অবরুদ্ধ দিল্লি

সহযোগীদের খবর

অবরুদ্ধ দিল্লি

ফন্ট সাইজ:

প্রথম আলো

‘সিইসির পদত্যাগ দাবি: অবরুদ্ধ দিল্লি’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ‘তেলাপোকা’দের ঠেকাতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিকে খোদ কেন্দ্রীয় সরকারই অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। ট্রেন, মেট্রোসহ দিল্লিতে বিভিন্ন পরিবহন চলাচলে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারকে সতর্ক করা হচ্ছে। আজ শনিবার রাজপথের কোথাও কেউ যাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ‘জ্ঞানেশ হটাও’ অভিযানে নামতে না পারেন, সে জন্য পুলিশ ও প্রশাসন ব্যাপকভাবে তৎপরতা শুরু করেছে।

নরেন্দ্র মোদি সরকারের এমন কঠোর অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না। আন্দোলন রুখতে দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা মানা যায় না। টানা ১০ ঘণ্টা রেলস্টেশনে ট্রেন আসা-যাওয়াও বন্ধ রাখা যায় না। ট্রেন চলাচল কিংবা শহরের অভ্যন্তরে যান চলাচল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে অসুবিধায় পড়তে না হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকেসহ নেতাদের ঘোষণা, ১০ অক্টোবরের ‘যন্তর মন্তর ২.০’-তে অংশ নেবেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। আন্দোলনে শরিক হতে ভারতে এসে ধ্রুব নিজেও বলেছেন, ‘এটা গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। ১০ তারিখে কেউ দিল্লি আসতে ভুলবেন না।’

৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে ধ্রুবর পাশে থাকা দক্ষিণের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ জানাতে ভোলেননি, ‘আলি রে আলি, জ্ঞানু, সময় শেষ; এবার তোমার যাওয়ার পালা।’ কিন্তু তবু সংশয় কাটছে না। সবার একটাই প্রশ্ন, অভিজিৎ দিপকেসহ সিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে ধ্রুব রাঠিদের দিল্লি পুলিশ আদৌ কি আজ শনিবার দিল্লির রাজপথে নামতে দেবে? তার আগেই কি তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে?

সংশয় ও সন্দেহ নিছক অমূলক নয়। কারণ, দিল্লি আসা ঠেকাতে বিভিন্ন রাজ্যে হাজার হাজার জেন-জি তরুণকে আটক করা হয়েছে। বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় পুলিশ ইতিমধ্যে ১০ হাজার সিজেপি কর্মী ও সমর্থককে আটক করেছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা। গত বৃহস্পতিবার এক্সে তিনি লিখেছেন, আটক করা হয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক দল ও সিজেপি সমর্থকদের।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, নানা জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের আটক করে ভ্যানে করে কোথায় নেওয়া হচ্ছে, কেন তাঁদের আটক করা হচ্ছে, এ বিষয়ে পুলিশ কিছুই জানাচ্ছে না।

ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে গতকাল গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমরা যন্তর মন্তর অভিযান করবই, যা হয় হোক।’ সেই বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি আমাদের জেলে ঢোকান বা গুলি করুন, আমরা প্রস্তুত। আপনার মানসিক বিকারগ্রস্ত আচরণে আমরা পিছু হটব না।’ দিপকে বলেছেন, তাঁদের অন্যতম মুখপাত্র দীপক বালিয়ান ও তাঁর ভাইকে রাজস্থান পুলিশ প্রচণ্ড মারধর করেছে। তাঁদের আটকে রেখেছে।

কঠোর অবস্থানে পুলিশ

আজকের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ অভিযান ঠেকাতে পুলিশ তাই চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখছে না। দিল্লি পুলিশের ২০ হাজার কর্মী ছাড়াও তৈরি রাখা হয়েছে আধা সামরিক বাহিনীর ২৩ হাজার সদস্য। পাঁচ কোম্পানি সশস্ত্র নারী পুলিশকেও আনা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে সিআরপিএফ জওয়ানদের।

বিক্ষোভকারীদের আটক করে নিয়ে যেতে দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো থেকে কয়েক শ বাস রাজধানীতে আনা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের আটকে রাখার জন্য দিল্লির বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০টি স্টেডিয়াম চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রয়োজনে সেখানে একাধিক দিন আটক রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যন্তর মন্তর এলাকায় গতকাল রাত ১০টা থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আন্দোলন, সিজেপির আন্দোলনের সময়েও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

শুক্র ও শনিবার দিল্লির বাইরে থেকে জেন-জিরা যাতে আসতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে শনিবার ভোর ৪টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত মোট ১০ ঘণ্টা সব ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নয়াদিল্লি, পুরোনো দিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ওই সময় কোনো ট্রেন ছাড়বে না; আসবেও না।

প্রতিটি রেলস্টেশনে বিশেষ পুলিশি নজরদারিরও বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এসব স্টেশনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বহু ট্রেনের আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো, সিজেপির ডাকে আশপাশের জেলা থেকে কেউ যাতে না আসতে পারেন। একই রকমের তৎপরতা রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানার সঙ্গে দিল্লির সীমান্ত এলাকাগুলোতেও।

উত্তর প্রদেশের কৃষকনেতারা সিজেপির আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, আন্দোলনে তাঁরাও যোগ দেবেন। কৃষকদের ঠেকাতে পুলিশ তৎপর।

গতকাল রাত নয়টার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মোট ৫৭টি মেট্রোস্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে অ্যাপনিয়ন্ত্রিত ভাড়ার গাড়ির। উদ্দেশ্য, দিল্লির অন্যান্য এলাকা থেকে তেলাপোকারা যাতে লুটেন্স দিল্লিতে আসতে না পারেন। শুক্র ও শনিবার দিল্লির সব মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি হয়েছে।

শুধু এই সতর্কতাই নয়, গতকাল থেকেই দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিটি হোটেল, ছাত্রাবাস, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকা বাড়িগুলোয় অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রত্যেককে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে কম বয়সী বাইরের ছেলেমেয়েদের থাকতে না দেওয়ার জন্য। দিল্লির পাহাড়গঞ্জ এলাকার হোটেলের মালিকদের বলা হয়েছে, এই দুই দিনের জন্য তাঁরা যেন কোনো নতুন বুকিং না নেন।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ

বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভয় দেখানোরও অভিযোগ এসেছে। পুলিশের এক বড় কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাইকে সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে কেউ যেন হঠকারী না হন। মসজিদে মসজিদে ইমামদের দিয়ে বলানো হচ্ছে, সবাই যেন ঘরে থাকেন। কেউ যেন আন্দোলনে না যান। এমনকি পুলিশ মসজিদে গিয়েও এমন নির্দেশনা জারি করেছে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

সরকার দেখছে, বড় সংবাদপত্র ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো ইদানীং আর সেভাবে শাসকের অনুকূলে জনমত তৈরি করতে পারছে না। মানুষ অনেক বেশি প্রভাবিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউবার ও রিল মেকার মারফত। সিজেপির প্রথম যন্তর মন্তর অবস্থানের সময় এই মহলের প্রভাব প্রবলভাবে দেখা গিয়েছিল। এবার তাদের রুখতে দিল্লি পুলিশ বিশেষভাবে সক্রিয়।

সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, এ ধরনের ‘সিটিজেন জার্নালিস্ট’দের প্রত্যেককে পরিচয়পত্র বুকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। লাইভ স্ট্রিমিংয়ের নামে তাঁরা এমন কিছু করবেন না, যাতে পুলিশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। প্রত্যেককে পুলিশি বিধিনিষেধ মানতে হবে। না হলে বিপদে পড়তে হবে। শনিবার অবাঞ্ছিত একজনকেও তারা যন্তর মন্তরের দিকে যেতে দেবে না।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লড়াই

ভারতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এ লড়াই করছেন উল্লেখ করে গতকাল রাতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকে এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার তথ্য যাচাই (এসআইআর) বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সেটা সম্ভব হবে না। সকালে তিনি যন্তর মন্তরে যাবেন। সেখানে যদি তাঁকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলেও এই আন্দোলন বন্ধ হবে না।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলনের শুরু হয় গত মাসের শেষ দিকে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরে। ওই প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে, ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার অনেকবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাতে গুরুত্ব দেননি।

ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ এনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এর এক পর্যায়ে এই দাবি নিয়ে মাঠে নামে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিজেপির কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে গত জুলাইয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন মোদির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সে সময় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির এই যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন হাজার হাজার তরুণ। এবারও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে তাঁদের এই আন্দোলন দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছে। সিজেপির পাশাপাশি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর ইন্ডিয়া জোটও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে টানা কর্মসূচি পালন করছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর কয়েকজন প্রতিনিধি গতকাল রাতে দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে তাঁদের দাবি জানিয়ে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার ভোট চুরি করে বিজেপিকে ক্ষমতায় রাখছে বলে রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে সিপিআই (এম–এল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন ‘আইসা’র নেত্রী নেহা বোরা গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে থাকা একজন কাপুরুষোচিত স্বৈরশাসকের অবস্থান এখন সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেছে।

এভাবে আন্দোলন দমানো যাবে না বলে উল্লেখ করেছেন যন্তরে মন্তরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা নেহা। গতকাল সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত আরেক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, সরকার দেশে খোলাখুলিভাবে জরুরি অবস্থা জারি করে দিয়েছে। ঠিক এভাবেই ভারত ছাড়ো আন্দোলন রুখতে ব্রিটিশ সরকার কোমর কষেছিল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নেতাদের আটক করেছিল। তাতে কিন্তু ভারত ছাড়ো আন্দোলন বন্ধ হয়নি। এবারও হবে না। ইতিহাস এভাবেই ফিরে ফিরে আসে।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘দুর্ভোগ জেনেও গন্তব্য ঢাকা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, অভাবের তাড়নায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে এক কাপড়ে ঢাকায় এসেছিলেন বসিলার হুমায়ুন আহমেদ। নৌকার হেলপার থেকে আজ তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এই শহরেই গড়েছেন সংসার। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ২০০৬ সালে পাবনা থেকে আসা মহিদুল ইসলামও পড়াশোনা শেষে চাকরি করছেন। পরিবার নিয়ে থিতু হয়েছেন রাজধানীতেই। শুধু হুমায়ুন বা মহিদুল নন; কর্মসংস্থান, উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটছেন ঢাকার পানে।

প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা এই বিপুল জনস্রোতের ভারে নুয়ে পড়েছে নগরী। জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না নগরের অবকাঠামো। আবাসন, সড়ক, গণপরিবহণ ও নাগরিক সেবার ওপর তৈরি হয়েছে সীমাহীন চাপ। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, সেবার ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। তবুও দেশজুড়ে সুষম উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সেবার বিকেন্দ্রীকরণের অভাবে জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী এই ঢল থামানো যাচ্ছে না।

বিশিষ্ট নগরবিদ ও নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিশাল। ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গমাইলে বসবাস করছেন ১৮ কোটি মানুষ অর্থাৎ প্রতি বর্গমাইলে ১ হাজার ২২৪ জন। এই সংখ্যা আরও বাড়বে। তবুও সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেই। শিল্প-কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সবই ঢাকাকেন্দ্রিক গড়ে তুলছে। এটা থামাতে হবে, বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় শহরগুলোতে। তাহলে ঢাকামুখী চাপ ধীরে ধীরে কমবে। তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের নানা সমস্যা রয়েছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বহু সংকট। এজন্য তারা আর কোনো উপায় না পেয়ে ঢাকায় চলে আসেন। দেশে আরও শহর থাকলেও সেসব শহরের চেয়ে ঢাকায় আয়-রোজগার বেশি। ভিক্ষা করলেও এখানে জীবন চালিয়ে নেওয়া যায়। এজন্য ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমানো যাচ্ছে না।

ঢাকায় গিজগিজ করছে মানুষ: ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট আয়তন ৩০৫ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি ১৯৬ দশমিক ২২ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ মূল ঢাকা সিটির প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করছেন ৩৩ হাজার ৭৫৭ জন মানুষ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারির চূড়ান্ত গণনা অনুযায়ী, দুই সিটির মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৮৬। এর মধ্যে উত্তরে ৫৯ লাখ ৯০ হাজার ৭২৩ এবং দক্ষিণে ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬৩ জন। যদিও ঢাকা ওয়াসা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ), বিভিন্ন দেশি-বিদেশীয় সংস্থার পরিসংখ্যানে বাস্তব জনসংখ্যা আরও বেশি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)-২০১৬ সালের হিসাবমতে, বৃহত্তর ঢাকায় অর্থাৎ ঢাকার দুই সিটিসহ আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন নতুন করে ১ হাজার ৭০০ মানুষ যুক্ত হচ্ছেন।

বিবিএস সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ। স্বাধীনতার পর গ্রামবাংলার মানুষ ঢাকায় আসতে শুরু করেন। কারও থাকার জায়গা নেই, কারও কর্মসংস্থান নেই; নানা মানুষ নানা কারণে ঢাকায় আসেন। বর্তমানে আবাসিক বাসিন্দাদের বাইরেও প্রতিদিন কাজ, চিকিৎসা ও পড়াশোনার প্রয়োজনে লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করেন, যা নগরের সেবাব্যবস্থাকে রীতিমতো হাঁসফাঁস অবস্থায় ফেলছে।

কাজ যেখানে, মানুষের গন্তব্যও সেখানে: মানুষ রাজধানীমুখী হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ জীবিকা। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিক কাজ করেন। রয়েছে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বড় প্রতিষ্ঠানের আশপাশে গড়ে ওঠা ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের নগরায়ণবিষয়ক মূল্যায়নেও মাঝারি শহরগুলোতে ভালো আয়ের কাজ ও উন্নত সেবার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। গ্রামে কৃষির বাইরে কাজের সুযোগ কম থাকা এবং নদীভাঙন বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষের কাছেও ঢাকা হয়ে উঠছে শেষ আশ্রয়স্থল। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে রাজধানীতে আসার প্রয়োজনীয়তা কমতে পারে। নগরায়ণ ও অভিবাসনবিষয়ক গবেষণায় তাই কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ কৃষির বাইরে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সন্তানের শিক্ষা ও পরিবারের চিকিৎসার কথা বিবেচনা করেও মানুষ ঢাকায় থাকেন। বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য রোগীর সঙ্গে স্বজনদেরও আসতে হয় রাজধানীতে। ফলে কোনো দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান অন্য শহরে সরালেই সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো সেখানে চলে যাবে এমন নিশ্চয়তাও নেই। স্থানীয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে আস্থা তৈরি করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন সময়ের মূল্যায়নে কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি মানসম্পন্ন সেবা যুক্ত করার পরামর্শও এসেছে।

কর্তৃপক্ষের অভিমত: গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের যুগান্তরকে বলেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য করা এবং ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে সরকার চিন্তা করছে। ঢাকার বিদ্যমান সংকটের সমাধান করতে নগর সেবা ও উন্নয়ন কাজগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের সব এলাকার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথমে মেট্রোপলিটন শহরগুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এরপর বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান করা হবে। তিনি জানান, কোথায় কী ধরনের উন্নয়ন হবে, তা নির্ধারণে জোনিং করা হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করা হচ্ছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জনসংখ্যা, আবাসন, পরিবহণ, স্বাস্থ্য ও পয়োনিষ্কাশনের দায়িত্ব বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের হাতে। ফলে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ঢাকার সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন মানুষের আগমন ও নতুন বস্তি গড়ে ওঠা শুধু আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় পরিকল্পনা করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মডেল অনুসরণ করে এখানে পরিকল্পনা করা যথাযথ হবে না। রাজউকের লক্ষ্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে মানুষের বসবাসের উপযোগী ঢাকা গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে কাজ করছে রাজউক।

কালের কণ্ঠ

‘শিল্প খাতে পতন, গতিহারা অর্থনীতি’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশের বেসরকারি খাতে একের পর এক সংকোচনের চিত্র ফুটে উঠছে। গত ৩৩ বছরের মধ্যে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

অন্যদিকে গত দুই মাসে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডের সূচক সর্বাধিক সংকুচিত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে উৎপাদন শিল্পে। উৎপাদন, কাঁচামাল আমদানি সবই কমছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের চাপ ও ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তা।

সব মিলিয়ে দেশের বেসরকারি অর্থনীতির গতি হারানোর চিত্র আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অর্থনীতির যে খাত দীর্ঘদিন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি, সেই বেসরকারি খাত এখন নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করছেন, দ্রুত উন্নতি না হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে চাপ আরো বাড়বে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনও কঠিন করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ দাঁড়িয়েছে ২১.৫৩ শতাংশ, যা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

অথচ দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। তাই বেসরকারি খাত রুগ্ণ হয়ে পড়লে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা বাড়বে।

উৎপাদনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা

ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, আগস্টের ৪৯.৯ থেকে সেপ্টেম্বরে হেডলাইন পিএমআই ১.৩ পয়েন্ট কমে ৪৮.৬-এ নেমে এসেছে, যা টানা দ্বিতীয় মাসের সংকোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরে উৎপাদন খাতে সবচেয়ে বড় অবনতি দেখা গেছে, এর সূচক ২.৬ পয়েন্ট কমে ৪৪.৮-এ নেমে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নতুন রপ্তানি অর্ডার, উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয় ও তৈরি পণ্যের মজুদ এবং আমদানি আরো দ্রুত হারে সংকুচিত হতে থাকে।

বকেয়া অর্ডারের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে সরবরাহকারীদের পণ্য সরবরাহের সময় ধীরগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।’

তবে কর্মসংস্থান সামান্য সম্প্রসারণে ফিরে আসে, অন্যদিকে উপকরণের দাম বাড়তে থাকে। আগস্টে সম্প্রসারণের পর নির্মাণ খাত পুনরায় সংকুচিত হওয়ায় তা ৩.৮ পয়েন্ট কমে ৪৮.৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে।

টানা দ্বিতীয় মাসেও পরিষেবা খাতে সামান্য সংকোচন দেখা গেছে, এর সূচক ০.২ পয়েন্ট কমে ৪৯-এ দাঁড়িয়েছে। কৃষিই একমাত্র সম্প্রসারণশীল খাত হিসেবে রয়ে গেছে, যা তার প্রবৃদ্ধির ধারাকে ১৩ মাস পর্যন্ত প্রসারিত করেছে।

এই পরিস্থিতিকে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলছেন, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক উদ্যোক্তা।

ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্বেগ

ব্যবসায়ী নেতা ও ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতের এই পতন এবং উৎপাদনে স্থবিরতা দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো খবর নয়। এই সংকট থেকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ক্যাপিটাল মেশিনারি (মূলধনী যন্ত্রপাতি) ও কাঁচামাল আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এগুলো সরাসরি নির্দেশ করে যে ভবিষ্যতে শিল্প উৎপাদন আরো হ্রাস পাবে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্যাংকঋণের সুদের হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করলেও এই মুহূর্তে বিনিয়োগ হঠাৎ বাড়বে না, কারণ সার্বিক পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগের মানসিকতা বা অনুকূল মেজাজ নেই।’

তিনি বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার প্রতি চরম বিমুখ। তাই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সহজ করতে হবে। পাশাপাশি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আন্তরিকতার সঙ্গে নীতি বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।’

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোসাম ‘শাহবাগ এলাকায় ৯ মাসে ৬৫ অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পেছনে দেয়াল ঘেঁষে একটু খালি জায়গা। ৬ অক্টোবর, বিকেল ৫টা। আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি শোওয়া। নড়াচড়া তেমন নেই। ডান পায়ের গোড়ালিতে ব্যান্ডেজ করা। পাশ দিয়ে একের পর এক মানুষ যাচ্ছে, কারও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই আশপাশের কেউও জানেন না লোকটি কোথা থেকে এসেছেন, পরিবার কোথায়। লোকটির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।

লোকটি যে স্থানে শুয়ে ছিলেন, ওইদিন সকালে সেখান থেকেই একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিচয় বের করতে পারেনি পুলিশ। একই দিন কাছাকাছি সময়ে ওই স্থান থেকে কিছুটা দূরে পাওয়া যায় আরও একজনের মরদেহ। তিনিও অজ্ঞাতপরিচয়। পুলিশ সদস্যদের ধারণা, অসুস্থতাজনিত কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

শুধু এই দুজন নয়, শাহবাগ থানাধীন এলাকায় গত এক মাসে অন্তত ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কারও পরিচয় বের করা যায়নি। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ঢাকা মেডিকেলের আশপাশসহ এই এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষ থাকে। পুরো শাহবাগ এলাকায় এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এলাকা, চাঁনখারপুল ও হাইকোর্টের মাজার, দোয়েল চত্বর ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।

পুলিশের তথ্যমতে, ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া যায় শাহবাগ এলাকায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ এলাকায় এক দিনে তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়। আগের দিন ২৬ সমকাজের একই এলাকা থেকে চারজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ এলাকায় সরকারি-বেসরকারি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আছে। জায়গাটি একই সঙ্গে পরিচয়হীন মানুষের ঠিকানাও। মৃত্যুর পর যাদের অধিকাংশের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না।

শাহবাগ থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে শাহবাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও আশপাশের এলাকা থেকে ৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ৬৫ জনের পরিচয় মেলেনি।

শাহবাগ এলাকায় ২০২৫ সাল বা তার আগে কত সংখ্যক অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার হয়েছে সে-সংক্রান্ত তথ্য পুলিশ দিতে পারেনি। তবে শাহবাগ থানা পুলিশের রমনা বিভাগের অধীন; এ বিভাগে ২০২৫ সালে ৮১টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হয় ১৩ জনের।

ইত্তেফাক

‘সংকুচিত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানির বাজার’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে একের পর এক বাধার মুখে পড়ছেন বাংলাদেশিরা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের অনেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়ায় কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। অন্যদিকে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে সাক্ষাত্কার দিতে ভারতে যেতে না পেরে আটকে যাচ্ছে শিক্ষার্থী ও কাজের অনুমতিপত্র পাওয়া কর্মীদের বিদেশযাত্রা। এতে একদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ হারানোর আশঙ্কা তৈরি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

জনশক্তি রপ্তানির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডস, সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ৭১ হাজার ৮৪ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। আগস্টে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৯২৯ জনে। অর্থাত্, এক মাসে কর্মী যাওয়ার হার কমেছে ১১.৪৭ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৭৬ হাজার ৯৪৬ জন বা ৩৬.৪৭ শতাংশ।

এর আগেও জনশক্তি রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশে গেছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ২৮৩ জন কর্মী। এর আগের প্রান্তিকে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৪। আগের বছরের একই সময়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭১৯ জন। ফলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে একাধিক সময়পর্বের পরিসংখ্যানে পতনের চিত্র উঠে এসেছে।

বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৫৮২ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮.৮৯ শতাংশ বেশি। শুধু আগস্টেই এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। তবে প্রবাসী আয় বাড়লেও নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার হার কমে যাওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রবাহ ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, বর্তমান প্রবাসী আয়ের বড় অংশ আসছে আগে থেকে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ থেকে, নতুন কর্মসংস্থান কমে গেলে ভবিষ্যতে আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি অংশের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বাংলাদেশির ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকে ছুটিতে দেশে এসে ভিসা বাতিলের কারণে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। ফলে বিদেশে তাদের চাকরি, আয় এবং পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে আমিরাতে কাজ করে পরিবার চালাচ্ছিলেন, তাদের অনেকে এখন আর্থিক সংকটসহ নানা সমস্যায় দিন কাটাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

চার মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরেছেন সাইফুল ইসলাম। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সেখানে একটি কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসেবে ভালো বেতনে চাকরি করতেন তিনি। তার নিজের গাড়িও ছিল। কিন্তু ভিসা বাতিলের খবর শুনে নিজের ভিসার অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে একই পরিস্থিতিতে পড়েন বলে জানান তিনি।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। সেখানে একটি কোম্পানির সুপারভাইজার হিসেবে অনেক ভালো বেতনের চাকরি করতাম। নিজের গাড়ি ছিল। হঠাত্ শুনলাম, কোনো কারণ ছাড়াই অনেকের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হচ্ছে। যাচাই করতে গিয়ে দেখি, আমার ভিসাটিও বাতিল। টিকিটের টাকা লোকসান হয়েছে। জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালাচ্ছি। এখন সঞ্চয়ও শেষের দিকে।’

অন্যদিকে ইউরোপে পড়াশোনা ও চাকরির সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশিদের জন্যও নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কনস্যুলার কার্যক্রমের একটি অংশ ভারতের দিল্লিসহ অন্যান্য শহরে পরিচালিত হওয়ায় বাংলাদেশি আবেদনকারীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাক্ষাত্কার বা পাসপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য ভারতে যেতে হয়। কিন্তু ভারতের ভিসা পাওয়া সীমিত হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ও কাজের অনুমতিপত্র পাওয়া কর্মী নির্ধারিত সময়ে সেখানে যেতে পারছেন না। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকে সাক্ষাত্কারের তারিখ পাওয়ার পরও ভারতে যেতে না পারায় তাদের আবেদনপ্রক্রিয়া আটকে যাচ্ছে। কারো কারো সাক্ষাত্কারের সময় বাতিল হচ্ছে বা নতুন তারিখের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশযাত্রার পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তায় পড়ছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষাবর্ষ শুরু এবং আবাসনসংক্রান্ত সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কাজের অনুমতিপত্র পাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার নির্ধারিত যোগদানের সময় থাকে। যথাসময়ে দূতাবাসের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে না পারলে তাদের অফার বা নিয়োগের সুযোগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ভিসা আবেদন, কাগজপত্র প্রস্তুত, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও যাতায়াতের জন্য ব্যয় করা অর্থও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘ডিসেম্বর ঘিরে অস্থিরতার ছক’। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় প্রতিদিনই ফার্মগেটের একটি কলেজ এলাকা থেকে সরকারি হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করতে শ্যামলীর দিকে যান নুসরাত বিনতে আজিজ। তার ভাষ্য, ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদের পর কোনো ভোগান্তি ছাড়াই এখন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছেন। পারুল বেগম নামের এক নারী বলেন, ফুটপাথের হকারদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে ভয়ে বাসা থেকে বের হতেই মন চাইত না। নুসরাত ও পারুল বেগমের কথায় ফুটপাথ হকারমুক্ত হওয়ায় পথচারী থেকে শুরু করে যানবাহন-সব জায়গায় স্বস্তি ফিরেছে। তবে সাম্প্রতিক এই হকার উচ্ছেদের নেপথ্যে রয়েছে অন্য এক নাশকতা-অস্থিরতার ভয়ঙ্কর ছক।

সম্প্রতি রাজধানীর ফুটপাথে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে একের পর এক সংঘর্ষ কেবল নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্কট নয়। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হকারের ছদ্মবেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ফুটপাথ ও সড়ককে ব্যবহার করে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটা অস্থিরতা তৈরির ছক কষছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে হকারদের সাথে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের একাংশ সংগঠিতভাবে জড়ো হয়।

সম্প্রতি করা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে আগামী ডিসেম্বরকে টার্গেট করে চলতি মাসের শেষে বা নভেম্বর মাসজুড়ে রাজধানীতে নানা ধরনের অস্থিরতা ও নাশকতার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য হকারের ছদ্মবেশে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চলছে। গোয়েন্দাদের এমন তথ্যের ভিত্তিতেই সরকার রাজধানীর ফুটপাথ হকার মুক্ত করার মিশনে নেমেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিসেম্বর মাসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার যে ঘোষণা দিয়েছেন সেই ঘোষণার পর নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা গ্রাম থেকে ঢাকায় অবস্থান নিতে শুরু করে ছদ্মবেশে। যার একটি অংশ হলো হকারের ছদ্মবেশে রাজধানীতে সক্রিয় থাকা। আরেকটি হলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের ঘিরে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সরকার এরই মধ্যে ফুটপাথ থেকে হকার সরানোর কাজ শুরু করেছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার তথ্য সংগ্রহ এখনো শেষ হয়নি। তদন্ত শেষে গোয়েন্দা রিপোর্ট পেশ করার পর সরকার এই বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে মোকাবেলা করবে। ওই সূত্র জানায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বেশির ভাগই একটি মহল পরিচালনা করছে। ওই মহলের সাথে কারা সক্রিয় সেই তথ্য উদ্ধারেও গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ: গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে মিরপুর-১০ নম্বরের হোপ মার্কেট এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ফুটপাথ উচ্ছেদ অভিযানে গেলে হকাররা বিক্ষোভ শুরু করে। সংঘর্ষে তিনটি গাড়িতে আগুন ধরানো হয়। মিরপুর-১০ থেকে ১৪ নম্বর পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। সে সময় রাস্তায় লাঠি হাতে হকারদের দেখা যায় এবং পুলিশ এলাকা ঘিরে রাখে। ওই দিন দুপুরে মিরপুর থানার ওসি হাফিজুর রহমান জানান, পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ঘটনার পর ডিএনসিসি প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকবে বলে ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ফ্যাসিবাদের দোসররা’ হামলা চালাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যেখানেই ফুটপাথ দখল হবে সেখানেই অভিযান চলবে এবং ফার্মগেটসহ অন্যান্য এলাকায়ও পর্যায়ক্রমে অভিযান চালানো হবে।

মিরপুর এলাকার সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুকে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য, আগে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তারপর এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত এবং ভবিষ্যতে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

এর দু’দিন আগে, ২৮ সেপ্টেম্বর সাভারের আশুলিয়ায় ডিইপিজেড এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে আনসার সদস্যরা বাধার মুখে পড়েন। সেখানে আনসার ও হকারদের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং হকাররা নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে মিরপুর-১ নম্বরে উচ্ছেদ চলাকালে হকারদের হামলায় ডিএনসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হন এবং ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সে সময় আহতের সংখ্যা ছিল ছয়।

একই এলাকায় বারবার উত্তেজনা: এ বছরের ৫ মে সরকার ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ জারি করে। পরে এই নীতিমালার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট হলে আদালত রুল জারি করেন। অর্থাৎ হকার পুনর্বাসনের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো এখনো অনিশ্চিত। অন্যদিকে ৩০ আগস্ট মিরপুর ট্রাফিক বিভাগ অবৈধ রিকশা চার্জিংয়ের ৫০০টি পয়েন্ট বিচ্ছিন্ন করে। এতে ব্যাটারিচালিত যান চালকদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মে মাসেও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণার প্রতিবাদে মিরপুর-১০ নম্বরে লাঠিসোটা হাতে চালক ও ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করেছিলেন।

ছদ্মবেশে সংগঠিত উপস্থিতি: গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উচ্ছেদ অভিযানের দিনগুলোতে হকারদের জমায়েতে এমন কিছু ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে যারা পেশাগতভাবে হকার নন। তাদের একটি অংশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ফুটপাথের দোকানকে আশ্রয় ও আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে তারা সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছেন এবং অভিযানের সময় উসকানি ও সহিংসতায় ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের একাংশ এই জমায়েতে যুক্ত হচ্ছে, যা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দ্রুত লোক জড়ো করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের।

মিরপুর-১০ এ সংঘর্ষের ঘটনার সময় রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৪০ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এই গ্রেফতারের সাথে উচ্ছেদ-সংঘর্ষের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি পুলিশের পক্ষ থেকে।

ডিসেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ: নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক দিনপঞ্জিতে ডিসেম্বর মাস স্পর্শকাতর সময়। এ সময়কে কেন্দ্র করে নাশকতা, সড়ক অবরোধ ও জনজীবন অচল করার চেষ্টা হতে পারে। হকার ও পরিবহন শ্রমিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগানো গেলে সহজেই বড় জমায়েত তৈরি করা যায়, কারণ তারা জীবিকার ঝুঁকিতে আছেন এবং ঘনবসতি এলাকায় সক্রিয়।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে উচ্ছেদ-পুনর্দখলের চক্রটি সবসময় সক্রিয়। অভিযানের পর ফুটপাথ অল্প সময় ফাঁকা থাকলেও দ্রুত আবার দখল হয়ে যায়। চাঁদাবাজ চক্র না ভাঙলে এই চক্র থামবে না, এমন মতও এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার আগে বিকল্প পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, হকারদের প্রকৃত তালিকা তৈরি করা, ফুটপাথ থেকে চাঁদা আদায়কারী চক্র শনাক্ত করা এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সাথে প্রকৃত দরিদ্র হকারকে সন্দেহের তালিকায় ফেলার ঝুঁকিও এড়াতে হবে, নইলে জীবিকাহারা মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে অস্থির শক্তির হাতে ঠেলে দেয়ার আশঙ্কা থাকে।

বণিক বার্তা

‘দেশে এলপিজি আমদানির ১৭ শতাংশই যাচ্ছে শিল্পে’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৫ টন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টনে।

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন সচল রাখতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার বাড়াচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। প্রতি মাসে আমদানি হওয়া গড় দেড় লাখ টন এলপিজির ১৭ শতাংশই এখন শিল্প খাতে ব্যবহার হচ্ছে। এক বছর আগেও যা ছিল ১০ শতাংশের মতো। সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের দাবি, কোনো কোনো মাসে শিল্পে এলপিজির ব্যবহার ৩৫-৪০ হাজার টনে পৌঁছেছে। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও বিকল্প জ্বালানি ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে তা আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে গড়ে দেড় লাখ টন এলপিজি সরবরাহ হয়। এর ১৭ শতাংশ হিসাবে শিল্প খাতে মাসিক ব্যবহার দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার ৫০০ টন। তবে কয়েকজন অপারেটরের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় শিল্পে এলপিজির প্রকৃত ব্যবহার এ হিসাবের চেয়েও বেশি। প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে যাওয়ায় এবং ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কারখানাগুলো বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছে।

এলপিজির শিল্প গ্রাহকের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা খাতভিত্তিক ব্যবহার নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে। তবে অপারেটরদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি বলছে, গত সেপ্টেম্বরে দেশে মোট এলপিজি সরবরাহের ১৭ শতাংশ শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয়েছে। আর এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) শীর্ষ নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতে এলপিজির গ্রাহক প্রায় ৪০০। এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

শিল্পে এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধির এ প্রবণতার মধ্যে গত মাসের শেষ সপ্তাহে দেশের বাজারে সিলিন্ডার সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। এর আগে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহে বিঘ্ন এবং টার্মিনালের ত্রুটির কারণে অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট চলছিল। এ পরিস্থিতিতে এলপিজির সরবরাহ ও মজুদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে অপারেটর, জ্বালানি বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, দেশে এলপিজি আমদানিতে ঘাটতি হয়নি। পর্যাপ্ত আমদানি সত্ত্বেও পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কোনো কোনো পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৫ টন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টনে। সেপ্টেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ১২৯ টন। অর্থাৎ আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—দুই মাসেই আমদানি দেড় লাখ টনের বেশি ছিল।

অপারেটরদের দাবি, আমদানিতে ঘাটতি না থাকলেও শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। শিল্পের উৎপাদন সচল রাখতে বড় গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সরবরাহের পরিমাণ সমন্বয় করার প্রয়োজনও পড়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে শীর্ষ এক এলপিজি কোম্পানির কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্প খাতে আমাদের গ্রাহক সংখ্যা ৩০-এর বেশি। এসব গ্রাহকের মাসিক এলপিজির চাহিদা প্রায় দেড় হাজার টন। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তাদের ব্যবহার এতটাই বেড়েছিল যে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয়নি। এ কারণে শিল্পের কয়েকজন গ্রাহকের সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে আবাসিক গ্রাহকদের সরবরাহ বাড়াতে হয়েছে।’

শিল্পে এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন সচল রাখতে উদ্যোক্তারা এলপিজি ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় অনেকের কাছে এটি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।’

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিও শিল্পে এলপিজির চাহিদা বাড়ার অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায় সরকার। চলতি বছরে তিন দফা মূল্য সমন্বয়ের পর ডিজেলের দাম লিটারে ৩৫ টাকা, কেরোসিনে ৪৩ টাকা, পেট্রলে ৪৪ টাকা ও অকটেনে ৪৫ টাকা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে জানা গেছে। অন্যদিকে কারখানায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দামও সম্প্রতি প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কম থাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানিতে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতদিন কোনো কোনো উদ্যোক্তা ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিলেও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সেই ব্যবস্থার ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ফার্নেস অয়েলচালিত যন্ত্রে উৎপাদনও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে উদ্যোক্তারা এলপিজির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিইআরসির সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের সংকট সামনে আরো প্রকট হলে এলপিজির ব্যবহার বাড়বে। কারখানা চালাতে হলে উদ্যোক্তাদের ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এতদিন ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দিলেও সেগুলোর ব্যয়ও এখন বাড়ছে। এ কারণে এলপিজির ব্যবহার শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘সাগরপাড়ে স্ক্যাম চক্রের ঘাঁটি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে এগোলে ১২ কিলোমিটার দূরে হিমছড়ি সৈকত। সড়কের এক পাশে সমুদ্রের বিশাল নীল জলরাশি, অন্য পাশে ছোট ছোট সবুজ পাহাড়ের সারি। মেরিন ড্রাইভের পাশ ঘেঁষে সবুজ গাছগাছালির মধ্যে লাল রঙের দেয়াল এবং লাল টালির ছাদের নিচে ছোট ছোট ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি রিসোর্ট। নাম ‘মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্ট’।

সমুদ্রের বিশালতার পরশ পেতে যে রিসোর্টে যাওয়ার কথা ছিল ভ্রমণপিয়াসিদের, সেখানেই ঘাঁটি গেড়েছিল এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র। তারা পুরো রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে এর প্রতিটি কোনাকে উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জামে সাজিয়ে নিয়েছিল নিজেদের মতো করে। সেখানে কাজ করতেন বিশেষজ্ঞ স্ক্যামারসহ কয়েক শ বিদেশি। কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভের ইনানী ও সোনারপাড়ায় আরও দুটি রিসোর্ট এবং চট্টগ্রামের খুলশীতে একটি ভবন ভাড়া নিয়ে সেখানেও থাকতেন এই চক্রের সদস্যরা।

পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), কক্সবাজার জেলা পুলিশ, সিআইডি ও সিআইডি সদর দপ্তরের সাইবার পুলিশ সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, চার দেশ থেকে তাড়া খেয়ে বাংলাদেশে আসা এই চক্রে ছিল চীনাদের নেতৃত্বে আরও কয়েকটি দেশের অন্তত ৪০০ নাগরিক। চক্রের টার্গেট ছিলেন ভারতসহ নয়টি দেশের ধনী ব্যক্তি ও সচ্ছল নারীরা। সন্ধান পাওয়ার আগে গত ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কয়েক মাসে চক্রটি প্রতারণার মাধ্যমে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।

অন্য একটি দেশের গোয়েন্দাদের তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে গত সেপ্টেম্বরে এই চক্রকে শনাক্ত করে পুলিশ। অভিযানে কক্সবাজার থেকে ৬ জন এবং চট্টগ্রাম থেকে ৬৩ জন বিদেশি গ্রেপ্তার হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জাম। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশে বসে চীন ও তাইওয়ানের এসব স্ক্যামার টার্গেট করেছিল মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম ও ভারতের ধনী এবং সচ্ছল নারীদের। নামী কোম্পানির কর্মকর্তা এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাও ছিলেন তাদের টার্গেট। বাংলাদেশে বসে প্রতারণা চালালেও চক্রটির সদস্যদের কেউই বাংলাদেশি নন।

চক্রটি সম্পর্কে যেভাবে জানা গেল

সূত্রগুলো বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কয়েক শ চীনা নাগরিক বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের অধিকাংশই আসেন ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় (দেশে ঢোকার পর ভিসা নেওয়া)। প্রথমে ঢাকার উত্তরায় কিছুদিন অবস্থান করে কয়েকজন কক্সবাজারে চলে যান। সেখানে উখিয়ার মেরিন ড্রাইভের ইনানী ও সোনারপাড়ায় ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড ব্লু হোটেল ও চট্টগ্রামের ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি ভবন ছয় মাসের জন্য ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন। অফিস হিসেবে বেছে নেন কক্সবাজারের হিমছড়ির সাগরপাড়ের প্রায় পাঁচ বিঘা জায়গাজুড়ে স্থাপিত মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্টকে। এই রিসোর্টকে তাঁরা নিজেদের মতো করে বদলে নিয়ে উচ্চপ্রযুক্তির জগৎ বানিয়ে ফেলেন।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্ট থেকে চক্রটি প্রতারণা করতে ভারতীয় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিককে টার্গেট করে। তাদের স্ক্যামিংয়ের শিকার কয়েকজন ভারতীয় বিষয়টি সে দেশের সরকারের সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে জানান। পরে ভারতীয় সাইবার তদন্তকারীরা অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, প্রতারণার সঙ্গে জড়িত চক্রটির অবস্থান বাংলাদেশে। বিষয়টি তাঁরা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জানান।

খোঁজ নিতে গিয়ে দেশের গোয়েন্দারা জানতে পারেন, কক্সবাজারের চারটি রিসোর্টে ২০০ থেকে ২৫০ জন বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছেন। খবর পেয়ে গত মার্চের শুরু থেকে চীনা নাগরিকদের কর্মকাণ্ড নজরদারিতে রাখতে শুরু করে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এসবি। তাদের তদন্তে উঠে আসে, চীনা নাগরিকেরা কর্মসংস্থান ভিসা বা ই-ভিসায় এসেছেন। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তর (ডিআইপি) চীনাদের বাংলাদেশে আসার বিষয়টি জানলেও এসবির ফরেন ডেস্ক বা বিদেশি সহায়তা সেল তা জানত না। নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশে আসার পর বিদেশি নাগরিকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসবিতে নিবন্ধন করতে হয়।

দেশ রূপান্তর

‘১৩০ স্বর্ণপদক গায়েব!’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও ডিগ্রি পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনকারী ১৩০ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০২৪ সালে; তাদের জন্য স্বর্ণপদক ও ক্রেস্ট প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই বছরের ২৪ জুলাই ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার দেওয়ার কথাও ছিল।

সারা দেশে কোটা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ায় অনুষ্ঠানের তিন দিন আগে ২১ জুলাই রাতে শিক্ষার্থীদের এসএমএস দিয়ে অনুষ্ঠান স্থগিত করার কথা জানায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। এরপর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ওই ১৩০ জনকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি।

চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন করে ৫৮ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তদের নগদ ২৫ হাজার টাকা ও সনদপত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালে নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুত করা স্বর্ণপদক ও ক্রেস্টের কী হয়েছে, পুরস্কারের তালিকা কেন পরিবর্তন করা হলো এবং এর পেছনে কী প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত ছিল, সেসব বিষয়ে তদন্তের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন পুরস্কার থেকে বাদপড়া শিক্ষার্থীরা। গত ২২ সেপ্টেম্বর দুদক চেয়ারম্যানের কাছে এ আবেদন করা হয়। আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।

দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই জারিকৃত অফিস আদেশে ২০১৮, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালের অনার্স এবং ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের ডিগ্রি (পাস) পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনকারী ১৩০ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়। একই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২৪ জুলাই ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সম্মেলনকক্ষে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২১ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে অনুষ্ঠান স্থগিতের কথা জানানো হয়। এসএমএসে বলা হয়, অনিবার্য কারণে ২৪ জুলাইয়ের অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে এবং পরিবর্তিত তারিখ পরে জানানো হবে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও পরিবর্তিত তারিখ আর জানানো হয়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের জন্য ১৩০ শিক্ষার্থীকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার পর তাদের বাদ দিয়ে ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন ৫৮ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। তবে আগের তালিকা বাতিল বা সংশোধনের বিষয়ে ১৩০ শিক্ষার্থীকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। নতুন ৫৮ শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া, কেন ও কার সুপারিশে পুরনো তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে এবং কী কারণে ২০২৪ সালে নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেসব বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

কোথায় গেল ১৩০ স্বর্ণপদক : পুরস্কারবঞ্চিত শিক্ষার্থী রোকসানা আক্তার বলেন, ‘২০২৪ সালের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় ১৩০টি স্বর্ণপদক ও ক্রেস্ট প্রস্তুত হওয়ার কথা। স্বর্ণপদক তৈরির জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। সেসব স্বর্ণপদক এখন কোথায়? চলতি বছর যাদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তাদের স্বর্ণপদক দেওয়া হয়নি, ২৫ হাজার টাকা ও সনদপত্র দেওয়া হয়েছে। শুধু শিক্ষার্থীদের পুরস্কার দেওয়া হলো কি না, সেটি দেখলেই শেষ হয় না। তদন্তের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মেধাভিত্তিক নির্বাচন, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিষয়টি জানা দরকার। ২০২৪ সালের জন্য ১৩০টি স্বর্ণপদক ক্রয় বা প্রস্তুত করা হয়ে থাকলে সেগুলোর ক্রয়াদেশ, বিল-ভাউচার, অর্থ পরিশোধ, সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থান সব জানা দরকার।’

আরেক শিক্ষার্থী অন্তরা খানম বলেন, ‘২০২৪ সালের সংশোধিত অ্যাওয়ার্ড নীতিমালা অনুযায়ী, ১৩০ শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালে তালিকা পরিবর্তন করা হলে এর প্রশাসনিক ভিত্তি ও আর্থিক হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘বাদপড়া শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দুদকে দেওয়া আবেদনে ২০২৪ সালের ১৩০ জনের মূল তালিকা ও ২০২৬ সালের ৫৮ জনের তালিকা যাচাই, তালিকা পরিবর্তনের প্রশাসনিক ভিত্তি এবং স্বর্ণপদক সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের বিষয়টির তদন্ত করতে অনুরোধ করা হয়েছে।’ অন্তরা বলেন, ‘১৫ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের তালিকায় থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীও পুরস্কার পেয়েছে। আগের তালিকার কতজনকে নতুন করে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তার হিসাব আমরা পাইনি।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘১৪ মানসিক রোগে ভুগছে মানুষ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে মানসিক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। হতাশা, বিষণ্নতা ও অবসাদ থেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ২০১৯ সালের সর্বশেষ জরিপে প্রায় ৩ কোটি মানুষ মানসিক রোগে ভুগছে বলে জানা গেছে। করোনা মহামারির পর গত সাত বছরে রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। প্রায় ১৪ ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে মানুষ। তাদের বড় অংশই অবহেলা, কুসংস্কার, উদাসীনতা এবং চিকিৎসক সংকটের কারণে পাচ্ছে না চিকিৎসা। এই বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যা প্রায় ৪০০ এবং সাইকোলজিস্টের সংখ্যা প্রায় ৭০০ জন।

১৪ ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে মানুষ: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত ১৪ ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে দেশের মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে; বিষণœতাজনিত রোগ-দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, মেজাজের গুরুতর অবনতি। উদ্বেগ ও ভীতিজনিত রোগ-অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, প্যানিক ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য সাইকোটিক রোগ। বাইপোলার ডিসঅর্ডার-মেজাজ ও শক্তির অস্বাভাবিক ওঠানামা। অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি)। মানসিক আঘাত ও অতিরিক্ত চাপ-সম্পর্কিত রোগ-যেমন পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)। স্নায়ুবিকাশজনিত রোগ যেমন অটিজম ও এডিএইচডি। ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস-সম্পর্কিত রোগ। মাদকদ্রব্য ব্যবহার ও আসক্তিজনিত রোগ। ব্যক্তিত্বজনিত রোগ। স্মৃতি ও চিন্তাশক্তির অবনতিসংশ্লিষ্ট রোগ। বিচ্ছিন্নতাজনিত (ডিসোসিয়েটিভ) রোগ। আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত রোগ। গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত মানসিক সমস্যা।

এ ব্যাপারে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৭ শতাংশ এবং শিশুদের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশে সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যা ৪০০-এর বেশি এবং সাইকোলজিস্টের সংখ্যা প্রায় ৭০০ জন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানসিক রোগে আক্রান্তদের ৯২ শতাংশ চিকিৎসাসেবার বাইরে রয়ে গেছে, যা চিকিৎসার ঘাটতি নির্দেশ করে। বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল দেশে রয়েছে মাত্র দুটি (পাবনায় ও ঢাকায়) এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। রাতারাতি বিশেষজ্ঞ বা হাসপাতাল তৈরি সম্ভব নয় বলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বল্পমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বাইরে (যেমন শিক্ষকদের) প্রশিক্ষণ দিয়ে মানসিক রোগ সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়ানো ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করার জোর দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত গবেষণার ঘাটতি থাকলেও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশে প্রায় ১৪ ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে মানুষ। আক্রান্তদের কথা শোনা, তাদের ক্ষমতায়িত করা এবং স্বাস্থ্য নীতি তৈরিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএমএইচ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহযোগিতায় পরিচালিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৯৯ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের বিস্তারে হার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

জরিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকা মানুষের বিপুল সংখ্যা। আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা পায় না। অর্থাৎ, মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রতি ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় ৯২ জনই চিকিৎসার আওতার বাইরে থাকেন। শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে এ সংকট আরও প্রকট। জরিপের জন্য ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ৭ হাজার ২৭০ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২ হাজার ২৪৬ জন শিশু-কিশোরের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এটাই মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বশেষ জাতীয় জরিপ। সে হিসাবে দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত সংখ্যা ৩ কোটি।

তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভিড-১৯ মহামারির পর আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এর মধ্যে তরুণদের সংখ্যা বেশি। এর পাশাপাশি গত সাত বছরে বেড়েছে দেশের জনসংখ্যা। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ১০৫ জন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। অর্থাৎ সাত বছরের মধ্যে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ২ কোটি ৩৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯০ জন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে বেকারত্ব, মাদকে আসক্তি এবং ইন্টারনেটের আগ্রাসি জাল। নানামুখী চাপে খেই হারিয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তরুণদের বড় একটি অংশ।