উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ২৪

উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ফন্ট সাইজ:

প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গোটা উনিশ শতক জুড়েই বাঙালি ‘বাবু সম্প্রদায়’ তৎপর ছিল। তারই অংশ হিসেবে, ১৮৮২ সালে প্রকাশিত আনন্দমঠ উপন্যাসের এক ‘চিকিৎসক’ চরিত্রের মুখে ইংরেজ শাসন ও ইংরেজির পক্ষে হিন্দুত্ববাদী বঙ্কিমচন্দ্রের উপনিবেশবাদী যুক্তি শুনতে পাই। বঙ্কিম মনে করেন, যথার্থ সনাতন ধর্ম প্রচারের জন্য জ্ঞানের বহিস্থত্ব ও অন্তস্থত্ব অনুধাবন করা প্রয়োজন, আর তার জন্য প্রয়োজন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলছেন, “এখন এদেশে অনেকদিন হইতে বহির্বিষয়ক জ্ঞান নাই— শিখায় এমন লোক নাই; আমরা লোকশিক্ষায় পটু নহি। [...] ইংরেজ বহির্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত, লোকশিক্ষায় বড় সুপটু। সুতরাং ইংরেজকে রাজা করিব। ইংরেজি শিক্ষায় এদেশীয় লোক বহিস্থত্বে সুশিক্ষিত হইয়া অন্তস্থত্ব বুঝিতে সক্ষম হইবে। তখন সনাতনধর্ম প্রচারে আর বিঘ্ন থাকিবে না।”২১৫

কোনো বিদেশি জনগোষ্ঠীর অর্জিত ‘বহির্বিষয়ক জ্ঞান’ থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য, অন্য যেকোনো জনগোষ্ঠীর বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় প্রথমোক্তের ভাষা অধ্যয়ন ও আত্মস্থ করে সেই জ্ঞান অর্জন করার পর, নিজেদের ভাষায় তা অনুবাদ করে, আপন সমাজের সামষ্টিক জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে পারে, করা উচিতও, কিন্তু তার জন্য সেই সব ভিনদেশি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে আপন দেশের ‘রাজা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ভাবনা কেবলমাত্র কোনো উপনিবেশবাদী অসুস্থ মস্তিষ্কেই উদয় হতে পারে। আর, যে দেশের কায়েমি স্বার্থবাদী ‘সমাজপতি’ ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নিজেদের মাতৃভাষার পরিবর্তে বিদেশি ভাষায় শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য আকুল থাকে, স্বদেশে বিদেশিদের ‘রাজা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ‘যৌক্তিকতা’ দান করে, সে দেশে ভিনদেশি ভাষা ও শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য কোনো ঔপনিবেশিক শক্তিকে জবরদস্তির আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ব্রিটিশরা ১৭৫৭ সালে রাজনৈতিকভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছিল বাংলা প্রদেশ দখলের মাধ্যমে— বাংলার কলকাতাভিত্তিক হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশের সহযোগিতায় বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মুসলমান শাসক নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ক্ষমতার মসনদ থেকে উৎখাত করার ভেতর দিয়ে। তারপর, ১৭৬৫ সালে, দিল্লির মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে এই অঞ্চলের কর-ব্যবস্থাপনা পরিচালনার ‘দেওয়ানি’ লাভের ভেতর দিয়ে এখানে কার্যত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্যও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এই সময় থেকে কোম্পানির ইংরেজ শাসক সম্প্রদায় ও স্থানীয় মুসলমান অভিজাত শ্রেণি মনস্তাত্ত্বিকভাবে পারস্পরিক অবিশ্বাসের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, যা মুসলমান অভিজাতদের তরফের ব্যাপক বৈষয়িক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ সরকারের বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের সদস্য ও ইতিহাসবিদ উইলিয়াম উইলসন হান্টারের (১৮৪০-১৯০০) গবেষণা অনুযায়ী, গোটা মুঘল শাসনামলে এই অঞ্চলে মুসলমান নবাবের রাজত্বে, বিশেষত ‘বাংলার নিম্নাঞ্চলে’ মাঠ পর্যায়ের কর প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইন-আদালত ব্যবস্থা ও সেনাবাহিনীতে স্থানীয় মুসলমান অভিজাত শ্রেণির আধিপত্য থাকার কারণে এই অঞ্চলে তার বৈষয়িক প্রতিপত্তি ও সামাজিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত ছিল।২১৬

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার এই মুসলমান অভিজাত শ্রেণি তার এইসব পেশাগত বৃত্তি ও সহজাত প্রভাব-প্রতিপত্তি ইংরেজ ও তার স্থানীয় হিন্দু সমর্থক সম্প্রদায়ের কাছে হারিয়ে রীতিমতো অসহায় অবস্থায় অধঃপতিত হয়ে পড়ে। নিজের গবেষণালব্ধ তথ্যের বিশ্লেষণ করে হান্টার ১৮৭১ সালে লিখেছিলেন, “এখন থেকে ১৭০ বছর আগে বাংলার কোনো সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণকারী যেকোনো ব্যক্তির পক্ষে গরিব বনে যাওয়া ছিল প্রায় এক অসম্ভব ব্যাপার, আর বর্তমানে তার পক্ষে বিত্তবানের জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব বইকি।”২১৭
লক্ষণীয় যে, কর-প্রশাসনের পরিবর্তন থেকে শুরু করে জেমস মিল-ঘরানার ইতিহাসচর্চা, আইন-আদালত প্রশাসনে ফারসিকে হটিয়ে ইংরেজি ভাষা প্রতিষ্ঠা, ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন প্রভৃতি ভারতবর্ষে, বিশেষত বাংলায়, একদিকে মুসলমান সম্প্রদায়কে বৈষয়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, অন্যদিকে তা হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে নানাভাবে লাভবান করেছে। এই বাস্তবতা মুসলমানদের সঙ্গে ইংরেজের সম্পর্ককেই শুধু তিক্ততায় পর্যবসিত করেনি, গোটা ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমানের ভেতর দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি ও বিকাশেও ভূমিকা রেখেছে।

ওদিকে, আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে, যেমন কেনিয়ায়, স্থানীয় লেখক ও শিক্ষার্থীদের ওপর ইংরেজি ভাষা ও শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ নানা ধরনের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিপীড়নের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কেনিয়ার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ শুধু গিকুইয়ো ভাষায় লেখার জন্য সেদেশের বুদ্ধিজীবী গাকারা ওয়া ওয়ানজাউকে, ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত, ১০ বছর জেলে পুরে রেখেছিল।২১৮
তাছাড়া, কেনিয়ার ব্রিটিশ সরকার ১৯৫২ সালে সেদেশে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে, জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত স্কুলগুলোকে ইংরেজদের দ্বারা পরিচালিত ‘জেলা শিক্ষা বোর্ডের’ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে, ইংরেজিকে শিক্ষাদানের ভাষা হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
কেনিয়ায় স্কুল শিক্ষার্থীদের ভেতর মাতৃভাষায় কথা বলা নিরুৎসাহিত করার জন্য স্থানীয় ভাষাভাষীদের শাস্তিদানের রীতি চালু হয়েছিল। নগুগি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা শেষে লিখেছেন, “এমনকি স্কুলের আশেপাশে মাতৃভাষা গিকুইয়ো ভাষায় কথা বলে ধরা পড়া ছিল এক ভয়ানক রকমের অবমাননাকর অভিজ্ঞতা। গিকুইয়ো ভাষায় কথা বলে ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধীকে শারীরিক শাস্তি দেয়া হতো—উন্মুক্ত পাছায় তিন বা পাঁচ ঘা বেত, কিংবা ‘আমি একটি বেকুব’ বা ‘আমি একটি গাধা’ ধরনের বাক্যখচিত ধাতব চাকতি গলায় ঝুলিয়ে রাখা হতো। কখনো কখনো অপরাধীকে আবার সাধ্যাতীত আর্থিক জরিমানাও করা হতো।”২১৯
অন্যদিকে, মাতৃভাষার বদলে ইংরেজিতে পারঙ্গমতা সৃষ্টির জন্য নানা রকম পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল। ফলে, ‘শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপরের স্তরে পৌঁছানোর প্রধান সিঁড়ি হয়ে ওঠে ইংরেজি ভাষা’।২২০

‘এসময়’, নগুগি লিখেছেন, “কেনিয়াতে ইংরেজি ভাষাটি ভাষার চেয়েও অধিক কোনো বস্তুতে পরিণত হয়: ইংরেজি যেন এমন এক ভাষা, যার সামনে অপরাপর সকল ভাষাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে”।২২১
এমন পরিস্থিতিতে, উপনিবেশিত অঞ্চলের ভাষাসমূহকে সরকারিভাবে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করার প্রয়োজন পড়ে না, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেগুলো প্রান্তিকৃত হয়ে পড়ে— বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসকের ভাষাই ‘ক্ষমতার ভাষায়’ পরিণত হয়, আর সেই ভাষায় প্রশিক্ষিত হয়ে ঔপনিবেশিক শাসকসৃষ্ট স্থ’ূল স্বার্থান্ধ স্থানীয় অভিজাত সম্প্রদায় ও তার উত্তরসূরি প্রজন্মের অধিকাংশই স্বদেশে বিদেশি শাসন অব্যাহত থাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক শর্তাবলি উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে চলে। বিভিন্ন দেশে উপনিবেশবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ-সংগ্রাম দমন করার ক্ষেত্রে এরাই ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছে। এমতাবস্থায়, স্বদেশি ভাষাগুলো শাসন-শোষণের শিকার অসহায় প্রজামণ্ডলীর মতো, অবদমিত অবস্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রের অধস্তন স্তরে প্রধানত বৃহত্তর জনতার কথোপকথনের ভেতর দিয়ে টিকে থাকে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রতিটি দেশেই নিপীড়িত জনতা ও তাদের ভাষা বিপন্ন অবস্থার শিকার হয়েছে। স্পষ্টতই, স্বদেশি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নও স্বদেশি ভাষাগুলোর বৌদ্ধিক সমৃদ্ধি পরস্পরের সঙ্গে এক অনিবার্য দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে জড়িত থাকে। ফলে, ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড় থেকে জনগণের যথার্থ রাজনৈতিক মুক্তির ভেতর দিয়েই জনগণের ভাষাসমূহের ‘ক্ষমতার ভাষা’ হিসেবে বিকশিত হওয়ার পথ নির্মিত হয়।

ছয়
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে দেশে দেশে উপনিবেশবাদ-বিরোধী প্রবল জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে, এশিয়া ও আফ্রিকায় ইউরোপের উপনিবেশগুলো স্বাধীনতা অর্জন করতে শুরু করে, যা একই শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সেই প্রক্রিয়ার শুরুর দিকে, ১৯৪৭ সালে, প্রায় দু’শ বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকার পর, ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু তা এই অঞ্চলে ইতিপূর্বে বিকশিত ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষফল হিসেবে এক রক্তাক্ত বিভক্তির মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি বৈরী রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটায়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কী করে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটলো, এবং তা গোটা ভারতীয় সমাজকে সাম্প্রদায়িকভাবে বিভক্ত করে দু’টি পরস্পরবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটালো, আর তার পেছনে কোন কোন সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি দায়ী— সে এক ভিন্ন ইতিহাস। এখানে শুধু এটুকু স্মরণ করা প্রয়োজন যে, ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামে বহু বছর ধরে লক্ষ লক্ষ অসাম্প্রদায়িক মানুষের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ থাকা সত্ত্বেও, যে দু’টি রাজনৈতিক দল— ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও ভারতীয় মুসলিম লীগ— সেই সংগ্রামের চূড়ান্ত নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিল, তাদের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক সিপাহসালারদের প্রায় প্রত্যেকেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষায় দীক্ষিত ছিলেন। এটা অতএব মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র দু’টির ভেতর যাবতীয় বৈরিতা সত্ত্বেও, স্বাধীনতার পর উভয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বই আপন আপন দেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইন, প্রশাসনব্যবস্থা আর শিক্ষা ও ভাষানীতি অক্ষুণ্ন অবস্থায় জারি রাখে— উভয় রাষ্ট্রেই ইংরেজিকে প্রধান ‘অফিসিয়াল’ ভাষার স্বীকৃতি দিয়ে, ভারত দেবনাগরি লিপিতে লিখিত হিন্দি ও পাকিস্তান ফার্সিলিপিতে লিখিত উর্দুকে দ্বিতীয় ‘অফিসিয়াল’ ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে।


তথ্যসূত্র:
২১৫. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, উপন্যাসসমগ্র, পৃষ্ঠা: ৭৯৩
২১৬.W. W. Hunter, The Indian Musalmans, p. 141
২১৭. প্রাগুক্ত
২১৮. Ngugi Wa Thiong’o, Decolonising The Mind: The Politics of Language in African Literature, p. 28
২১৯. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১১
২২০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১২
২২১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১১