ফ্রান্সে ‘জেন-জি’র বিক্ষোভে চাপে ম্যাক্রনের সরকার, ১৩ অক্টোবর নতুন কর্মসূচি

ফ্রান্সে ‘জেন-জি’র বিক্ষোভে চাপে ম্যাক্রনের সরকার, ১৩ অক্টোবর নতুন কর্মসূচি

ফন্ট সাইজ:

‘জেন-জি জেগে উঠেছে, তারা নিজেদের কথা শোনাতে চায়’

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী লিলিয়ার এই বক্তব্য তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ও প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, শিক্ষকসংকট এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুরবস্থার প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনের চাপে সরকার জরুরি ভিত্তিতে প্রায় তিন হাজার যোগ্য বিকল্প শিক্ষক মোতায়েনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, শিক্ষাব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন চান তাঁরা। এ পরিস্থিতিতে আগামী ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার দেশজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলো।
গত ৬ অক্টোবর প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপুবলিক এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে বার্তা সংস্থা এএফপিকে নিজের প্রত্যাশার কথা জানান ১৯ বছর বয়সী লিলিয়া। তিনি বলেন, ‘জেন-জি জেগে উঠেছে এবং নিজেদের কথা শোনাতে চায়।’ তাঁর আশা, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন শিক্ষার্থীদের দাবি শুনবেন।
লিলিয়ার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে—তরুণেরা শুধু প্রতিবাদ জানাতে নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁদের বক্তব্যের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতেও রাস্তায় নেমেছেন।

শিক্ষকসংকট, দুর্বল অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর নানা সমস্যা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কিছু বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। আবার কোথাও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও উপযুক্ত পরিবেশের অভাব রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করতে হবে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর মতে, দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যার সমাধান না হওয়ায় অসন্তোষ জমেছে। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিস অঞ্চলের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করতে শুরু করলে পরে শিক্ষক, অভিভাবক, বিভিন্ন সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন।

৬ অক্টোবরের বিক্ষোভে জনসমাগমের হিসাব নিয়ে পার্থক্য
গত ৬ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও আন্দোলন আয়োজকদের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। লে মোঁদ ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই দিন দেশজুড়ে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। তবে এএফপির প্রতিবেদনে সরকারি হিসাব ২ লাখ ৫৬ হাজার উল্লেখ করা হয়েছে।

এর দুই দিন পর, ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে আবারও বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেদিন দেশজুড়ে প্রায় ৭১ হাজার ৫০০ মানুষ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ জন। এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোর সামনে পৃথক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ অংশ নেন বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তাঁদের সবাই মূল মিছিলে যোগ দেননি।

প্যারিসের বাস্তিল চত্বরে সমাবেশের শেষ পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও আতশবাজি ছুড়লে পুলিশ জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের কর্মসূচিতে দেশজুড়ে ৫০৪ জনকে আটক করা হয়। আহত হন ৪৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও জেন্ডারমেরি সদস্য।
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সবাই সহিংসতায় জড়িত ছিলেন না। বিভিন্ন শহরে শান্তিপূর্ণ মিছিল ও সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বড় একটি অংশ শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

তিন হাজার বিকল্প শিক্ষক মোতায়েনের উদ্যোগ
ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের মধ্যে ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় তিন হাজার বিকল্প শিক্ষক মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন। ৮ অক্টোবর তিনি জানান, শিক্ষকসংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব শিক্ষক যোগ্য হলেও তখনো তাঁদের শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নিয়োজিত করা হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১০ শতাংশ নির্ধারিত পাঠদানের ঘণ্টা শিক্ষক না থাকার কারণে পূরণ করা যাচ্ছে না।

শুক্রবার ৯ অক্টোবর ফ্রান্সের প্রায় ৩ হাজার ৭০০ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৪১টি বন্ধ ছিল। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে বন্ধ বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১৫৭। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দেশের ৯৬ শতাংশের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয় খোলা ছিল।
সরকারের ঘোষণাকে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর মতে, শুধু বিকল্প শিক্ষক মোতায়েন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু অক্টোবরের শেষ নাগাদ শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে আন্দোলনকারীদের একাংশের মতে, সংকট সমাধানে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময়সীমা প্রয়োজন।

পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, ফরাসি কর্তৃপক্ষ বলছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সহিংসতা ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলা করাও পুলিশের দায়িত্ব।

গত ৫ অক্টোবর উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে একটি বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধের সময় পুলিশের ব্যবহৃত একটি স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। লে মোঁদ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পরে সংশ্লিষ্ট গ্রেনেডের মডেল EF-SON-এর ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। ঘটনাটি পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্র ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাঁ-তুয়াঁ-লোমোন এলাকায় ১৪ বছর বয়সী ইডেন নামের এক কিশোর পুলিশের ছোড়া গ্রেনেড লঞ্চারের আঘাতে গুরুতর আহত হয়। লে মোঁদ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার চোয়াল দুবার ভেঙে যায় এবং ওপরের দাঁতের অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচারিক তদন্ত শুরু হয়। তাঁর ওপর বিচারিক নিয়ন্ত্রণের শর্ত আরোপের পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

আন্দোলন চলাকালে কয়েকটি বিদ্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এএফপির প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে বলা হয়েছে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে ২৪টি বিদ্যালয় আগুন বা ভাঙচুরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন।

১৩ অক্টোবর আবারও রাস্তায় নামার প্রস্তুতি
শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পরও শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার দেশজুড়ে নতুন করে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট সমাধানে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা।
৯ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনটি পরবর্তী সপ্তাহেও অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অধিকাংশ বিদ্যালয় আবার খুলেছে এবং আন্দোলনের প্রভাব কিছু এলাকায় সীমিত হয়েছে।

ফ্রান্সের সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি মোকাবিলা করা, অন্যদিকে দেশের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।

১৩ অক্টোবরের কর্মসূচিতে কত মানুষ অংশ নেন এবং সরকার তার আগে নতুন কোনো পদক্ষেপ ঘোষণা করে কি না, এখন সেদিকেই নজর। লিলিয়ার বক্তব্যে উঠে আসা তরুণদের মূল প্রত্যাশা—তাঁদের কথা শোনা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যার বাস্তব সমাধান করা—এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বার্তা হয়ে উঠেছে।