যেসব পরিবারে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে, তাদের শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সকল শিশুর জন্য ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে শিশুবান্ধব বাংলাদেশ গড়তে শিশু অধিকার দিবস ও বিশ্ব শিশু সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ) এবং শাপলা নীড় আয়োজিত মানববন্ধন ও র্যালি পরবর্তী সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধন ও র্যালিরতে সরকারের প্রতিনিধি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) সহ জাতীয় ও খাতভিত্তিক শ্রমিক সংগঠন, মালিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
এ সময় বক্তারা জানান, বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত যা ২০১৯ সালের ৬.৮ শতাংশের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০.২ শতাংশ মৌলিক পড়ার দক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশ মৌলিক গণনাদক্ষতা অর্জন করেছে। এসব তথ্য শিশুদের শ্রম ও শোষণ থেকে সুরক্ষা, শিক্ষা, বিকাশ, নিরাপদ শৈশব এবং জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী শিশুর প্রতিটি অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকে তুলে ধরে। তাই শিশুর অধিকার, সুরক্ষা ও বিকাশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন ও উদ্যোগী করতে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বাংলাদেশে শিশু অধিকার দিবস ও শিশু অধিকার বিষয়ক সপ্তাহ পালন করা হয়।
মানববন্ধনে আইএলও-এর ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা মনিরা সুলতানা বলেন, “সকল শিশুর জন্য ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে, যেসব পরিবারে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে, তাদের শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সকলের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যেকে যদি অন্তত একজন শিশুকে শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করতে উদ্যোগী হই, তাহলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অসংখ্য শিশুকে শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।”
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, এর প্রতিনিধি ডা. বিশ্বজিৎ রায় বলেন, “শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের পুনর্বাসনে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। একই সঙ্গে, ২০২৬-৩০ মেয়াদের পাঁচ বছরব্যাপী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনপিএ) প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই কর্মপরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রমে নিয়োজিত ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের পুনর্বাসন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সকল ধরনের শিশুশ্রম নিরসন এবং শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তিনি সরকারের পাশাপাশি সকল অংশীজনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।”
মানববন্ধনে শাপলা নীড়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউমি ইয়াগিশিতা মাসুদা বলেন, “শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের স্বপ্ন এবং বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। যেসব শিশু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে হবে। তবে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; বরং শিশুদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে পরিবার, সমাজ ও সরকারকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”
জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশ এর সাধারন সম্পাদক নইমুল আহসান জুয়েল বলেন, “আইএলও কনভেনশন ১৩৮ অনুযায়ী বাংলাদেশে শিশুশ্রমে প্রবেশের ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি, শিশুদের পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে শর্ত রাখতে হবে, যাতে তারা তাদের সন্তানদের নিয়মিত পড়াশোনার জন্য বিদ্যালয়ে পাঠায়। একই সঙ্গে, ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।”
স্কপের যুগ্ম সমন্বয়ক নুরুল আমিন বলেন “শিশুশ্রম বন্ধে নিয়োগকর্তাদের আইনের আওতায় এনে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, শিশুদের পরিবারগুলোর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং অভিভাবকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে এবং শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করার পরিবর্তে তাদের শিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।”
আইবিসির নারী বিষয়ক সম্পাদক খাদিজা রহমান বলেন, “শিশুশ্রম নিরসন এবং শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ জরুরি। এ লক্ষ্যে আইএলও কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২-এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হয়। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে শিশুদের পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, অভিভাবকদের জন্য শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং মেয়েশিশুসহ সকল শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
মানববন্ধনে বক্তারা শিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা এবং শিহশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সকল অংশীজনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার এবং এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
শিশু অধিকার দিবসের র্যালিতে অভিমত
শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতের দাবি
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
অর্থ বাণিজ্য
১ ঘন্টা আগে
১১ অক্টোবর (রবিবার), ২০২৬, ৮ঃ৩৩ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
