষণ পর থেকেই তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় পড়ে পুরো পরিবার।
গতকাল বিকালে সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রথম শাহেদের মৃত্যুর খবর পান পরিবারের সদস্যরা। এর আগে তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই শাহেদের বাড়িতে নেমে আসে শোকের মাতম। শাজাহানপুর উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা তার বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন।
স্বামীর মৃত্যুর খবর কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, শুক্রবার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও আমাদের কতো কথা হলো! শনিবার বিকালে ফোন করে বললো পৌঁছে গেছে, ভালো আছে। তারপর হঠাৎ ফোন বন্ধ হয়ে গেল। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কাজের ব্যস্ততায় ফোন ধরছে না। কিন্তু এভাবে শেষ হয়ে যাবে, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন আমার এ দু’টি ছোট ছেলেকে নিয়ে আমি কোথায় যাবো, কীভাবে চলবো?
শাহেদের চাচা লুৎফর রহমান বলেন, সাহেদ খুবই শান্ত ও পরিশ্রমী ছেলে ছিল। পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতেই বিদেশে গিয়েছিল। মাত্র একদিন আগে সে এখান থেকে বিদায় নিয়ে গেল। আমরা এই নির্মম সংবাদ কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না। সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, আমাদের সন্তানের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে আমরা তাকে শেষবারের মতো দেখতে পারি ও নিজ মাটিতে দাফন করতে পারি।
শাজাহানপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশিক ইকবাল জানান, সংবাদ পাওয়ার পরপরই তারা নিহত শাহেদের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং সার্বিক খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শাহেদের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করছি। শাহেদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তার বাবা রফিকুল ইসলাম প্রায় ৪০ বছর ধরে সৌদি আরবে থেকেছেন। তার মা ছাহেরা বেগমও দুই মাস আগে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে গেছেন। বর্তমানে দেশে রয়েছেন শাহেদের স্ত্রী কাকলী ও তাদের দুই শিশু সন্তান-১০ বছর বয়সী কাওসার এবং ৬ বছর বয়সী জিসান।
বাবার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছে দুই শিশু। তাদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ। সন্তানদের সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশী ও স্বজনরাও তাদের শান্ত করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে দুই সন্তানকে নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন কাকলী। যে ঘরে কয়েকদিন আগেও ছিল হাসি-আনন্দ, সেখানে এখন শুধুই কান্নার রোল।
ওমরাহ পালনে গিয়ে প্রাণ গেল নাসরুল্লাহ’র
এদিকে নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়ে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় নিহত হয়েছেন মাওলানা নাসরুল্লাহ বদরপুরী। তিনি ঢাকার কামরাঙ্গীরচর রবিউল উলুম মাদ্রাসার মুহাদ্দিস হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
নাসরুল্লাহ চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। তার বাবা হাফেজ মোহাম্মদ উল্লাহ ‘ইসলামিয়া আরাবিয়া ফয়জুল উলুম সিঙ্গরিয়া মাদ্রাসা’র সদরে মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার মায়ের নাম জাহানারা বেগম। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামে, যা ‘ওলামা বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত।
পরিবার সূত্র জানায়, নাসরুল্লাহ দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তার বড় সন্তানের বয়স সাত বছর এবং ছোট সন্তানের বয়স মাত্র দুই বছর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার দেয়া পোস্ট থেকে জানা যায়, শনিবার সকালে ঢাকা থেকে রিয়াদগামী বিমানে চেপে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। বিমানে বসেই ইহরাম পরিহিত ছবি শেয়ার করে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। রিয়াদ বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ফেসবুকে একটি পোস্টে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ জানিয়ে সফর নির্বিঘ্ন হওয়ার জন্য সবার কাছে দোয়া চান।
কিন্তু পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার পথে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে হামলায় প্রাণ হারান তিনি। তার আকস্মিক মৃত্যুতে গ্রামের বাড়ি, মাদ্রাসার সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে স্বজন ও এলাকাবাসী তার বাড়িতে ভিড় করছেন।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে পরিচয়: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় ও ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য জানানো হয়েছে। এতে শাহেদ আহম্মেদের পাসপোর্ট নম্বর ইএন-০২২০০২৪ এবং ইকামা নম্বর ২৫৫৬৪৭২২৩৭ উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, নাসরুল্লাহ বদরপুরীর পাসপোর্ট নম্বর এ-২২৭৫৮১৯৪ এবং বর্ডার নম্বর ৪১৯৪০৭২২৭০।
